সাম্প্রতিক

ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে শ্বাশুড়িকে হত্যাকারি সিআইডি কনস্টেবল অসীম ভট্রাচার্য গ্রেফতার


উপর্যূপরি ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে শ্বাশুড়িকে হত্যাকারি সিআইডি কনস্টেবল অসীম ভট্রাচার্যকে গ্রেফতার করেছে চুয়াডাঙ্গা ট্রাফিক ও সদর থানা পুলিশ। বুধবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের নিকটবর্তী ঘোড়ামারা ব্রিজ এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শাশুড়ি হত্যার কাজে ব্যবহৃত ছুরিটি। ওই ছুরি দিয়ে তিনি পুলিশকেও আক্রমণ করেছিলেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কানাই লাল সরকার জানান, ‘বুধবার বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সড়কে বিশেষ চেকিং অভিযান চলছিল। চুয়াডাঙ্গা-আলমডাঙ্গা সড়কের ঘোড়ামারা ব্রিজের নিকটবর্তী স্থানে লুঙ্গি পরিহিত এবং গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা অবস্থায় অসীম অধিকারী মোটরসাইকেল নিয়ে আলমডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলেন। তাকে সিগনাল দিয়ে থামানো হলে তিনি নিজেকে ডিবি পুলিশের লোক বলে পরিচয় দেন। সন্দেহ হলে তার কাছে পরিচয়পত্র চাওয়া হয়।

পরে তিনি পুনরায় নিজেকে সিআইডি পুলিশের লোক পরিচয় দেন। তখন আমরা বুঝতে পারি এই সেই শাশুড়ি হত্যাকারী অসীম ভট্রাচার্য । বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অসীম দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। ট্রাফিক পুলিশের লোকজন ধাওয়া করে প্রায় আধাকিলোমিটার দূরের একটি আমবাগান থেকে তাকে আটক করে।’

তিনি আরও জানান, ‘আটকের সময় অসীম ভট্রাচার্য তার কোমর থেকে ছুরি বের করে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। কিন্তু অল্পের জন্যে তা ব্যর্থ হয় এবং অসীম ধরা পড়ে। এ সময় অসীমের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় শাশুড়িকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত ছুরিটি। ওই ছুরিটি অসীম সেই থেকে বিশেষ কায়দায় কোমরে বহন করে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।’
অসীম অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে শাশুড়ি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।’


