সাম্প্রতিক

দিন যায় দিন আসে (ধারাবাহিক ৪র্থ পর্ব)

শুভ্রঃ হ্যালো, হ্যালো?

লালিমাঃ বল, এই কী গুনগুনিয়ে গান গাচ্ছ কেন? কী গান একটু হেঁড়ে গলাতেই শোনাও না।

শুভ্রঃ “পথিক বন্ধু এসো এসো পাপড়ি ছাওয়া পথ দিয়ে/ মন হয়েছে উতলা গো তোমার আসার পথ চেয়ে।।/ সাধ জাগে এই পথে তোমার বেঁধে রাখি মন-প্রাণ/ চলতে পথে দলবে তুমি চরণ ছোঁয়া করিবে দান।/ তোমার ধ্যানে হে রাজাধিরাজ সাজ ভুলেছি ভুলেছি কাজ।/ আসবে তুমি সেই খুশিতে আছে আমার মন ভরে।“

লালিমাঃ আবার কার পথ চেয়ে আছো?

শুভ্রঃ তোমার এ প্রশ্নের উত্তর দেব, তার আগে বল তো তুমি পুরাতন ছবির এই গান শুনেছো না – “ খুঁজে মরি এই ক্ষণে স্মৃতির গহনে কোথায় তোমায় যেন দেখেছি।“

আসলে কোথাও তাকে দেখেনি কেউ। দেখেও না। দেখা হয় কল্পনায়। কিশোর বয়সের প্রারম্ভ থেকেই প্রত্যেকের কল্পনার রাজ্যে একজন নায়িকা বা নায়িকা থাকে। ওই বয়স থেকেই ওই কল্পনার রাজ্যের নায়ক/ নায়িকার সাথে মান-অভিমান চলে, অকারণে হাসে-কাঁদে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- “ সেই মায়াভরা মুখ, সেই মধু হাসি/ চিরদিন মোরে হাসালো কাঁদালো চিরদিন দিল ফাঁকি।“এই নায়িকাকে কখনও বাস্তবে পাওয়া যায় না, সে চিরকাল মনের রাজ সিংহাসনে বসে রাজত্ব করে চলে। এবার নিশ্চয় বুঝেছেন মিসেস?

লালিমাঃ বুঝেছি মিস্টার। আচ্ছা, বাঙালী তো আবেগসর্বস্ব জাতি। তা হলে বল মহান স্বাধীনতা দিবস এবার কীভাবে উদযাপন করলে?

শুভ্রঃ তথৈবচ। তবে আবেগ থাকে উন্নত প্রাণির মধ্যে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার তো আবেগ অন্যদের চে বেশিই থাকবে। যার আবেগ বেশি, মানুষ হিসেবে তিনি বেশি সংবেদনশীল। তিনি তো আবশ্যই উন্নত স্বভাবের। উন্নত মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ। এতে আবার বাঙ্গালীর অপরাধ কোথায় দেখলে?

লালিমাঃ স্বাধীনতা দিবসের ডিসপ্লে ও মার্চপার্স প্রতিযোগিতায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তুমি জানো? না কি আমি বলব?

শুভ্রঃ তুমিই বল।

লালিমাঃ শোন, ডিসপ্লে আর মার্টপার্সে যে দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ১ম করা হয়েছে, সেই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকেই মোটা অংকের অর্থ স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য ডোনেশন নেয়া হয়েছে। সেই শর্তেই প্রতিষ্ঠান দুটিকে এমনভাবে পুরস্কৃত করা হল বলে অভিযোগ উঠেছে তোমাদের শহরে। অতীতে কোনদিন কোন জাতীয় দিবস উপলক্ষে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে ডোনেশন নেওয়া হয়নি। অথচ এবার এ এক নতুন অধ্যায় রচনা করলেন ইউএনও। এ যেন প্রতি বছর করের আওতা বৃদ্ধির মত ব্যাপার। তবে যেভাবেই দেখ না কেন – কোমলমতি শিক্ষার্থিদের সাথে এমন আচরণ অভিভাবক ও শিক্ষকমহলে বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ্যে আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি। এ বিষয়ে রিপোর্ট হওয়া উচিত ছিল।

শুভ্রঃ আর কিছু শুনেছো?

