সাম্প্রতিক
dav

কৃষক আব্দুল খালেককে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তার আপন ভাই ও কুলাঙ্গার ভাতিজা


চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার জাঁহাপুর গ্রামে বৃদ্ধ কৃষক আব্দুল খালেককে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তার আপন ভাই ও কুলাঙ্গার ভাতিজা। গতকাল দুপুরে বোনকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে বাঁধা দিলে কুলাঙ্গার ছোট ভাই ও তার ছেলের হাতে প্রাণ হারাতে হয় হতভাগ্য বৃদ্ধ কৃষককে। এ ঘটনার পর থেকে ঘাতক ছোট ভাই ও ভাতিজা একরামুল পলাতক।
জানা গেছে, আলমডাঙ্গা উপজেলার ভেদামারী গ্রামের মৃত নূরবক্স মন্ডলের বড় ছেলে আব্দুল খালেক (৬৮) স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পার্শ্ববর্তি জাঁহাপুর গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় বসবাস করে আসছিলেন। বাড়ির পাশের জমিতে আব্দুল খালেকের এক বোন মিসরিদানার বসতবাড়ি। আব্দুল খালেকের মেজ ভাই আব্দুল লতিফ ও তার বড় ছেলে একরামুল (৪৩) মিসরিদানাকে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে দীর্ঘদিন ধরে অপচেষ্টা করে আসছিলেন। গতকাল ৭ এপ্রিল সকাল থেকে মিসরিদানার বসতবাড়ির জমি মাপজোক করা হচ্ছিল। এক পর্যায়ে দুপুর একটার দিকে আব্দুল লতিফ ও তার ছেলে একরামুল মিসরিদানাকে তার বসতভিটা ছেড়ে অন্য জমিতে উঠে যেতে চাপ সৃষ্টি করলে সকলের বড় আব্দুল খালেক বোনের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। প্রত্যক্ষদর্শিরা জানান,এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে আব্দুল লতিফ বড় ভাই আব্দুল খালেকের উপর চড়াও হয়ে কিলঘুষি মারতে থাকে। এক পর্যায়ে আব্দুল লতিফ ও তার ছেলে একরামুল বাঁশের লাঠি দিয়ে উপর্যুপরি পেটায়। আব্দুল খালেক মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কুলাঙ্গার ছোট ভাই আব্দুল লতিফ ও তার কুলাঙ্গার ছেলে একরামুল মিলে পাড়িয়ে দলিয়ে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করেন। হত্যার পর ভাতৃঘাতক আব্দুল লতিফ ও তার ঘাতক কুলাঙ্গার ছেলে একরামুলসহ পরিবারের সকলে ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়েছে। সংবাদ পেয়ে আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। বিকেলে লাশ উদ্ধার করে। আজ সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ চুয়াডাঙ্গার মর্গে নেওয়া হবে।
পুলিশের বক্তব্যঃ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) লুতফুল কবীর। তিনি বলেন, দুপুর ২টার দিকে এ হত্যাকান্ডের সংবাদ জানতে পেরে তিনি নিজে পুলিশের একটি মোবাইল টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। জানতে পারেন – জমিজমার সীমানা নিয়ে নিহত আব্দুল খালেক ও তার ছোট ভাই আব্দুল লতিফের মধ্যে ঝগড়া চলছিল। এক পর্যায়ে আব্দুল লতিফ জমির সীমানায় পুঁতে রাখা বাঁশের লাঠি তুলে নিয়ে তা দিয়ে বড় ভাই আব্দুল খালেককে পেটায়। আব্দুল খালেক লুটিয়ে পড়লে আব্দুল লতিফ ও তার ছেলে একরামুল দুজন মিলে পাড়িয়ে দলিয়ে নিস্তেজ করে পালিয়ে যায়। সে সময় প্রতিবেশিরা আব্দুল খালেককে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু ঘটে। পুলিশ ঘাতক বাপ-ছেলেকে আটক করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
