সাম্প্রতিক

শাহনেওয়াজ বিপ্লব -এর গল্পগ্রন্থ ‘উপনিবেশ’ এবং উত্তর ঔপনিবেশিক চিন্তা

rokimg_20150217_95583আহমদ জসিম:  এই পুঁজিবাদী যান্ত্রিক যুগে, মায়েরা কি  আর আগের মতো করে; তার সন্তানদের গল্প শোনানোর ফুসরত পান? আমি সেই গল্পগুলোর কথা বলছি: যেগুলো মায়ের কোলে মাথা রেখে শুনতাম: ‘এক দেশে  এক রাজা ছিল’, অর্থাৎ ডালিম কুমার অথবা সেই রকম আরো অনেক গল্প। এই গল্পগুলো শুধু শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং গল্প বলার কৌশলের মধ্য দিয়ে শিশু মনে রোপিত হতো সৃজনশীল চেতনার প্রথম বীজ। তাই ইলিয়াস যখন বলেন:‘ গল্প মরে যাচ্ছে…।’ তখন তিনি আসলে আমাদের জীবন গল্পহীন হয়ে পরার প্রবণতাকেই ইঙ্গিত করেন:আমাদের জীবন যে গল্পহীন হয়ে পড়ছে, এটা চলমান সময়ের কিছু গল্পের প্রবণতা লক্ষ করলেই বুঝতে পারি। যেখানে নিরীক্ষার নামে দুর্বোধ্যতা, জটিল বয়ান, অপ্রচলিত শব্দ চয়ন আর শেষ পর্যন্ত  গল্পহীনতাই যেন, আমাদের চলমান সময়ের গল্প সাহিত্যের এক বিশেষ প্রবণতা হয়ে উঠে! শাহানেওয়াজ বিপ্লবের গল্প আমাদের সেই প্রবণতা থেকে মুক্তি দেয়, একই সাথে আমাদের এখানকার গল্প বুননের চিরায়ত ধারাÑ যে ধারার গল্প আমরা নানি, দাদি কিংবা মায়ের মুখে শুনে আসছি সেই শোনা গল্পকেই যেন লিখিত রূপ দেন। ধরা যাক তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ উপনিবেশ,’-এর নাম গল্পটার কথা: গল্পটা শুরু হচ্ছে এই ভাবে: ‘এক যে ছিল দেশ।’ এই একটা বাক্য দিয়ে শুরু করে তিনি আমাদের শুনিয়ে দেন, একটা রাষ্ট্র ও জাতির কাহিনি। এই শোনা যেন মায়ের কোলে মাথা রেখে গল্প শোনা, তবে গল্প শেষ হবার পর, আমাদের আহ্লাদে গদগদ হবার মতো কোন বিষয় নেই, বরং চর দখলের মতো রাষ্ট্র দখলের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা, বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার নয়া ঔপনিবেশিক প্রবণতার মুখোশটিই যেন আমাদের সামনে উন্মোচন করে দেন গল্পকার। কঠিন কথাও সহজ করে বলা যায়, যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়। কঠিন কথাকে সহজ করে বলার এক উদাহরণ হচ্ছে শাহনেওয়াজ বিপ্লবের গল্প। জীবনের জটিল সমীকরণকে তিনি এতটা হাস্যরসাত্মক ভাবে তুলে আনেন তার গল্পে, যেটা শেষ পর্যন্ত আমাদের এক বিস্ময় উপহার দেয়: ধরা যাক তার, ‘বাঘিনি’     গল্পটার কথা। জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক মানুষ, অথচ সমাজে নিজেকে তুলে ধরছে এক মহা-ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে, যার কাছে বাঘ শিকারও একটা নস্যি ব্যাপার, চার তরুণ তার কাছে বাঘ শিকারের গল্প শুনতে গিয়ে আবিষ্কার করেন এক মহান সত্য, জীবন যুদ্ধে পরাজিত আর সংসারের নিগৃহীত এই মানুষটার বাগাড়ম্বতার কারণ আদপে হাহাকারকে দমিয়ে রাখার কৌশল মাত্র। এই গল্পের বুননে টান টান উত্তেজনা আছে, গদ্য নির্মেদ ও ঝরঝরে। প্রতিমুহূর্তে হাসির খোরাকও পাঠক পাবেন, তবে শেষ পর্যন্ত একটি বার্তা ঠিকই আমাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এই বার্তা পৌঁছানোর অর্থে আমি বলছি: বিপ্লব গল্প লেখেন, এই মাটির জল হাওয়াতে দাঁড়িয়ে, সময়, সমাজ, মানুষ ও প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে। তাঁর গল্পের বিষয় থেকে, ব্যক্তি-মনের অস্থিরতা, সমাজের অসংগতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রর দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যন্ত