সাম্প্রতিক

শিকড়ের সন্ধানে (Roots) : অনুবাদের সুপাঠ্য

সমালোচনা: তামান্না স্নিগ্ধা

বইয়ের নাম : শিকড়ের সন্ধানে (Roots)
লেখক : আলেক্স হেলি
অনুবাদক : গীতি সেন
প্রকাশকাল : ১৯৮৯
মূল্য : ষাট টাকা (১৯৯৬ এর সংস্করণ অনুযায়ী)
পৃষ্ঠা : ২৪০

Alex Haley-র উপন্যাস The Roots:the saga of an American family এর বঙ্গানুবাদ ‘শিকড়ের সন্ধানে’ করেছেন গীতি সেন। তার অনুবাদের মান সুখপাঠ্য বলেই মনে হয়েছে। অসামান্য দক্ষতায় ও সাবলীলভাবে তিনি ইংরেজি থেকে বাংলায় আবেগগুলোকে ভাষান্তরিত করতে পেরেছেন।

কাহিনীর শুরু আফ্রিকার এক গহিন বনের ভিতরে জুফরে নামক এক গ্রামে। যেখানে ১৭ বছর বয়সের এক টগবগে তরুণ নাম যার ‘কুন্টা কিন্টে’, একদিন জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে ধরা পড়ে দাস ব্যবসায়ী শ্বেতাঙ্গ এবং ওদের স্থানীয় দোসরদের খপ্পরে। দাস ব্যবসায়ীরা তাঁর চিৎকার চেঁচামেচি কর্ণপাত না করে তাঁকে লোহার শিকল পরিয়ে দেয়। এবং এরকম অবৈধভাবে জোর জুলুম করে বন্দী করা আরও অনেকের সঙ্গে জাহাজে করে পাড়ি দেওয়ায় আটলান্টিক মহাসাগর। এতে সময় লাগে মোট আড়াই মাস। আর এই পুরো সময়টা জুড়ে জাহাজে তাদের ওপর করা হয় অমানুষিক অত্যাচার।

জাহাজ ঘাটে ফেরার পর আমেরিকার দক্ষিণ অংশে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয় কুন্টাকে। জোর করে খ্রিষ্টান বানিয়ে তার নতুন নাম দেওয়া হয় টবি। কিন্তু এই নতুন নামকরণ ও দাসত্ব কোনোটাই মেনে নেয়নি কুন্টা। তাই বারবার পালানোর চেষ্টা করে। চারবার পালানোর চেষ্টা করেও প্রতিবারই ব্যর্থ হন তিনি। শেষবারে তার ডানপায়ের পাতা কুঠারের কোপ মেরে কেটে ফেলা হয় যাতে আর কোনদিনও পালাতে না পারেন। তাকে চিরবন্দী করে ফেলা হয় ভিন্ন এক দেশে, অবমাননা-অত্যাচারের এক জগতে। কিন্তু আসলেই কি পেরেছিলো বন্দী করতে? কুন্টা কিন্টে তাই তার পরিবারে শুরু করে এক অদ্ভুত প্রথা। এখানে কোন শিশু জন্ম নিলে আফ্রিকায় থাকা তার পূর্বপুরুষদের নামসহ এখানে আসার সংক্ষিপ্ত কাহিনী বর্ননা করেন। পরে বাচ্চা বড় হবার সাথে সাথে আফ্রিকা থেকে তার শিখে আসা কিছু শব্দ শিখিয়ে দেন বাচ্চাটাকে। এবং পরিবারের সকল সদস্যদের নির্দেশ দেন তারা যেখানেই যাক, পৃথিবীর যে তল্লাটেই ছিটকে পরুক না কেন, যেন নতুন শিশুকে জানানো হয় তার পূর্বপুরুষ কে ছিলো। সময়ের পরিক্রমায় পরিবারের বিভিন্ন সদস্যরা দাস হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ছিটকে পড়ে। গড়ে তোলে নতুন পরিবার, নতু ন আবাস। কিন্তু মেনে চলে কুন্টা কিন্টের সৃষ্টি করা সেই প্রাচীন প্রথা।

উপন্যাসের লাস্ট অধ্যায়ে আছে চরম এক টুইস্ট। লেখক আলেক্স হেলির সপ্তম পূর্বপুরুষ ছিলেন কুন্টা কিন্টে!!! পুরোটা সময় ধরে লেখক তার নিজের রুটসের সন্ধান করে গেছেন। এবং কুন্টাকিন্টের মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর আলেক্স হেলি তার শিকড়ের সন্ধানে উপস্থিত হয়েছেন জ্যুফুর গ্রামে। ছোটবেলায় পারিবারিক প্রথামত লেখককেও শোনানো হয়েছিলো পূর্বপুরুষদের সেই গল্প। যা তাকে পরবর্তীকালে আগ্রহী করে তোলে নিজের রুটস এর সন্ধান করতে। লেখক পুরো বিষয়টির বর্ননা দিয়েছেন এইভাবে, ” “এ জগতে ইতিহাস রচনার অধিকার একমাত্র বিজয়ী পক্ষের নয়। নিপীড়িতজনের রচিত ইতিহাসও কোন কোন ক্ষেত্রে মহত্তর হয়ে ওঠে।” এই উপন্যাসের পরতে পরতে ফুটে উঠেছে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ ও দাস ব্যবসায়িদের অমানুষিক এবং অমানবিক নির্যাতনের বিবরন। আলেক্স হেলি যিনি একজন আধুনিক কৃষ্ণাঙ্গ লেখক তিনি আবিষ্কার করতে চেয়েছেন তাঁর পূর্বপুরুষদের সেই অবলুপ্ত অতীতকে সাথে বিশ্ববাসীকে জানাতে চেয়েছেন তাদের প্রতি করা অন্যায়গুলোকে।