উল্লেখ্য যে, গত শনিবার গভীর রাতে আলমডাঙ্গা শহরের মাদ্রাসাপাড়ায় মাদকাসক্ত সিআইডি পুলিশ কনস্টেবল জামাই অসীম ভট্রাচার্যের ছুরিকাঘাতে শ্বাশুড়ি শেফালী রাণী অধিকারী নিহত হয়েছেন। স্ত্রী ফালগুনী রাণী অধিকারী ছুরিকাঘাত করে হত্যার সময় তাকে বাঁচাতে গেলে শ্যালক আনন্দ অধিকারীকেও ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত করে। ফাল্গুনী রাণী অধিকারী ও আনন্দকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফাল্গুনী অধিকারীর অবস্থা এখনও সঙ্কটাপন্ন। পুলিশ ঘাতকের ঘর থেকে ৫১ বোতল ফেনসিডিল ও একটি ভারতীয় সিমকার্ড উদ্ধার করে।
প্রত্যক্ষদর্শি ও নিহতের পরিবারসূত্রে জানা যায়, ঘটনার রাতে ফাল্গুনী রাণী অধিকারী বাবার বাড়ি পৌঁছনোর কিছু সময় পর প্রথমে তাদের শিশুকন্যা অনুশ্রী নানাবাড়ি আসে। রাত দেড়টার দিকে পুলিশ কনস্টেবল অসীম ছুটে যায় শ্বশুরবাড়ি। চিৎকার করে স্ত্রী ফাল্গুনীকে গালমন্দ করতে থাকেন। সে সময় তার হাতে ছুরি ছিল। এক পর্যায়ে ঘরের ভেতর নিয়ে ফাল্গুনীকে প্রথমে পিঠে ও পরে তলপেটে ছুরিকাঘাত করে। ফাল্গুনীর চিৎকারে তার মা শেফালী রাণী অধিকারী ছুটে গেলে তাকেও উপর্যুপরি বাম স্তনে, স্তনের নীচে ও বাম বাহুতে ছুরিকাঘাত করে। সে সময় সদানন্দ অধিকারী ও তার ছেলে আনন্দ বাধা দিতে গেলে প্রথমে আনন্দকে বুকের বাম পাশে ছুরিকাঘাত করে। সদানন্দের মাথা ঘরের ওয়ালে ঠুকে আহত করে। সে সময় আশপাশে অনেক প্রতিবেশি জড়ো হন।
স্থানীয় শেফা ক্লিনিকে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার শেফালী রাণী অধিকারী (৫৩)কে মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহার ও পারিবারিকসূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ বছর পূর্বে আলমডাঙ্গা শহরের মাদ্রাসাপাড়ার সদানন্দ অধিকারীর কন্যা ফাল্গুনী রাণী অধিকারীর পারিবারিকভাবে খুলনা দৌলতপুর উপজেলার মহেশ্বরপাশার (আমিরাবাদ লেনের বণিকপাড়া ) মৃত দুলাল ভট্রাচার্য অরফে দীনেশ কুমার ভট্রাচার্যের ছেলে পুলিশ কনস্টেবল অসীম কুমার ভট্রাচার্যের বিয়ে হয়। আরাধ্যা ভট্রাচার্য অনুশ্রী নামে তাদের ৬ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। গত ২ বছর আগে অসীম ভট্রাচার্য চুয়াডাঙ্গা সিআইডি-তে বদলী হয়ে আসেন। স্ত্রী-কন্যা নিয়ে শ্বশুরবাড়ির নিকটবর্তি কলেজপাড়ায় সুকেশ কুমার সাহার বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
সদানন্দ অধিকারী জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে ফাল্গুনী-অসীমের মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলে আসছিল। অসীম অহেতুক ফাল্গুনীকে সন্দেহ করতো। পরোকীয়া করার অপবাদ দিত। গত ৭ জুন রাতে দাম্পত্য কলহের এক পর্যায়ে স্ত্রী ফাল্গুনীর গলায় ওড়না জড়িয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার অপচেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে ফাল্গুনী তার বাপের বাড়ি গিয়ে উঠেন। এ ঘটনার পর অসীম তার ৬ বছরের মেয়ে অনুশ্রীকে প্রথমে শ্বশুরবাড়ির নিকট ছেড়ে দেয়। অনুশ্রী মায়ের কাছে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর অসীম ছুরি হাতে উপস্থিত হয়ে ফাল্গুনীকে বিশ্রীভাবে গালিগালাজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে ফাল্গুনীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করতে গেলে পরিবারের সকলে সাহায্যের জন্য ছুটে যান। সে সময় ঘাতক শেফালী রাণী অধিকারীকে উপর্যূপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। তার ছেলে আনন্দ অধিকারীকেও ছুরিকাঘাত করে। শ্বশুর সদানন্দকে মারধর করেছেন বলে জানান।
এদিকে, পুলিশ কনস্টেবল জামাই কর্তৃক সংঘটিত এ নারকীয় হত্যাকান্ডের পর অসীমের সম্পর্কে নানা তথ্য রের হয়ে আসছে। পুলিশ কনস্টেবল অসীম প্রচন্ড মাদকাসক্তই ছিল না, সেই সাথে দীর্ঘদিন ধরে মাদকব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। চুয়াডাঙ্গায় বদলী হয়ে আসার পর থেকে দর্শনা থেকে ফেনসিডিল নিয়ে এসে সে আলমডাঙ্গায় পাইকারি বিক্রি করত।
তাছাড়া প্রয়াত আপন বড় দাদার বিধবা স্ত্রীর সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল বলেও গুঞ্জন উঠেছে। তা নিয়ে স্ত্রী ফাল্গুনীর সাথে অসীমের কলহ লেগেই থাকত। বউদির সাথে অবৈধ সম্পর্কের কাহিনি ঢাকতেই অসীম নিজ স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে অপবাদ দিত। এমনকি এ অভিযোগও উঠে এসেছে যে, অসীমের আপন বড় দাদা ছিলেন কিডনীর রোগে আক্রান্ত। তার একটি কিডনী প্রতিস্থাপিত। বদরাগি অসীম বড় দাদার পেটে (যেখানে কিডনী প্রতিস্থাপন করা হয়েছে) লাথি মেরে হত্যা করে।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সদানন্দ অধিকারী বাদী হয়ে শনিবার রাতে আলমডাঙ্গা থানায় এজাহার দায়ের করেছেন।