সাম্প্রতিক
হুমায়ূন আহমেদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

হুমায়ূন- সুনীলের পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ

হুমায়ূন আহমেদ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

শাহীন আহমেদ টিটো: কোন সন্দেহ নেই যে সুনীল গঙ্গোপ্যাধায়, সমরেশ মজুমদার, শীর্ষেন্দু এবং বিমল মিত্ররা বাংলা সাহিত্যের প্রধান লেখকদের মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘদিন তাঁরা বাংলাদেশের বইয়ের দোকানের শেলফগুলোকে দখল করে রেখেছিলেন । যখন এদেশে হুমায়ূন যুগের সুচনা হয় তখন শেলফগুলো থেকে আস্তে আস্তে তাঁদেরকে হটিয়ে জায়গা করে নেন হুমায়ূন আহমেদ, এমনকি তিনি জায়গা করে নেন পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের শেলফগুলোতেও।

তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের লেখকেদের একটি নাকউঁচু মনোভাব ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যখন উপন্যাস ছাড়া সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ, তখনও পশ্চিম বঙ্গের লেখকদের নাকউঁচু স্বভাবের ইতর বিশেষ হয়নি। এজন্য অবশ্য বাংলাদেশের এক শ্রেণির লেখকদের হীনমন্যতাও কম দায়ী ছিল না। হুমায়ূন আহমেদ এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি তার এক লেখায় পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের পাকা কাঁঠাল এবং বাংলাদেশের অতি উৎসাহী লেখদেরকের সেই পাকা কাঁঠাল ঘিরে ভনভনে মাছি বা ‘সাহিত্যের মাছি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হুমায়ূন ছিলেন হুমায়ূনের মতই। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের নাকউঁচু স্বভাব আর এদেশের কিছু লেখকের হীনমন্যতা অপছন্দ করলেও পশ্চিমবঙ্গের প্রধান লেখদের মান নিয়ে অহেতুক কোন প্রশ্ন তোলেননি, তাঁদেরকে ছোট বা অবজ্ঞা বা অবহেলা করেননি। বরং শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন, প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হুমায়ূনের বিভিন্ন লেখায় তাঁদের সাথে তাঁর ব্যাক্তি সম্পর্কের বিষয়টাও উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশী উঠে এসেছে সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায়ের কথা।

পশ্চিমবঙ্গের তথা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা লেখক সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায়ের সাথে হুমায়ূনের একটি শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল। হুমায়ূন সুনীলের লেখার অনুরাগীও ছিলেন। দু’জনই একে অপরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। এই শ্রদ্ধার সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল হুমায়ূন আহমদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকে। ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি নিয়ে সুনীল গঙ্গোপ্যাধায় লিখেছিলেন কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দেশ’ পত্রিকায়। সুনীল তখন ঐ প্রত্রিকায় ‘সনাতন পাঠক’ ছদ্মনামে লিখতেন।

সুনিল-হুমায়ুন একাধিকবার একসাথে আড্ডা দিয়েছেন, সময় কাটিয়েছেন নুহাশ পল্লিতেও। সুনীল তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন,’হুমায়ন আহমেদ আড্ডায় যেসব কথা বলেন সেগুলোর রেকর্ড থাকা দরকার।‘ হুমায়ূন তাঁর একটি ভ্রমন বিষয়ক বইয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘পায়ের তলায় খড়ম’। হুমায়ূন জানিয়েছেন, তিনি বইটির নামকরণ করেছেন সুনীলের ভ্রমন বিষয়ক ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ নামক বইটির অনুসরণে।

হুমায়ূন আহমদে যেমন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক, তেমন ছিলেন সবচেয়ে আক্রান্ত লেখকদের অন্যতম। সস্তা প্রেমের গল্পকার, ফরমায়েশি লেখক, সাহিত্যমানহীন লেখক, বাজারি লেখক- এসব কথা তাকে শুনতে হয়েছে অজস্র বার। একবার কোলকাতায় বাংলাদেশে মিশন আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাদেশের একজন লেখক হুমায়ূন আহমেদকে সস্তা প্রেমের গল্পকার আক্রমণ করে বসেন। বিষয়টা হুমায়ূন আহমেদের জন্য ছিল খুবই বিব্রতকর। এই অবস্থা থেকে হুমায়ূনকে উদ্ধার করেন সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায়। তিনি ঐ সভার সভাপতিত্ব করছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন,’একজন লেখক প্রেম নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলেন কেন বুঝলাম না। পৃথিবীর সব সঙ্গীত, চিত্রকলা এবং সাহিত্যের মূল বিষয় ‘প্রেম’। যিনি এই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করেন তিনি কি আসলেই লেখক?’ ঐ অনুষ্ঠান শেষে সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায় হুমায়ুনকে একটি গল্প পাঠের আসরে গল্প পড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আসরে গল্প পড়েছিল সুনীল, হুমায়ূন এবং সমরেশ মজুমদার।

সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায় হুমায়ূন আহমেদের বড় মেয়ে নোভার প্রিয় লেখক। হুমায়ূন মনস্থির করেছিলেন নোভার বিয়েতে সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায়কে উপস্থিত করে মেয়েকে চমকে দেবেন। তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আমার বড় মেয়ের বিয়েতে আপনাকে উপহার হিসেবে চাই’। সুনীল হুমায়ূনের কথা রেখেছিলেন । এই বিষয়ে হুমায়ূন লিখেছেন,’ তিনি সব কাজ ফেলে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় এসে বিয়ে অনুষ্ঠানে যোগদান করলেন। আমার হতভম্ব মেয়ে চোখে রাজ্যের বিস্ময় এবং আনন্দ নিয়ে লেখকের পা স্পর্শ করল। এই পবিত্র দৃশ্য আমৃত্যু আমার মনে থাকবে।‘আ

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না