যে কারণে বিরোধঃ নিহত আব্দুল খালেক মন্ডলের ৬ ভাই ও ৬ বোন। তাদের পিতা নূরবক্স মন্ডল মারা যাওয়ার পর থেকে পারিবারিক আদি বাস্তুভিটা ছাড়তে হয়েছে বাকী ৫ ভাইদের। একমাত্র মেজ ছেলে আব্দুল লতিফ আদি বাস্তুভিটায় বসবাস করেন। অন্য ভাইগুলি পার্শ্ববর্তি জাঁহাপুর গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় বসবাস করেন। বড় ভাই আব্দুল খালেকের বাড়ির পাশের জমি তাদের এক বোন মিসরিদানা বসবাস শুরু করেন। পারিবারিক ওই জমির ন্যায্য হিৎস্যা মিসরিদানাও পাবেন। তাছাড়া ওই জমির অংশ বিশেষ মিসরিদানা তার চাচার নিকট থেকেও ক্রয় করেছেন। রাস্তার পাশের ওই জমির দাম বর্তমানে বেশি হওয়ায় মিসরিদানার মেঝভাই ও ভাতৃপুত্র একরামুলের কুনজর পড়ে। তারা নানাভাবে মিসরিদানাকে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে অপচেষ্টা করে আসছিলেন। শেষ আপন স্বজনকেও নির্মমভাবে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করেনি।
যেমন বাপ তেমনি ছেলেঃ শুধু একরামুল না, তার বাপ আব্দুল লতিফ অত্যন্ত লোভী ও হিংস্র প্রকৃতির। আব্দুল লতিফের ভাই আব্দুল মজিদ জানান, আব্দুল লতিফ নিজ বাপকে মারধর করে ২২ কাঠা জমি বেশি করে নিজ নামে লিখে নিয়েছিল। এতেও অন্যান্য ভাই আপত্তি তোলেনি। কিন্তু বাপ মারা যাওয়ার পর আব্দুল লতিফ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠে। শুধু আব্দুল লতিফ নিজেই না, তার বড় ছেলে কুলাঙ্গার একরামুলকে সাথে নিয়ে বড় ভাই আব্দুল খালেকসহ অন্যান্য ৫ ভাইকে মারধর ও হেনস্থা করে পিতৃ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করেছে। তারা পৈত্রিক বাড়িঘর ছেড়ে পার্শ্ববর্তি জাঁহাপুর গ্রামের বিভিন্ন অংশে বসবাস করছেন। গ্রামসূত্রে জানা যায়, একরামুলের সাথে তার বাপ আব্দুল লতিফ নিজেও আপন ভাই-বোন, চাচাতো ভাই ও প্রতিবেশিদের সাথে মারামারি-ফ্যাসাদ করে বেড়ায়।
রাজনৈতি ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সামাজিক আগাছা ঘাতক কুলাঙ্গার একরামুলঃ ইতোপূর্বে ঘাতক কুলাঙ্গার একরামুল নিহত চাচা বৃদ্ধ আব্দুল খালেককে মারপিট করে হাত ভেঙ্গে দেয়। শুধু বড় চাচা আব্দুল খালেককেই মারপিট করেনি, অন্য চাচা আব্দুল মজিদকে প্রায় ৩ মাস আগে মারপিট করেছে। ৫/৭ মাস আগে আরেক চাচা আব্দুস সাত্তারকে রামদা দিয়ে ঘাড়ে কোপ মারে। শেষ পর্যন্ত চাচা আব্দুস সাত্তার পৈত্রিক ভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়। শুধু আপন চাচা না, বাপের আপন চাচাতো ভাই জাকারিয়া ও কলমকেও কুপিয়েছে কুলাঙ্গার একরামুল। আরেক চাচা আব্দুল হাকিমের স্ত্রীও এ কুলাঙ্গারের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। কুপিয়েছে একই গ্রামের জিকিয়ালের স্ত্রী ও উম্বাদকে। রামদার কোপ খেয়ে ভাগ্যজোরে বেঁচে আছেন উম্বাদ আলী। এমন হাজারও অভিযোগ গ্রামবাসি তুলেছেন একরামুলের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলে বলেছেন, অসুস্থ মানসিকতার একরামুল সব সময় সাথে হয় রামদা, না হয় চাইনিজ কুড়াল অথবা হাতুড়ি নিয়ে ঘুরতেন। গ্রামে গন্ডগোল বা বিরোধ হলে সে কয়েক দফা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে ভয় দেখিয়েছে। তাকে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঘৃণা করত। কিন্তু যতেষ্ঠ বয়স হওয়া সত্বেও এলাকায় তার বিয়ে হয়নি। একাধিকবার তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। এহেন জঘন্য প্রকৃতির একরামুলকে মানুষ ঘৃণা করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলত না বিশেষ রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে।
নিহত বৃদ্ধ কৃষক আব্দুল খালেকের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে। ২ মেয়েই বিবাহিত। ছেলেদের মধ্যে ২ ছেলে বিদেশ থাকেন। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় আজ ৮ এপ্রিল আলমডাঙ্গা থানায় এজাহার দায়ের করা হবে।