সাম্প্রতিক

ইয়াবা পাচারে নতুন কৌশল ‘হেলিকপ্টার সার্ভিস’

বর্তমানে দেশে প্রজন্ম ধ্বংসকারী সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ মাদকদ্রব্যটির নাম ‘ইয়াবা’। ইয়াবাকে বলা হয় ‘আপার ড্রাগ’। কারণ এটি গ্রহণ করলে শুরুতে গ্রহণকারী শারীরিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু ইয়াবা নামক মৃত্যু ট্যাবলেটের ভয়াবহতা জানার পরেও আগ্রহ কমেনি মাদকসেবীদের। বরং এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকার মধ্যেও চাহিদা বেশি থাকার কারণে ইয়াবা আমদানিতে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে বেসরকারি হেলিকপ্টারকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।

মন্ত্রণালয় বলছে, কক্সবাজার থেকে হেলিকপ্টারে করে মাদক চোরাচালানের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য দিয়েছে। যেহেতু হেলিকপ্টারের যাত্রীদের তেমন কোনও নিরাপত্তাবলয়ের মাধ্যমে যেতে হয় না এবং পণ্য পরিবহনের সময় স্ক্যানিংয়ের যথাযথ ব্যবস্থা নেই, তাই এতদিন ব্যাপারটি কারও নজরে আসেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এ নিয়ে ৬টি বেসরকারি হেলিকপ্টার সার্ভিসের মালিকদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটিও। অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহনের যাত্রীদেরও এই সন্দেহের বাইরে রাখা হয়নি। এজন্য নজরদারি ও নিরাপত্তা স্ক্যানিং আরও নিবিড় করতে বলা হয়েছে। বেসরকারি হেলিকপ্টারগুলোকে উড্ডয়নের ৬ ঘণ্টা আগে সিভিল অ্যাভিয়েশনের অনুমতি নিতে হয়। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা এই অনুমতি নেয় না। যাত্রীদেরও তেমন নিরাপত্তা তল্লাশি করা হয় না। যদিও এই দুটোই আইন অনুযায়ী কড়াকড়ি করতে বলা হয়েছে।

এ নিয়ে গেল ৩ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘হেলিকপ্টারে এবং উড়োজাহাজের যাত্রীদের মাধ্যমে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের গোয়েন্দা তথ্য আছে। হেলিকপ্টারের যাত্রীদের যথাযথ স্ক্যানিং না করায় তারা এই সুযোগ নিচ্ছে।’

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকেও মাদক পরিবহন প্রতিরোধে হেলিকপ্টার ব্যবহারে সতর্কতা জারি করতে বলা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গেল ফেব্রুয়ারিতে ১১ লাখ ২০ হাজার ২৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ৭৫ হাজার ৩০০ টাকা। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় ৩১৩ জনকে গ্রেফতার এবং ১৫৫টি মামলা করা হয়েছে। এছাড়া ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করে।

এদিকে গত বছর পবিত্র কোরআন শরীফের ভেতরে করে অভিনব উপায়ে পাচার করার সময় টেকনাফে ১৫ হাজার ৪৩২ পিস ইয়াবাসহ ৩ রোহিঙ্গাকে আটক করেছিল বিজিবি। আবার মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও পাচার হচ্ছে।

আর গত ৩ এপ্রিল দুপুরে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ মর্গে এক নারীর লাশের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে দেড় হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। ৪০ বছর বয়সী ওই নারীর পরিচয় পাওয়া যায়নি। ঘটনার একদিন আগে সন্ধ্যার দিকে দুজন লোক এই নারীকে হৃদরোগ ইস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসক দেখে তাকে মৃত ঘোষণা করলে ওই দুজন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার কথা বলে বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। ওই নারীর পেটে মোট ৫৭ প্যাকেট ইয়াবা পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা পাচার রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ফলে শতাধিকের বেশি ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করছে। তবে স্থলপথে নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করে সমুদ্রপথকে বেছে নিয়েছে। এজন্য সাগরপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইয়াবা পরিবহনকারীরা ধরা না পড়ায় মূলহোতাদের সহজে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত কোনও ব্যক্তি পার পাবে না।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে আটক করেছি। কিন্তু আরো অনেক বাইরে রয়ে গেছে। যারা এখনও বাইরে আছে তারা কৌশল পরিবর্তন করছে, রুট পরিবর্তন করছে। আর নতুন লোকজনকে যুক্ত করছে। তারপরও ইয়াবা পাচার অনেক কমেছে, বন্ধ হয়নি সত্য।’

র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার কার্যালয়ের কোম্পানি কমান্ডার (অধিনায়ক) মেজর মেহেদী হাসান বলেন, ‘হেলিকপ্টারে করে ইয়াবা পাচারের খবর আমাদের কাছে আগেই ছিল। আমরা আগে থেকেই হেলিকপ্টারে নজরদারি রেখেছি এবং বেশকিছু মেডিক্যাল হেলিকপ্টার তল্লাশিও চালিয়েছিলাম। তবে আমাদের জনবল ও বিভিন্ন সংকটের কারণে অনেককিছুর ওপর নজরদারি রাখতে সমস্যা হয়।’

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব) এর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসা একটি লাভজনক ব্যবসা। ইয়াবা পাচারে নতুন রুট যেমন ব্যবহার হচ্ছে। নতুন নতুন মুখও যোগ হচ্ছে।’