সাম্প্রতিক

মোস্তাফিজ ফরায়েজী জেরী’র গল্পঃ মহাসেন

cycl2

 

১.

শহরের এক মোড়ে একটি চায়ের দোকান। টিন আর কাঠ দিয়ে তৈরী  দোকানটি। এখানে খাঁটি গরুর দুধের তৈরী চা পাওয়া যায়। তবে দুধ কতটুকু  খাঁটি তা কেউই জানে না ঠিকমত। সবাই শুধু দেখে এলুমিনিয়ামের পাত্র বোঝায় দুধ শরে ঢাকা থাকে। অনেক মানুষ আসে এখানে চা খেতে। পাশের বড় বড় দালানে বসবাসকারী সাহেবরাই  মূলত এখানে বেশী চা খান।

সেদিন বিকেলে বেশ কয়েকজন সাহেব একত্রিত  হয়েছেন,  নানাবিধ কথা চলে কাঠের বেঞ্চের উপর বসা সাহেবদের। চায়ে চুমুক দিতে দিতেই সমসাময়িক আলোচনা করেন তারা।

আসিফ সাহেব- কত জন মারা গেছে মহাসেনে?

মিজান সাহেব- এইতো বেশী না, ২০-৩০ জন।

রাজিব সাহেব- আরে না, আমিতো দুপুরে টেলিভিশনে দেখলাম ৩৭ জন। মনে হয় ৫০ মত মারা যাবে।

আসিফ সাহেব- যে ভাবে আসল, মনে হল পৃথিবী উল্টে যাবে। সেজন্যই কথায় আছে, যত গর্জে তত বর্ষে না।

শফিক সাহেব- আসলেই, শুনেছিলাম কয়েক হাজার লোক মারা যাবে। সবই গুজব!

আসিফ সাহেব- শাপলা চত্বরেই তো এর চেয়ে বেশী মারা গেছে।

রাজিব সাহেব- আপনি আছেন শাপলা চত্বর নিয়ে, এই যে রানা প্লাজার ঘটনাতেই তো হাজারের বেশী মারা গেল।

মিজান সাহেব- ঠাট্টা করতে এসেছিল মহাসেন। অনেকটা মিরাক্কেলের জোকসের মত। আবার শুনলাম ভারী বর্ষণই নাকি মহাসেনকে দুর্বল করেছে।

আসিফ সাহেব- উপমাটা এভাবে দেওয়া যায়,  শ্রীলঙ্কার অত্যাচারী রাজা বঙ্গদেশে এসে বিতারিত হলেন।

মিজান সাহেব- ব্রিলিয়ান্ট, আপনি সবসময়ই বিশেষ উপমা দেন।

এভাবেই সাহেবদের আলোচনা এগিয়ে চলে।

২.

নেতা-  তোর ফোন পেয়েই এলাকায় ছুটে এসেছি। জনতার কথা তো আমাকে মাথায় রাখতে হবে। মহাসেন না আসলেতো ঢাকায় যাওয়াই হত না। অনেকদিন পর ঢাকায় গেলাম, নন্দন পার্ক ঘুরে দেখেছি এবার। বেশ সুন্দর পার্কটা। পলিটিক্স করলেতো আর ঘোরার সুযোগ পাওয়া যায় না। তবে এবার ঢাকায় গিয়ে খুব মজা হয়েছে রে। আর সব অবস্থা কি? ত্রাণ কি আসা শুরু হয়েছে? সব জায়গায় লোক ফিট কর, আমার হাতের উপর না এসে যেন কোন ত্রাণ কোথাও না যায়। নজির আর শরিফকে জানিয়ে দিস।

পাতি নেতা – ওকে বস! আপনি কোন চিন্তা করবেন না।

৩.

নাম তার রহমত আলী, বাসা ভোলা। দুই ছেলে, এক মেয়ে আর বউকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল দুদিন আগেও। আজ তার কেউ নেই, কিছু নেই।

নিজের ভিটে দেখতে এসেছে সে। দুইটি লাশের শোক তার হৃদয়ে। তবু আবার তাকে তিলে তিলে গড়তে হবে ঘর।  চারপাশে তাকিয়ে দেখে রহমত আলী, যতদূর দেখে তত দূরই বিধ্বস্ত ঘর আর উপড়ে পড়া গাছ। আক্কাস, রহিম, সাফায়েত, লাল্টু সবার ঘরই মাটির সাথে মিশে আছে। রহমত আলীর মনে হয়, স্রষ্টা বুঝি কেয়ামত দিয়ে গেছে।

এখনো পানি একদম নেমে যায় নি, তাই নতুন ভাবে ঘর তোলা সম্ভব নয়। নতুন ঘরে আবার নতুন কে আসবে সেটাও তার অজানা। পাশে একটু দূরে তাকিয়ে দেখে সখিনা দাঁড়িয়ে আছে। সখিনার বয়স বেশি নয়, জোর বিশ বাইশ হবে। এইতো দু’মাস আগে মুনসুর তাকে বিয়ে করে এনেছিল। আজ আর মুনসুর নেই। মেয়েটাও এতিম, তাই কী করবে ভেবে পায় না। শুধু আর্তনাদ করে কাঁদতে থাকে।

একটু পরেই ভিডিও ক্যামেরা হাতে এক সাংবাদিক আসে হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট  গুঁটিয়ে। সে আগেই শুনেছে রহমতের কথা। তাই তার দিকেই আসতে থাকে সে। এসে রহমতকে বলে, তারা টেলিভিশন থেকে এসেছে তার সাথে কথা বলার জন্য।

সাংবাদিক মশাই ভিডিও ক্যামেরা সেট করে তাকে জিজ্ঞাসা করে, “আমরা শুনেছি আপনার বউ আর দুই ছেলে মারা গেছে এই  মহাসেনের কবলে পড়ে। এখন কি আপনি বলবেন, সেই প্রলয়ংকারী ঝড়ের কথা। আসলে কি হচ্ছিল ঝড়ের সময়?”

দুদিনের অভুক্ত রহমত আলী স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখে কথা সরে না।

সাংবাদিক বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে, কিন্তু ফল আসে না। তারপর অন্য প্রশ্ন করে।

“আপনি কি পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন ঝড়ের পর থেকে?”

রহমত আলী তবুও নীরব। কি বলবে সে, বলার আছেই বা কি? যা বলার তা কারো অজানা নয়।

সংবাদটি টেলিভিশনে প্রচার হয় নি। কারণ রহমত আলী সেদিন কথা বলে নি।

তার কাছে চেয়ারম্যান এসে ত্রাণ দিয়ে যায় নি।

তিলে তিলে স্বযতনে তাকেই গড়তে হবে তার ঘর, তার সংসার। এতে তার ক্ষোভ নেই, রাগ নেই।

কারো প্রতি অভিযোগ আনার সময় বা অধিকার কোথায় তার? আজ বুঝি সে নিজেই দেশের এক অভিযোগ!

******