সাম্প্রতিক

কঠোর পর্যবেক্ষণে এমপিরা

 আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন টানা তৃতীয়বারের সরকারের মন্ত্রীদের পর এবার এমপিদের ওপর নজরদারি শুরু হয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় কঠোর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া অনুশাসনগুলো এমপিরা যথাযথভাবে মেনে চলছেন কিনা এ বিষয়টি খেয়াল রাখা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। ক্ষমতার দাপটে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতিকে নিয়ম বানিয়ে ফেলা এমপিদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতের লক্ষেই এমনটি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা দেশ পরিচালনার সুযোগ পাওয়ায় মন্ত্রী-এমপিরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলছেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ও সরকারের নানা উন্নয়ন প্রকল্পে হস্তক্ষেপ করছেন। প্রশাসনে রদবদলের জন্য চাপ প্রয়োগ এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজেরা বাণিজ্য করে চলেছেন। এসব কারণে আমলার তো বটেই মন্ত্রীরাও অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন। এই অবস্থায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে নিয়ে আসেন কেউ কেউ। তারপরই সরকার প্রধান এমপিদের জন্য ১০টি অনুশাসন জারি করে সবাইকে এই অনুশাসনগুলো মেনে চলার নির্দেশ দেন।

একাদশ সংসদের এমপিদের সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া অনুশসানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ক্ষমতার জোর ঠেকানো। অনেকে এমপি হওয়ার পর ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ও সেগুলোর প্রসার ঘটান। তাই যে কাজের জন্য যোগ্য নন, সেই ধরনের কাজ যেন কোন এমপি না পান, এই বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এমন কিছু করা যাবে না যাতে করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। অভিযোগ আছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রায় সময়ই অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় এমপিরা। এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গুটিকয়েক নেতার সুবিধার জন্য কোন উন্নয়ন পরিকল্পনার মাস্টারপ্ল্যানে পরিবর্তন করা হবে না।

বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ ও সহায়তা অনেক সময় এমপিদের হস্তক্ষেপের কারণে সঠিক লোকের কাছে যায় না। প্রকৃত দরিদ্র, বিধবা বা বয়স্ককে না দিয়ে টাকা এমপিদের পছন্দের লোকদের দেয়া হয়। এর ফলে এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের বদনাম হয় এবং দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এসব যেন না হয় সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পক্ষপাতহীনভাবে এসব বিষয়ের তদারকি নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে।

এদিকে এমপিদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে বহুবার। এবার নতুন সরকার গঠনের পর প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। নিয়োগের ব্যাপারে এমপিদের পক্ষ থেকে কোন ডিও লেটার দেয়া যাবে না। যদি কেউ দেয় তাহলে সেই প্রার্থীকেই অযোগ্য বিবেচনা করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে টেন্ডার বা সরকারি কোনো কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না এমপিরা। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বজনপ্রীতির ব্যাপারেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সরকার প্রধানের। দেখা গেছে, এমপিরা যখনই নির্বাচিত হন, তখনই নিজেদের একটি বলয় তৈরি করার চেষ্টা করেন এবং স্বজনপ্রীতি দেখাতে শুরু করেন। এর ফলে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে এবার নজর রাখা হচ্ছে। অভিযোগের প্রমাণ পেলেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের গত দুই মেয়াদে এমপিরা তাদের পছন্দমতো স্থানীয় প্রশাসন ঢেলে সাজিয়েছেন এবং এর জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা পুলিশ সদর দপ্তরে তদবিরও করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসপি বা ওসি পদে এমপিরা সবসময় তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের বসাতে চান। এবার এটি সম্পূর্ণ রূপে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় প্রশাসনে নিয়োগ হবে কেন্দ্রীয়ভাবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। এমপিরা নিজ এলাকায় থানার উপর খবরদারি করেন এবং বিভিন্ন মামলার আসামি ও জামিনে হস্তক্ষেপ করেন। এতে হয়রানির শিকার হন অনেকেই। এবার এ ব্যাপারেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিগত সময়ে বিশেষ করে ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর থেকেই বিভিন্ন দল থেকে বিশেষ করে

বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের নিজেদের দলের ভেড়ানোয় মেতে উঠেছিলেন এমপিরা। এবার নির্বাচনের আগেই এ বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার গঠনের পর সংসদীয় প্রথম বৈঠকেই তিনি এ ব্যাপারে এমপিদের উপর নিষেদাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এদিকে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা যে মূল লক্ষ্যগুলো স্থির করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যেটি দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ প্রান্তেই শুরু হয়েছিল। স্থানীয় কোন এমপি যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কোন সম্পর্ক বা পৃষ্ঠপোষকতা না করেন সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।