সাম্প্রতিক

ফেনীতে ছাত্রীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন: সেই অধ্যক্ষ বরখাস্ত

ফেনীর সোনাগাজীতে একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে এক পরীক্ষার্থীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় কারান্তরীণ অধ্যক্ষকে সামায়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে ৭ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকেএম এনামুল করিমের সভাপতিত্বে গভর্নিং কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

সভায় উক্ত ঘটনায় নিন্দা প্রস্তাব এনে সবাই ছাত্রীর পরিবারকে সহযেগিতার আশ্বাস দেন। মাদ্রাসার তহবিল থেকে ছাত্রীর চিকিৎসার জন্য ২ লাখ টাকা ছাত্রীর পরিবারকে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

পরবর্তী সিদ্ধান্ত না করা পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আরবী প্রভাষক মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়। মাদ্রাসার সার্বিক নিরাপত্তার সার্থে দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অধ্যক্ষের কার্যালয় দ্বিতীয়তলা থেকে স্থানান্তর করে শিক্ষক মিলনায়তনের পাশে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য নীচতলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক কমন রুম ও শৌচাগার স্থাপন এবং আলিম বোর্ড পরীক্ষা সময় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুরুষ ও নারী পুলিশ প্রবেশ পথে শিক্ষার্থীদের তল্লাশি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সভায় গভর্নিং কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে চট্রগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ রোববার দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিষয়টি যেহেতু স্পর্শকাতর সেহেতু দুটি বিষয় বা সূত্রকে সামনে রেখে তদন্ত চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি আত্মহত্যার চেষ্টা অন্যটি ছাত্রীর অভিযোগ হিসেবে ৪জন দুর্বৃত্ত দ্বারা তাকে হত্যার চেষ্টা। ইতোমধ্যে মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক আবছার উদ্দিন ও আলিম পরীক্ষার্থী ছাত্র হাফেজ আরিফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ওই ছাত্রীর পরিবার যেহেতু চিকিৎসা কাজে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তারা লিখিতভাবে অভিযোগ দিলে পরবর্তীতে মামলা রুজুর ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আটকৃত দুইজনকে ৫৪ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হবে।

যদিও আগুনের ঘটনাটি রহস্যঘেরা। রহস্য উদঘাটনে কিছুটা সময় লাগবে। থানা পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছ।

এসময় এএসপি সদর সার্কেল উক্য সিং, এএসপি সোনাগাজী-দাগনভূঞা সার্কেল সাইকুল আহম্মদ ভূঞা, ওসি মো. মোয়াজ্জ হোসেন, পরিদর্শক (তদন্ত) মো.কামাল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শনিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রের ৮নং কক্ষে প্রবেশ করে আলিম পরীক্ষার্থী ওই ছাত্রী। এ সময় ইসরাত জাহানকে তার এক সহপাঠী নিষাদকে সহপাঠীরা মারছে বলে ছাদে ডেকে নেয়। সেখানে বোরখা পরা ৪জন ছাত্রী তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করে।

এসময় সে রাজি না হলে ওই ৪জন দুর্বৃত্ত তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মাদ্রাসার নাইট গার্ড মো. মোস্তফা ও পুলিশ কনস্টেবল মো. রাসেল জানান, নুসরাত জাহান অগ্নিদ্বগ্ধ অবস্থায় চিৎকার দিয়ে মাদ্রাসা ভবনের দ্বিতীয়তলা থেকে নামার সময় তারা এগিয়ে গিয়ে তাকে আগুন নেভাতে গিয়ে নাইট গার্ড মো. মোস্তফা ও পুলিশ কনস্টবল রাসেলের হাত পুড়ে যায়।

মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষকসহ তারা দ্রুত তাকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফেনী সদর হাসাপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই শিক্ষার্থী।

চিকিৎসকরা জানান, ওই শিক্ষার্থীর শরীরের ৭৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার অবস্থা গুরুতর।

সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার ঘটনায় আত্মহননের উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা, নাকি তার কথা অনুযায়ী কোন দুর্বৃত্তরা তার গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে কিনা সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানীর চেষ্টার অভিযোগ এনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলাহকে আসামি করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

তিনি মামলায় উল্লেখ করেন, গত ২৭মার্চ সকাল ১০টার দিকে তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে পরীক্ষার আধা ঘন্টা পূর্বে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন ওই অধ্যক্ষ।