সাম্প্রতিক

এক নজরে মুজিবনগর !! যেখানে আসলেই মনে পরে যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধার কথা।।

শাকিল রেজ/মুজিবনগরঃ চমৎকার একটি আম বাগান।আম্রকাননটির মালিক ছিলেন কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের ভবের পাড়ার গ্রামের জমিদার বৈদ্যনাথ বাবু। বৈদ্যনাথ বাবুর নামানুসারেই যায়গাটির নাম হয়ে যায় বৈদ্যনাথ তলা। আম বাগান বা বৈদ্যনাথতলাতে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার, পাঠ করা হয় বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।
শপথগ্রহণ এবং ঘোষণাপত্র পাঠের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একটি বিবৃতি পাঠ করেন এবং বৈদ্যনাথতলার নাম রাখেন
মুজিবনগর। সেই থেকে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার নাম হয় মুজিবনগর। সেদিন মুজিবনগরকে অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশের
রাজধানী ঘোষণা করা হয়। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু জায়গাটি সঠিকভাবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনার পর মুজিবনগর সরকারকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসের দিন মুজিবনগর স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণেরIMG_20170415_070808_405.jpg
ভিত্তিপ্রস্তার স্থাপন করা হয়।মূলত, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ মুজিবনগরকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীনতার স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ স্তরের স্মৃতিসৌধ
গড়ে তোলেন। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন হয় তারই হাতে। স্মৃতিসৌধের নকশা স্থপতি তানভীর করিম। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা
মুজিবনগর কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজে হাত দেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় স্থান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ।

এক নজরে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সঃ

প্রায় ৮০ একর জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। আম্রকাননের জায়গার পরিমাণ প্রায় ৪০ একর। এখানে আম গাছ রয়েছে প্রায় ১০০০টি ।Mujib_Nagar1.jpg তিনটি ধাপে ছয় স্তর বিশিষ্ট দুটি গোলাপ বাগান। বাগান দুটিতে গোলাপ আছে প্রায় ২০০০ । এখানে আছে বঙ্গবন্ধু তোরণ, অডিটোরিয়াম, শেখ হাসিনা মঞ্চ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকেন্দ্র, মসজিদ, হেলিপ্যাড, ২৩টি কংক্রিটের ত্রিকোণ দেয়ালের সমন্বয়ে উদিয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিকে প্রতীক করে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, প্রশাসনিক ভবন, টেনিস মাঠ, পর্যটন মোটেল, স্বাধীনতা মাঠ, স্বাধীনতা পাঠাগার, বিশ্রামাগার, পোষ্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, শিশুপল্লী, ডরমেটরি ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র।

বাংলাদেশের মানচিত্রঃ

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি এখানে রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র। আমাদের যুদ্ধকালীন অবস্থার রূপক এটি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১টি
সেক্টরকে ভাগ করে দেখানো হয়েছে মানচিত্রে।
মানচিত্রের উত্তর দিকটা উঁচু থেকে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণ দিকটা ঢালু করা হয়েছে। এবং সমুদ্র তীরবর্তি অঞ্চলসমূহকে দেখানো
হয়েছে পানির ওপর ভাসমান। কমপ্লেক্সের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ভাস্কর্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, ঐতিহাসিক তেলিয়া পাড়া সম্মেলন,
মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, পাকবাহিনীর আত্নসমর্পণ, রাজাকার আল বদর, আল সামস এর সহযোগিতায় বাঙ্গালী নারী পুরুষের ওপর পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনসহ খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধঃ

স্মৃতিসৌধের মূল নকশা স্থপতি তানভীর করিমের। এটি বাংলাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। স্মৃতিসৌধ স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য ১৬০ ফুট ব্যাসের গোলাকার স্তম্ভের উপর মূল বেদীকে কেন্দ্র করে ২০ ইঞ্চির ২৩টি দেয়াল। দেয়ালগুলো উদিয়মান সূর্যের প্রতীক। ৩০ লক্ষ শহীদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখার জন্যMujibnogar-Pic-01.jpg
স্মৃতিসৌধের মেঝেতে ৩০ লাখ পাথর বসানো হয়েছে। স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে লাল মঞ্চ, ২৩টি স্তম্ভ, বুদ্ধিজীবীর খুলি, ৩০ লক্ষ শহীদ, রক্তের সাগর এবং ঐক্যবদ্ধ সাড়ে সাত কোটি জনতা। স্বাধীনতার রক্তাক্ত  সূর্যের মাধ্যমে লাল মঞ্চকে তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়েই অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। ২৩টি স্তম্ভ হল ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসন নিপীড়নসহ বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলন ও স্বাধীনতার প্রতীক। স্মৃতিসৌধের মূল
বেদীতে গোলাকার বৃত্তের মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবীর খুলি বোঝানো হয়েছে। স্মৃতিসৌধের মূল বেদীতে ওঠার জন্য মোট ১১টি সিড়ি ব্যবহার করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন
সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা যে ১১টি সেক্টরে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করেছেন ১১টি সিড়ি সেই ১১টি সেক্টরের প্রতীক। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হলো স্মৃতিসৌধের
মূল ফটক ধরে এগিয়ে চলা পথটি। পথটি শেষ হয়েছে রক্তের সাগর নামক ঢালু প্রান্ত ছুঁয়ে। স্বাধীনতার লাল মঞ্চ থেকে যে
২৩টি দেয়াল সৃষ্টি হয়েছে, সে সব দেয়ালের ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করার জন্য অসংখ্য নুড়িপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এই নুড়িপাথর
গুলো সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতার প্রতীক।

শেষ কথাঃ

কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার কথা ছিলো না। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল
ভারতের আগরতলায় এক সভায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত কুষ্টিয়া জেলার মহকুমা চুয়াডাঙ্গাকে বেছে নেওয়া হয় এবং ১৪ এপ্রিল
অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণের তারিখ চূড়ান্ত হয়। কিন্তু শপথ গ্রহণের তারিখ সে সময় আকাশবানী কলকাতা কেন্দ্রে প্রচার
হলে বিদেশি সাংবাদিকসহ পাকহানাদার বাহিনী ঘটনা জেনে ফেলে। চুয়াডাঙ্গার ওপর পাকবাহিনী আক্রোশে ফেটে পড়ে। ব্যাপক
বোমা হামলা চালিয়ে পাকহানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। হার্ডিং ব্রীজ উড়িয়ে দেবার জন্য গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। চুয়াডাঙ্গা দখল ও পাকহানাদার বাহিনীর দ্বারা হার্ডিং ব্রীজ আক্রান্ত হলে শপথ অনুষ্ঠানের সময় ও যায়গা পাল্টে যায়।নপরবর্তীতে শপথ অনুষ্ঠানের জন্য ভারত সীমান্তবর্তী বৈদনাথতলা বা মুজিবনগরকে বেছে নেওয়া হয়। এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালের জুন মাসে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত কাজ
শেষ করে তা উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তারপরও দর্শনার্থীর ভিড়ে জায়গাটি প্রতিদিন সরগম থাকে। মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস।

x

Check Also

প্রসাদ খাইয়ে স্কুলে মন্ত্র পাঠ করিয়ে থাকে, তবে সেটা অন্যায়।’ হাইকোর্ট

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ...