সাম্প্রতিক

চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোজার উপকারীতা


মুহা. নাজমুছ ছলিহীনঃ দীর্ঘ এগারোটি মাস অতিক্রম করে সাক্ষাত মিলে পবিত্র মাহে রমজানের। যে মাসে প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ মুসলিমগনের উপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রোজার বিধান রাখা হয়েছে। বছরের এগারো মাস অবারিতভাবে আহার করে মাত্র একটি মাস দিনের বেলায় উপবাস থাকার কী তাৎপর্য রয়েছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন মুসলিম ও অমুসলিম চিকিৎসাবৈজ্ঞানিকগণ। যদিও রমজান আগমন করলে আমাদের মাথার উপর যতেষ্ট রোগ চেপে বসে যেমন ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক, পেটব্যাথা, হাঁপানি, প্রেসার, লো-প্রেসার আরো অনেকই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, রোজা পালন একজন সুস্থ মানুষের জন্য যতটুকু উপকারী, তার চেয়ে বেশী উপকার করে একজন অসুস্থ মানুষের। কেননা রোজা রাখলে নিশ্চত স্বাস্থ্য সুবিধা পাওয়া যায় তা একাধিক বৈজ্ঞানিকগণের গবেষণাতে প্রমাণিত হয়েছে। যাদের শরীরের ওজন বেশি এবং যাদের কম, উভয়ের জন্যই রোজার উপকারীতা রয়েছে। তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার কী উপকারীতা রয়েছে তা লক্ষ্য করি।

– বার্ধক্য প্রত্যেক মানুষের জীবনে অনিবার্য। এমন মানুষ কমই পাওয়া যাবে যে বার্ধক্য ভয় পায় না। বার্ধক্য মানুষের শরীর-মন দুইটাকেই ভারাক্রান্ত আর অসহায় করে তোলে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, রোজা রাখলে আয়ু বৃদ্ধি পায় ও এটির দ্বারা বার্ধক্য সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোকে দূরে রাখে। রোজা শরীরকে সতেজ করে তোলে।
– রোজা ক্যান্সারের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। রোজার সময়টুকুতে শরীরে জমে থাকা চর্বিগুলো ব্যবহৃত হয় এনার্জীর উৎস হিসেবে। আবার তা পুড়ে নিঃষেশিত হয়। এইভাবে শরীরের ওজন কমে যায়। এরই সাথে রোজায় থাকার ফলে দেহের যেসব সেল বা কোষ ভেতর থেকে ক্ষতগ্রস্থ করে, যা কিনা পরবর্তিতে ক্যান্সার রূপ নিতে পারে। সেগুলোকেও শরীর খেয়ে নেয় জ্বালানী হিসেবে। এতে করে শরীরে ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমে যায়।
– রোজা রাখার ফলে ডায়াবেটিকসের ঝুঁকি কমে। ডায়াবেটিকস আক্রান্তদের ক্যালরি গ্রহণে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। আর রোজা থাকলে ক্যালরি গ্রহণে বিকল্প একটি নিষেধাজ্ঞা কাজ করে। তাই এটি ডায়াবেটিকস সংক্রান্ত স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
– রোজা মানুষের শরীর থেকে চর্বি কমাতে সহায়তা করে। রোজা পালন অবস্থায় কমপক্ষে পনের ঘন্টা যাবতীয় খানাপিনা বন্ধ থাকে। এ সময় পাকস্থলী, অন্ত্রনালী, যকৃত, হৃদপিন্ডসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায়। তখন এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজেদের পুনর্গঠনে নিয়োজিত হতে পারে। অন্যদিকে দেহে যেসব চর্বি জমে শরীরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেগুলো রোজার সময় দেহের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য ছুটে যায়। চর্বি কমাতে মানুষ কত কসরতই না করে। প্রিয় খাবারগুলো ত্যাগ করে, শরীর নিয়ন্ত্রনে জিমে যায়, নিয়ম করে দৌড়ায়, আরও কত কিছু। কিন্তু অল্প সময়ের জন্যেও রোজা রাখলে বিপাক ক্রিয়া কয়েকভাগ বেড়ে যায়। যা চর্বি কমাতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।
– মস্তিষ্কের জন্যেও রোজা খুবই উপকারী। রোজা রাখলে নতুন স্নায়ু কোষগুলোর বৃদ্ধি দ্রুততর হয়। এতে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া রোজা রাখলে হরমোনের বৃদ্ধিও দ্রুত হয়। দুই দিন রোজা রাখলেই শরীরে হরমোন বাড়ার হার পাঁচ গুণ বাড়ে। তাহলে রোজাতো মস্তিষ্কেও জন্য যথেষ্ট কাজ করে।
– গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, রোজা বা উপবাস ব্যায়ামের চেয়েও কার্যকরভাবে হার্টবিট ও ব্লাড প্রেশার কমাতে পারে। যার ফলে রক্তচাপ কমায়।
– চিকিৎসাবৈজ্ঞানিকগণ রোজাকে ডিটোক্সিফিকেশন থেরাপি হিসেবে ঘোষনা করেছেন। তাদের মতে, আমরা সারা বছর অতিভোজ, অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল খাদ্য ইত্যাদি খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে জৈব বিষ জমা হয় তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রোজা পালনের ফলে তা সহজেই দূরীভূত হয়ে যায়। তাই রোজা একটি কার্যকরী ডিটোক্সিফিকেশন থেরাপি, যার ফলে ব্যক্তির শরীরে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থগুলি ভেংগে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
– কিডনী সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখলে এ সমস্যা আরো বেড়ে যাওয়ার আশংকায় রোজা পালন করতে চান না। অথচ আধুনিক চিকিৎসাবৈজ্ঞানিকগণ বলছেন, রোজা রাখলে কিডনীতে সঞ্চিত পাথর কণা ও চুন দূরীভূত হয়।
– স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. আব্রাহাম জে হেনরি রোজা সম্পর্কে বলেছেন, “রোজা হলো পরমহিতৈষী ঔষুধ বিশেষ। কারণ রোজা পালনের ফলে বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়।”
– নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশিষ্ট ঔষুধ ও শল্য চিকিৎসার প্রখ্যাত ডাঃ অ্যালেকসিস বলেছেন, উপবাসের মাধ্যমে লিভার রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয় ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। আভ্যন্তরীণ দেহ যন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হ্নদপিন্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। খাদ্যাভাব কিংবা আরাম-আয়েশের জন্য মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়।

সর্বোপরি, অসুস্থতা আমাদেরকে রোজা পালন করা থেকে বিরত রাখে কিন্তু রোজা আমাদের অসুস্থতাকে দূরে সরিয়ে দেয় যা চিকিৎসাবৈজ্ঞানিকগণের দীর্ঘ গবেষনার ফসল হিসেবে স্পষ্ট। তাই অসুস্থতার অজুহাতে রোজাকে পরিত্যাগ করা যথেষ্ট বোকামী হবে বরং রোজাকে প্রীতিপূর্ণভাবে গ্রহন করে অসুস্থতাকে নির্মূলের মাধ্যম হিসেবে গ্রহন করি।

– লেখক
এলএল.বি (সম্মান), এলএল.এম (অধ্যয়নরত)
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

x

Check Also

নিজ পল্লী নিবাসে প্রস্তুত এরশাদের কবর

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সমাধি ...