লালিমাঃ সাঙ্ঘাতিক সাহেব,  কিছুই তো খোঁজ রাখ না? শুধু থানা পুলিশ নির্ভর সাংবাদিকতা না? তবে বলি শোন – উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার দীনেশ চন্দ্র পাল নাকি আগের মতই বেপরোয়া। ৫/৭ বছর একই স্থানে চাকরি করছেন। তিনি নাকি আলমডাঙ্গায় দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরও বিদ্যালয়গুলিতে বই যাতায়াতের অর্থ দেন না। প্রতি বছর জানুয়ারির শুরুতেই সরকার শিক্ষার্থিদের হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দেন। সেই বই বিদ্যালয়ে পৌঁছনো বাবদ টাকাও সরকারিভাবে দেওয়া হয়। অথচ অভিযোগ রয়েছে – তিনি বিদ্যালয়গুলিতে সে অর্থ না দিয়ে আত্মস্মাত করেন। বিষয়টি সাংবাদিকদের লক্ষ্য রাখা দরকার। তাছাড়াও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে জেলা, বিভাগ এমনকি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে, তাদের বিপরীতে বরাদ্ধকৃত সরকারি অর্থও তিনি আত্মস্মাত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই অভিযোগ তুলেছেন উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, প্রভাষক ও অধ্যক্ষ। শিক্ষা সবচে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এখানে লক্ষ্য রাখ।

শুভ্রঃ আসলে তুমি আমার পাশে থাকলে আমিই শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকের পুরষ্কার ঘরে তুলতে পারতাম!

লালিমাঃ সবাই সব কিছু বুঝতে পারে, তবে অনেক দেরিতে –। আচ্ছা তুমি কি নেহেরু ডক্টিন সম্পর্কে বলবে?

শুভ্রঃ আসলে ’৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি আলাদা দেশ হওয়ার প্রক্রিয়ায় নেহেরু সাহেব চাতুর্‍্যের সাথে প্রভাব ফেলেছিলেন। এমনিতেই ইংরেজদের সাথে তার দহরম-মহরম একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ছিল। তিনি পাকিস্থানকে এমন ভৌগলিক কৌশলে ভাগ করতে ইংরেজদের উপর প্রভাব ফেলেছিলেন যে, আজ হোক, কাল হোক দুই পাকিস্থানকে পৃথক হতেই হবে এবং পূর্ব পাকিস্থান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ একদিন মহাভারতের অংশ হবে। এটা  জহরলাল নেহেরুর “ অখন্ড ভারত মাতা” প্রকল্প যা নেহেরু ডক্টিন নামে অভিহিত। এ বিষয়ে নেহেরুর “ ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া” গ্রন্থ পড়লে পরিষ্কার হবে। সে কারনে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীন স্বত্তাকে কোনভাবেই ভারত বরদাশত করতে পারেনা । আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভূট্টোর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ইতালিয়ান মহলা সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি। এক পর্যায়ে ওরিয়ানা ফালাচির এক প্রশ্নের জবাবে ভূট্টো বলেছিলেন, বাংলাদেশকে ভারতের স্যাটেলাইট হয়ে বাঁচতে হবে। ভারতীয় র সেই কাজটি বেশ দক্ষতার সাথে করে চলেছে। বাংলাদেশের সমুদয় রাজনৈতিক পরিবর্তন নাকি র’র কলকাঠিতেই ঘটে থাকে। একটা গল্প বলি তোমায়- একবার জিয়াউর রহমান ভারতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রি ইন্দ্রিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। টেবিলের এক মাথায় জিয়াউর রহমান, অন্যপাশে অন্য এক ব্যক্তি। মাঝে ইন্দ্রিরা গান্ধী। এক পর্যায়ে ইন্দ্রিরা গান্ধী জিয়াউর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার দেশের খবর কী? উত্তরে জিয়াউর রহমান তৃতীয় ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমাকে না, উনাকে জিজ্ঞেস করেন। আমার চে’ উনি ভাল জানেন। জিয়াউর রহমানের এই উত্তরে কিছু সময় সেখানে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করে।

আসলে ওই তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র ‘র বাংলাদেশের প্রধান।

লালিমাঃ আচ্ছা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা সেটা আমরা কেন স্বীকার করতে কুন্ঠা দেখায়? বাংলাদেশীরা তো এত অকৃতজ্ঞ জাতি না। না-কী  আড়ালে অন্য কিছু আছে?

শুভ্রঃ ভিন্ন কিছু তো আছেই। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত আমাদের যতেষ্ঠ সহযোগিতা করেছে। আশ্রয় দিয়ে, ট্রেইনিং দিয়ে। এমনকি প্রত্যক্ষভাবে আমাদের মুক্তিবাহিনির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। ভারতের অনেক সৈনিক আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে প্রাণোৎসর্গ করেছে। তারপরও বাংলাদেশিরা তাদেরকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখে। এটা বাস্তব। এরজন্য ভারত এককভাবে দায়ি। যুদ্ধোত্তর দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনি বাংলাদেশকে ধ্বংশস্তুপে পরিণত করেছিল। সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের “ অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” নামের গ্রন্থ পড়লেই সব জানতে পারবে। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ভারত নিয়ে গেছে। এমনকি পাকিস্থান সেনাবাহিনিকে আমাদের সেনাবাহিনি বা মুক্তিবাহিনির নিকট আত্মসমর্পন করতে দেয়নি। কৌশলে ভারতীয় সেনানায়ক অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করিয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার আর একটা কারণ হল, পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করা। তার শক্তি খর্ব করা। পরবর্তিতে দুর্বল বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করা, অখন্ড ভারতের অংশ করে নেওয়া। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী বোম্বে এক জনসভা করেন। জনসভা শেষে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের কী লাভ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে  বলেছিলেন, হাম লোগ লাখ লাখ সাল কা বদলা লিয়া।

আচ্ছা এই নিয়ে অন্য আরেক দিন কথা হবে।

লালিমাঃ “ শুনুন মশাই

“ আর কথা নয়,

বাড়ি।

আমাদের কথা দূরপাল্লার

গাড়ি।

সমুদ্র-ফেনা তট মুছে দিয়ে ছোটে।

শুভঙ্কর

কথা থেমে যাবে, আলতা পরাও ঠোটে।”

শুভ্রঃ বিদায়ের ঘন্টা বাজাচ্ছো মনে হয়।

লালিমাঃ হু।

শুভ্রঃ তোমাকে ছাড়তে ইচ্ছা হয়না যে। বসন্তের শেষ ভাগে গ্রামে কুচ পাওয়া যায়। এখন আর দেখি না। কত গ্রামেই তো ঘুরি। কাঁচা কুচের বেশি আকর্ষণ ছিল। মালা গাঁথাও সহজ হত। আবার আলাদা এক প্রকার গন্ধ পাওয়া যেত। সে যে কী মনলোভা সুগন্ধ! কিছুতেই ভুলতে পারিনে। সত্যি বলছি, সেই সুগন্ধ শুধু তোমার করতলে নাক ঘষে পেতাম। কবে যে দেখা হবে তোমার সাথে!

লালিমাঃ আচ্ছা, এখন কি আবৃত্তি কর। শুরু কর না পূর্ণেন্দুর কবিতা। কবিতা দিয়েই আজ না হয় শেষ করি।

শুভ্রঃ তুমিই শুরু কর।

লালিমাঃ – তুমি আজকাল বড় সিগারেট খাচ্ছ শুভংকর।

শুভ্রঃ – এখুনি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।

কিন্তু তার বদলে?

লালিমাঃ – বড্ড হ্যাংলা। যেন খাওনি কখনো?

শুভ্রঃ – খেয়েছি।

কিন্তু আমার ক্ষিদের কাছে তা নস্যি।

কিন্তু কলকাতাকে এক খাবলায় চিবিয়ে খেতে পারি আমি।

আকাশটাকে ওমলেটের মত চিরে চিরে

নক্ষত্রগুলোকে চিনেবাদামের মত টুকটাক করে

পাহাড়গুলোকে পাঁপর ভাঁজার মত মড়মড়িয়ে

আর গঙ্গা?

সে তো এক গ্লাস শরবত।

লালিমাঃ – থাক। খুব বীর পুরুষ।

শুভ্রঃ – সত্যিই তাই।

পৃথিবীর কাছে আমি এই রকমই বিস্ফোরণ।

কেবল তোমার কাছে এলেই দুধের বালক

কেবল তোমার কাছে এলেই ফুটপাতের নুলো ভিখারি

এক পয়সা, আধ পয়সা কিংবা এক টুকরো পাউরুটির বেশি

আর কিছু ছিনিয়ে নিতে পারি না।

লালিমাঃ – মিথ্যুক।

শুভ্রঃ – কেন?

লালিমাঃ – সেদিন আমার সর্বাঙ্গের শাড়ি ধরে টান মারনি?

শুভ্রঃ – হতে পারে।

ভিখারিদের কি ডাকাত হতে ইচ্ছে করবে না একদিনও?

তাং- ১/৪/২০১৭, রাত- ২-১০।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না