সাম্প্রতিক

ওসি মোয়াজ্জেমের প্রতি পুলিশের ‘দরদ’

গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রায় তিন সপ্তাহ পর ধরা পড়লেন। রাতে চলল ‘আদর, আপ্যায়ন’। আইনের বিধান মেনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে নেয়া হলো। কিন্তু গোটা প্রক্রিয়ায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন অস্বাভাবিক ‘কদর’ পেলেন পুলিশের কাছে।

পুলিশ প্রতিদিনই আসামি ধরে আদালতে নেয়, কিন্তু এই ধরনের ‘আপ্যায়ন’ দেখা যায় না। বিশেষ করে আদালত গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া কাউকে তো নয়ই। নানা সময় ছোটখাটো অভিযোগ নিয়ে আদালতে তোলা মানুষদের হাতকড়া পরিয়ে বা কোমরে রশি বেঁধে নেয়া হয়েছে আদালতে। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেমের হাতও ধরেনি কেউ। তাকে কেবল ঘিরে রাখা হয়। সাংবাদিকরা যেন তার ছবি তুলতে না পারে, সে চেষ্টাও পুলিশ করেছে আপ্রাণ। প্রশ্ন উটেছে, পুলিশ তার নিজের বাহিনীর এই কর্মকর্তার বিষয়ে নমনীয় কেন।

সোমবার ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে হাজির করার সময়  ওসি মোয়াজ্জেমের বেশভুষা ছিল পরিপাটি। ইস্ত্রি করা গেঞ্জি পরে ছিলেন। চোখে ছিল কালো একটি সানগ্লাস। বেশ কয়েকদিনের কা কাটা দাড়িগুলো মোটেও এবরোথেবরো ছিল না। মনে হচ্ছিল বেশ যত্নে বড় হয়েছে সেগুলো। চেহারাতেও কোনো উদ্বেগ ছিল না। মনে হচ্ছিল নাটক, সিনেমার কোনো আলোচিত চরিত্র।

ওসি মোয়াজ্জেমকে পুলিশের এই ‘খাতির করা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গণমাধ্যমকর্মী শহিদুল ইসলাম। তিনি লিখেন, ‘হাজার হাজার মিথ্যা মামলার আসামিদের হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তোলার নজির পুলিশের অভাব নেই। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানো খবর বহুবার গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার আসামি হয়েও তাকে হাতকড়া পরায়নি পুলিশ।’

ওসি মোয়াজ্জেমের প্রতি এই আচরণ পক্ষপাত কি না- জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা অঞ্চলের উপ কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘ওটা ওসিকে জিজ্ঞাসা করেন। আমি কি থানায় বসে এসব দেখব?’

এ ব্যাপারে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান বলেন, ‘প্রিজন ভ্যানে কোন আসামিকে হাতকড়া পড়ানো হয় না। আপনি আগে ভালো করে জানেন। ধন্যবাদ।’

মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেন, ‘কোনো ব্যক্তিকে হাতকড়া পরাতে হবে কি না তার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে আমাদের দেশে সাধারণত পুলিশ অপরাধীদের হাতকড়া পরিয়ে থাকে। তাহলে মোয়াজ্জেম হোসেনকে কেন পরানো হলো না এটা একটি প্রশ্ন। এক্ষেত্রে পুলিশের একটি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ দেখা যায়। সকল ব্যক্তিকে হাত কড়া পরানো হলেও মোয়াজ্জেমকে কেন নয়?’

ফেনীর কিশোরী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার পর সোনাগাজী থানায় গিয়ে তার একটি ভিডিও জবানবন্দী ফাঁস হয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। অভিযোগ উঠে, বেআইনিভাবে ভিডিও রেকর্ড করে মেয়েটিকে হেয় করতে ফেসবুকে ছেড়ে দেন ওসি মোয়াজ্জেম।

গত ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে আসামি করে ঢাকায় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ওই অভিযোগের সত্যতা পায়। এরপর সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিচারক আস সামছ জগলুল হোসেন গত ২৭ মে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

নুসরাতের মৃত্যুর পর ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রথমে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করে রংপুর রেঞ্জে পাঠান হয়। পরে তাকে বরখাস্ত করা হয় পুলিশ বাহিনী থেকে।

কিন্তু আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিলে তা তামিল করা নিয়ে ফেনী ও রংপুর পুলিশের মধ্যে বেশ কয়েক দিন ঠেলাঠেলি চলে। এই সুযোগে পালিয়ে যান মোয়াজ্জেম। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়েও আদালতের আদেশকে সম্মান না করা এই কর্মকর্তা ধরা পড়েন রবিবার।

রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় ধরা পড়ার পর রাতে শাহবাগ থানায় রাখা হয় মোয়াজ্জেমকে। সাধারণত আসামিকে হাজতে রাখা হলেও তাকে সেখানে নেয়া হয়নি।

গ্রেপ্তারের পর রাতে ওসি মোয়াজ্জেম শাহবাগ থানায় অফিসারদের কক্ষেই ঘুমিয়েছেন। সকালে প্রিজন ভ্যানে তোলার আগে পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মাহবুবুর রহমানের কক্ষে সকালের নাস্তাও সেড়েছেন তিনি।

ট্রাইব্যুনালের ভেতরেও মোয়াজ্জেমকে ঘিরে ছিল পুলিশ সদস্যরা। এ সময় তাকে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায়।

আদালত চত্বরে মোয়াজ্জেমের ছবি তুলতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে ফটোসাংবাদিকদের। অভিযোগ করা হয়েছে, নিরাপত্তার কথা বলে প্রিজনভ্যান থেকে নামানোর পর সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ গণমাধ্যমকর্মীদের তার ছবি তুলতে বাধা দেয়।

একজন গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেমের ছবি তুলতে এবং ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে অনেক ফটোসাংবাদিক ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিক পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহ আহত হয়েছেন। পুলিশ কেন এমন আচরণ করল?’

অন্য আসামিদের হাতকড়া পড়ানো হলেও তাকে কেন পড়ানো হয়নি এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার বাদী সাইয়েদুল হক সুমন।

পরে সাংবাদিকদের সুমন বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেমকে হাতে হাতকড়া দিয়ে আনা হয়নি। সে বিষয়ে পুলিশ ভালো জানেন কেন আনেননি। তবে পুলিশ ভাইয়দের কাছে অনুরোধ করে বলেন, অন্য আসামিদের বেলায়ও যেন একই ট্রিটমেন্ট করা হয়।’

‘যিনি আইনের রক্ষক ছিলেন, পুলিশ বাহিনীর হয়ে আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির পর আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আদালত আত্মসমর্পন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে সাধারণ জনগণের মতো ওয়ারেন্টকে ভয় পেয়ে পলাতক হন। পলাতক অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।’

‘ওসি মোয়াজ্জেম যদি নির্দোষ হতেন, তাহলে তিনি পলাতক হতেন না। উনি দোষী তাই গ্রেপ্তার পরোয়ানি জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পলাতক হয়েছেন, যা পুলিশ বাহিনীকে কলঙ্কিত করেছে।’

x

Check Also

কুষ্টিয়ায় কলেজের অধ্যক্ষের ১০বছর কারাদন্ড

কুষ্টিয়া মডেল থানায় কলেজ শিক্ষিকার শ্লীলতাহানি মামলায় একই কলেজের অধ্যক্ষের ১০বছর কারাদন্ড ও এক লক্ষ ...