সাম্প্রতিক

চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রস্তুত হচ্ছে না ফাঁপা ইটঃপ্রধান সড়কের সাথেই অধিকাংশ ইটভাটা

রহমান মুকুলঃ পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ইট ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সব গুরুত্বপূর্ণ ধারা লংঘন করে দোর্দন্ড প্রতাবে চলছে জেলার বৈধ-অবৈধ প্রায় সকল ইটভাটা। জেলার প্রায় সকল ইটভাটা প্রধান প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত। ফলে একটু বৃষ্টিতেই যাতায়াতকারিদের ভোগান্তির অন্ত নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রির কার্যালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্বেও ফাঁপা ইট প্রস্তুত করছে না কোন ইটভাটা। বছরের পর বছর প্রচলিত ইটভাটা, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কিংবা প্রধানমন্ত্রির কার্যালয়ের নির্দেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিব্যি চলছে জেলার সকল বৈধ-অবৈধ ইটভাটা।
সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট ৮৬টি ইটভাটা রয়েছে। তার মধ্যে বৈধ ইটভাটা রয়েছে মাত্র ২৬টি। অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা বৈধ ইটভাটার প্রায় সোয়া ৩ গুণ অর্থাৎ ৬০টি। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ইটভাটার সংখ্যা মোট ২১টি। তার মধ্যে বৈধ মাত্র ৮টি। আলমডাঙ্গা উপজেলায় মোট ১৮টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ মাত্র ৫টি। দামুঢ়হুদা উপজেলায় মোট ২৬টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ মাত্র ৬টি ও জীবননগর উপজেলায় মোট ২১টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ মাত্র ৭টি ইটভাটা।
হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ইটভাটা বাদে জেলার প্রায় সবগুলি ইটভাটায় প্রধান প্রধান সড়কের সাথেই অবস্থিত। ফলে জনসাধারণের ভোগান্তির অন্ত নেই। সীমাহীন ভোগান্তির সৃষ্টি হয় যখন বৃষ্টি হয়। যত কাঙ্খিত বৃষ্টিই হোক জনজীবনে ভোগান্তি ডেকে আনে। আলমডাঙ্গা – ফরিদপুর সড়কের আলমডাঙ্গা পৌর এলাকাধীন এলজিইডি’র সড়কের কিনার ঘেষে অবস্থিত দু’ দু’টি ইটভাটা। এসবিএন ব্রিকস ও আরএনবি ব্রিকস নামে দু’টি পাশাপাশি ইটভাটা।আলমডাঙ্গা-জামজামি সড়কে যমুনা মাঠের জেএসবি ব্রিকস, বন্ডবিল – মাদারহুদা সড়কে অবস্থিত এমএসবি ব্রিকস। দামুড়হুদা ও জীবননগরের অনেক ইটভাটাই প্রধান প্রধান সড়ক সংলগ্ন। এ সকল ইটভাটার মাটি সড়কের কিনারের কিছু অংশ দখল করেই স্তুপীকৃত করে রাখা হয়েছে। সড়কের অধিকাংশজুড়ে মাটির স্তর। সারা বছরই এই ইটভাটাগুলি তাদের ইট তৈরির উপাদান মাটি বহনকারি লাটাহাম্বার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত সড়ক কাঁপিয়ে চলাচল করে। মাটিভর্তি লাটাহাম্বার সড়কগুলিতে চলাচলের ফলে প্রতিনিয়ত সড়কে মাটি পড়তে পড়তে যায়। পিচঢালা সড়কের উপরিভাগে তৈরি হয় মাটি আর ধুলোর স্তর। একটু বৃষ্টিতেই সড়কের উপরিভাগের এই মাটির স্তর গলে সর্বনেশে প্যাঁচপ্যাঁচে কাঁদায় পরিনত হয়। বৃষ্টিতে সড়কের উপরের জমে থাকা এটেঁল মাটি কাঁদাতে সয়লাব হয়ে যায়। এদের মধ্যে বৃষ্টি শেষ হওয়ার সাথে সাথে সড়কের কাঁদা দ্রুত ধুয়ে ফেলে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন মাত্র দুটি একটি ইটভাটা কর্তৃপক্ষ। বাকীগুলিতে জনসাধারণ ভোগান্তির শিকার হয়। অনেক সাইকেলচালককে সাইকেল কাঁধে তুলে নিয়ে কষ্টে সড়কে চলতে দেখা গেছে। অনেক মোটর সাইকেলচালক মোটর সাইকেল থেকে নেমে ধীরে ধীরে সতর্কতার সাথে কাঁদাময় সড়কে মোটর সাইকেল ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ফলে সড়কে যাতায়াতকারিরা চরমতম দূর্ভোগ পোহায়। এছাড়া এমন পরিস্থিতিতে সড়ক দুর্ঘটনার আশংকা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। চুয়াডাঙ্গা- আলমডাঙ্গা সড়কের বন্ডবিলের নিকট সংঘটিত চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের দুর্ঘটনায় নিহত ২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু। একই বৃষ্টিতে আলমডাঙ্গা-ফরিদপুর সড়কের কাঁদায় পিছলে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় পতিত হন সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম মন্টু। এ সময় তিনি রোডের উপর ছিটকে পড়েন। এক হাত ভেঙ্গে যায়। সম্প্রতি আলমডাঙ্গার যমুনা মাঠে কাদাময় সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শেফা ক্লিনিকের মালিকের ছেলে জোবায়ের মারাত্মক আহত হন। এমন আরও বেশ কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে।