কিছুই বাদ পড়ে না। আমরা যখন তাঁর গল্পে ব্যক্তি মনের অস্থিরতা কথাটা বললাম তখন, ‘ পচন প্রক্রিয়া বা বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরের গল্প’ শিরোনামের গল্পটার দিকে একবার নজর দিতে পারি, হিন্দু অমল বন্দ্যোপাধ্যায় এর মুসলিম স্ত্রী জাহানারা। না, এই আধুনিক যুগে দুই ধর্মের নারী- পুরুষের প্রেম ও বিয়ে নতুন কিছু নয়, তবে লেখক এখানে আমাদের সামনে নতুন করে যা তুলে এনেছেন তা হলো, বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দাঙ্গা আর সেই দাঙ্গাতে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়া স্বামীর জন্য স্ত্রীর ভাবনা। যে ভাবনার মধ্যদিয়ে আমাদের সামনে চলে আসছে, একমাত্র সন্তানের বেড়ে উঠা থেকে শুরু করে তার ধর্মের বিশ্বাস পর্যন্ত। ব্যক্তিমানুষের মনস্তাত্ত্বিক এই  ভাবনা, শেষ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজ ভাবনার দিকে নিয়ে যায়, পাঠকের সামনে প্রশ্ন  ছুঁড়ে দেয়, প্রচলিত সভ্যতা আদতে কতটা মানবিক হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু সমাজকে নয়, তাচ্ছিল্য করেন রাষ্ট্রের নীতিবোধকেও, তাঁর গল্প ‘ বাংলাদেশে জব্বার আলী নামে একদা এক ভিক্ষুক ছিল,’ শিরোনামের গল্পটা একজন ভিক্ষুকের জীবনগাঁথা হলেও শেষ পর্যন্ত আমরা দেখছি সেই ভিক্ষুকের মৃত্যু হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবসে। এই মৃত্যু,শেষ পর্যন্ত  একজন ভিক্ষুকের সাধারণ মৃত্যু হয়ে থাকে না, বরং এই মৃত্যুর মধ্যদিয়ে স্যাটায়ার করা হয়, রাষ্ট্রের অতি ঘটা করে পালন করা বিশেষ দিবসগুলোকে। আরো মারাত্মক খড়গহস্ত হয়ে তিনি পাঠকের সামনে হাজির হন তাঁর: দ্য ডেথ অব পিপললস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ নামক গল্প দিয়ে,  ইংরেজি ডেথ শব্দের বাংলা তরজমা যদি হয় মৃত্যু, তবে আমরা দেখছি, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের একজকে, যার স্বপ্নের করুণ মৃত্যু ঘটছে। পাঠককে তিনি শুরুতেই চমকে দেন, যখন অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার এনজিওগ্রাম রিপোর্টে দেখা যায়, অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়েরের হার্টে বাংলাদেশের মানচিত্র। তারপর গল্পকার আমাদের শোনাচ্ছে আবুল খায়ের বেদনার কথা, এই আসলে ব্যক্তি আবুল খায়েরের বেদনা নয়, সমসাময়িক বাংলাদেশের সমাজচিত্র। এই পোড়া দেশে মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু যেমন অনিশ্চিত, সেই চিন্তা মাথাই রেখেই বোধ করি গল্পকার গল্পের ইতি টানছেন আবুল খায়েরের মৃত্যু দৃশ্য দিয়ে। তবে এই মৃত্যু স্রেফ মৃত্যু নয়, একটা প্রতিবাদ হয়ে থাকল! একজন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর মন্ত্রী থেকে ভিখারির মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ৫০০টাকা মুক্তিযুদ্ধের ভাতা নেওয়ার অপমান  বোধ থেকে আবুল খায়ের আত্মহত্যা করলেন। এই ভাবেই শাহানেওয়াজ বিপ্লব-এর একেকটি গল্প হয়ে উঠে, একেকটা প্রতিবাদ, একেকটা বার্তা, তাই বিপ্লব-এর গল্প মানেই পাঠকের জন্য পাঠের বিস্তর খোরাক হলেও, রাষ্ট্রের জন্য মোটেও স্বস্তি দায়ক কিছু  নয়।
উপনিবেশ,
লেখক: শাহনেওয়াজ বিপ্লব,
প্রকাশক: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ,
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ,
পৃষ্ঠা:১২৭, মূল্য:২০০