সাম্প্রতিক

আমার হুমায়ূন জগৎ

আজ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এক পুরুষের মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিন তাঁকে বাংলাদেশে ঘটা করেই স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেল তাঁর স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক গোষ্ঠী সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর পাশাপাশি সাহিত্য ম্যাগাজিনগুলোও তাঁকে স্মরণ করতে ভোলেন না। ভুলবে কী করে, তিনি তো বাংলা ভাষা ভাষীদের মনে একটা পাকা আসন করে নিয়েছেন। কার কথা বলছি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন। হ্যাঁ, নন্দিত কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমদের কথাই বলছি। হুমায়ূন আহমদকে নিয়ে আমার জানাশোনা তেমন নেই। তবে তাঁর সাথে আমার কিছু ঘটনা আছে। ঘটনা বলতে সরাসরি তাঁর সাথে তা নয়, তাঁর বই নিয়ে ঘটনা।

হুমায়ূন আহমেদকে আমি চিনেছি হয়তো সবার পরে। যখন বাংলা ভাষা ভাষীদের মুখে মুখে তাঁর নাম। তখন মনে পড়ল ছোটবেলায় বিটিভিতে দেখা “আলো আমার আলো” ধারাবাহিক নাটকের কথা। নাটকটি তিনি রচনা ও পরিচালনা করেছিলেন। ছোটবেলায় ওই নাটকটা দেখার জন্য পড়াশোনা বাদ দিয়ে টিভি নিয়ে বসে পড়তাম। কিন্তু এতদিন পড়ে জানলাম, তিনি শুধু নাটকই লেখেন না, গল্প উপন্যাসও লেখেন। সেই সময় মোটামুটি বই পড়ার নেশাটা আমার উপরে প্রবল আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। তাই আমার এক ছোট বোনের কাছে জানতে চাইলাম, সে হুমায়ূন আহমদকে চেনে কি না। সে তো আমার কথা শুনে হেসেই অস্থির। বাংলাদেশে থেকে হুমায়ূন আহমদকে চেনে না এমন কেউ আছে ! আমি বললাম, আমিই তো ছিলাম। কয়েকদিন আগে জানলাম, তিনি লেখালেখি করেন এবং অনেক ভালোও লেখেন নাকি। সে আমার এই কথা শুনে আরও হাসি আরম্ভ করল। শেষমেষ তার কাছ থেকে আমি হুমায়ূন আহমদের ‘নন্দিত নরকে’ বইটি পড়ার জন্য নিয়েছিলাম। পরে আরেক জনের কাছ থেকে সংগ্রহ করলাম ‘শঙ্খনীল কারাগার’। এই দুটো বই নিয়েই হুমায়ূন আহমদে হাতেখড়ি আমার। সত্যি কথা বলতে- সে সময় খুবই মুগ্ধ হয়েছিলাম। সে সময় বয়সও অনেক কম ছিল তাই ভালোলাগা থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না। তাই পর পর তাঁর বেশ কয়েকটা বই সংগ্রহ করলাম লাইব্রেরি থেকে, কিছু বই বন্ধুদের কাছ থেকে আর কয়েকটা বই কিনে। তারপর শুরু হলো পড়া।

ওই যা পড়েছি তারপর আর হুমায়ূন আহমদে তেমন ফিরে তাকাবার সময় পাইনি। অধিকাংশ সময় বিদেশি বইয়ের উপরেই আসক্ত থাকার কারণেই এমনটা। কেন যেন বাংলাদেশি বর্তমান লেখকদের লেখার প্রতি মন টানে না।

একবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিকে। লেখালেখির সাথে জড়িত থাকায় এলাকায় সাহিত্য অনুষ্ঠান কিংবা কবিতা পাঠের আসরে হলে দাওয়াত পেতাম। সম্ভবত হুমায়ূন আহমদের জন্মদিনেই হবে। হঠাৎ করে আমার মোবাইলে কল আসলো- আজ হুমায়ূন আহমদের জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা আছে। অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যার দিকে। সময় মতো উপস্থিত হলাম অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানও শুরু হলো। উপস্থাপক উপস্থাপনা শুরু করলেন। একটু খেয়াল করে দেখলাম- উপস্থাপক হুমায়ূন আহমদ সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। তাই তাকে কবি বলে সম্বোধন করছেন। বিষয়টা তেমন কিছু মনে হয়নি। কারণ তিনি বেশকিছু কবিতাও লিখেছেন। তাই প্রসঙ্গটা আমুলে নিলাম না। কিন্তু বিষয়টা তখন আমার মনে একটা প্রবল হাসির জন্ম দিল যখন পাশে থেকে একজন বলে দিলেন- আরে কবি না, নাট্যকার। তার কথা শুনে সঞ্চালক হুমায়ূন আহমদকে নাট্যকার বলে সম্বোধন শুরু করলেন। বিষয়টা এখানেই থেমে যেতে পারত, কিন্তু আরও একটু এগুলো। তার আগে বলে রাখি আমাদের শহরে এ ধরনের অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত হন, সবাই বক্তা। নিছক আমিও ছিলাম। তো আমার যখন বক্তব্যের পালা আসল তার আগে এক ভদ্রলোক তার বক্তব্যে হুমায়ূন আহমদকে একাধিক বিশেষণ দ্বারা বিশেষায়িত করে গেছেন। লাইটা হুবহু মনে নেই, তবে অনেকটা এই রকম- “আজ বাংলাদেশের, বাংলা সাহিত্যের এবং আমাদের প্রিয় গল্পকার, নাট্যকার, উপন্যাসিক, গীতিকার এবং সিনেমা পরিচালক হুমায়ূন আহমদের জন্মদিন। আমরা তাঁকে অনেক ভালোবাসি, অনেক শ্রদ্ধা করি। আজ তাকে গভীরভাবে স্মরণ করি।” এত বিশেষণযুক্ত বক্তব্যের পরে বক্তব্য দেওয়াটা আমার জন্য অনেক কঠিন ছিল ভেবে মনে মনে ভেবেছিলাম বক্তব্য দেব না। আমিতো এতো কিছু জানি না হুমায়ূন আহমদ সম্পর্কে। তবু আমাকে বক্তব্য দিতে হবে। আমি দাঁড়িয়ে বললাম- আমার সামনে উপস্থিত অতিথিশ্রোতাবৃন্দ, আজ বাংলাদেশের একজন মহান এবং সর্ববিশেষণাশ্রয়ী সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদের জন্মদিন। আমাদের পক্ষথেকে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

আমার হুমায়ূন আহমদ বলতে এইরকমই কিছু মজার ঘটনা। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে হুমায়ূন আহমদকে গভীরভাবে স্মরণ করছি।

-আতিকুর রহমান ফরায়েজী