সাম্প্রতিক

পাহাড়ে ভয়াবহ বিপর্যয়, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩১

টানা দুই দিনের প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগের তিন জেলায় পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিন জেলায় পাহাড় ধসে সেনা কর্মকর্তাসহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩১ জনে দাঁড়িয়েছে। আরো বহু আহত এবং নিখোঁজ রয়েছে।

রাত পৌনে ১০টা পর্যন্ত ১৩১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব জি এম আবদুল কাদের জানান, রাঙ্গামাটিতে ৯৮ জন, চট্টগ্রামে ২৭ জন ও বান্দরবানে ৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে গত রবিবার থেকে দেশের দক্ষিণ পূর্বের জেলাগুলোতে চলছে ভারি বৃষ্টিপাত। পাহাড়ি ঢলে সোমবার রাতে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বৃষ্টির পানিতে মাটি সরে গিয়ে তিন জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ে ধস নামে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বৃষ্টির মধ্যেই উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে গেলেও অনেক রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

রাঙামাটির মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের কাছে পাহাড় ধসের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে ফের ধসে নিহত হয়েছেন দুই কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্য।  আহত হয়েছেন আরো দশজন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান জানিয়েছেন।

নিহতরা হলেন- মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম শান্ত, কর্পোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক ও সৈনিক মো. শাহিন আলম।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাঙামাটি

টানা বৃষ্টিতে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই, জোড়াছড়ি, বিলাইছড়ি উপজেলায় ৮৮ জনের লাশ উদ্ধারের খবর জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী।

মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে তিনি জানান,  রাঙামাটি সদরে ৪৫ জন, কাউখালীতে ২৩ জন, কাপ্তাইয়ে ১৬ জন, জোড়াছড়িতে ২ জন এবং বিলাইছড়িতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে তিনি জানান। এসব দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্কাউট ও পুলিশ সদস্যরা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উদ্ধার কাজ করছে।

এর মধ্যে মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের কাছে পাহাড় ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছেন দুই কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্য।

চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ, রাউজান ও বাঁশখালীতে পাহাড় ও দেয়াল ধসে এবং বজ্রপাত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুকুর রহমান সিকদার।

এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার দুটি এলাকা থেকে ২১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের মইন্যারটেক ও পাহাড়তলী ঘোনায় ১৩ জন এবং রাজানগর ইউনিয়নের জঙ্গল বগাবিল ৮ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।

ইউএনও কামাল হোসেন আরো জানান, ওই দুই এলাকা থেকে লোকজনদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য দেয়া হচ্ছে।

এদিকে চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের শামুকছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পাহাড় ধসের দুটি ঘটনায় দুই পরিবারের শিশুসহ চারজন মারা গেছেন বলে চন্দনাইশ থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার জানান।

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ চৌধুরী জানান, ২ নম্বর ওয়ার্ডের শামুকছড়িতে পাহাড় ধসে আজগর আলীর তিন বছর বয়েসী মেয়ে মাহিয়ার মৃত্যু হয়। আর কাছেই ছনবনিয়া এলাকায় অপর ঘটনায় কেউ লা খেয়াং, মে মাউ খেয়াং ও মোকইউ অং খেয়াং নামে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়। সেখানে আহত হন শানু খেয়াং ও ছেলাই কেউ খেয়াং।

এর বাইরে নগরীর হালিশহর ও বাকলিয়, রাউজান, বাঁশখালীর বাহারছড়ায় নদীতে ভেসে গিয়ে, গাছ ও দেয়াল চাপায় এবং বা বজ্রপাতে পাঁচজন মারা গেছেন বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

নিম্নচাপের প্রভাবে মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৩১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে।

চন্দনাইশের কসাই পাড়া থেকে দেওয়ান হাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে বান্দরবান ও কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

ফায়ার সর্ভিস চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, রাঙ্গুনিয়ার রানীর হাট মঘাইছড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে তাদের কয়েকটি ইউনিট বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে।

বান্দরবান

বান্দরবানে পাহাড় ধসে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন উদয় শংকর চাকমা।

এর মধ্যে শহরের কালাঘাটায় এক কলেজছাত্র, লেমুঝিরি ভিতর পাড়ায় একই পরিবারের ৩ শিশু এবং সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরু সম্বোনিয়া পাড়ায় আরো তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

বান্দরবান সদর থানার ওসি রফিক উল্লাহ জানান, শহরের কালাঘাটা কবরস্থান এলাকায় মাহমুদ মিয়ার বাড়ির ওপর পাহাড় ধসে পড়লে সেখানে রেবি ত্রিপুরা নামের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের মৃত্যু হয়।

রেবি বান্দরবান সরকারি কলেজের দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তারা কয়েকজন সহপাঠী মিলে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভোর ৪টার দিকে মাটি সরিয়ে রেবির লাশ উদ্ধার করে এবং আরো চারজনকে হাসপাতালে পাঠায়।

কাছাকাছি সময়ে শহরের লেমুঝিরি ভিতর পাড়ায় একই পরিবারের ৩ শিশুর মৃত্যু হয়।  এরা হল- শুভ বড়–য়া (৮), মিতু বড়ুয়া (৬) ও লতা বড়ুয়া (৫) । তারা স্থানীয় সুমন বড়ুয়ার ছেলেমেয়ে। ওই বাড়ির ওপর পাহাড় ধসের পর স্থানীয় লোকজন মাটি সরিয়ে তিন শিশুর লাশ উদ্ধার করে।

এছাড়া বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরু সম্বোনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধসে মংক্যউ খিয়াং (৫৫), ক্যসা খিয়াং (৭), নেইমাউ খিয়াং (১৭) নামে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় ইউপি সদস্য উসামং খেয়াং জানান।

সদর থানার ওসি রফিক উল্লাহ জানান, শহরের জাইল্লাপাড়ায় আরেক ঘটনায় কামরুন্নাহার নামের এক নারী ও তার ১০ বছরের মেয়ে সুফিয়া নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।