অথচ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সড়ক দিয়ে ইটভাটার কাঁচামাল মাটি পরিবহন নিষিদ্ধ। এমনকি সে সড়ক ইউনিয়ন বা গ্রামীণ হলেও। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন -২০১৩’র ৫ ধারার ৪ উপধারায় স্পষ্টভাবে এ নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি উল্লেখ আছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এ ধারা লংঘনের জন্য ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। অথচ এ আইন প্রয়োগের নির্দেশনা থাকলেও তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে ইটভাটা কর্তৃপক্ষের পোয়াবারো। বাধ্য হয়েই ভোগান্তির নির্মম নিয়তি বরণ করে নিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
একই আইনের ৮ ধারার ৩ নং উপধারার (চ) মতে, ইটভাটা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত সড়ক হতে আধ কিলোমিটার দূরত্বে স্থাপন করতে হবে। জেলার ৮৬টি ইটভাটার মধ্যে কয়টা ইটভাটা আইনের এ নির্দেশনা মান্য করে প্রতিষ্ঠিত? এছাড়া রেলপথ থেকে ইটভাটা ১ কিলোমিটার দূরে স্থাপন করতে হবে।( ৮ ধারার ৩ নং উপধারার (ঙ))। এ দুটি আইন লংঘনের শাস্তি অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত। অথচ, ইট ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন -২০১৩’র ৮ ধারার ৩ উপধারার এই আইন দু’টি প্রয়োগের দৃষ্টান্ত নেই।
আইনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও জেলার একটি ইটভাটায়ও ফাঁপা ইট প্রস্তুত করা হয় না। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩’র ৫ ধারার ৩ উপধারায় ইটের কাঁচামাল হিসেবে মাটির ব্যবহার হ্রাস করার উদ্দেশ্যে আধুনিক ইটভাটায় কমপক্ষে ৫০ ভাগ ফাঁপা ইট প্রস্তুতের নির্দেশ রয়েছে। তা সত্বেও আইন মান্য করে জেলার একটি ইটভাটায়ও ফাঁপা ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে না । এ বিষয়ে সাধারণত কোন প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। ব্যতিক্রম শুধু গত ১৯ মার্চ জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক আলমডাঙ্গার ২ ইটভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। ১৯ মার্চ বিকেলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জের নিকটবর্তি এডিবি ব্রিকস ও বন্ডবিলের টিএনবি ব্রিকসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ফাঁপা ইট তৈরি না করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত এডিবি ব্রিকসের মালিক আসিরুল ইসলাম সেলিমকে ৫০ হাজার ও টিএনবি ব্রিকসের মালিক ঠান্ডুর রহমানকে ৫০ হাজার মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ি সরকারের যেকোনো নির্মাণকাজে বিকল্প ইট হিসেবে ফাঁপা ইট ব্যবহার করতে হবে। এ নির্দেশনায় বলা হয়, গৃহনির্মাণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এইচবিআরআই) উদ্ভাবিত বিকল্প এই ইট পরিবেশ বান্ধব ও অর্থসাশ্রয়ী। তাই প্রধানমন্ত্রী এ বিকল্প ইট সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন। অথচ, জেলায় কোন সরকারি নির্মাণে ফাঁপা ইট ব্যবহারের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে একাধিক ইটভাটা মালিকের সাথে কথা হয়। নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক ইটভাটা মালিক জানান, রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে সাধারণত ফাঁপা ইটের ব্যবহার হয়ে থাকে। জেলা শহর কিংবা উপজেলা মফস্বলে ফাঁপা ইট ব্যবহার করা হয় না। তাহলে কেন ফাঁপা ইট তৈরি করা হবে? তারা বলেন, জেলা কিংবা উপজেলা পরিষদের মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত যে, সরকারি সকল স্থাপনা বা নির্মাণ কাজের টেন্ডারে ফাঁপা ইট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতের। তাহলে ফাঁপা ইটের চাহিদা সৃষ্টি হবে।