সাম্প্রতিক

দিন আসে দিন যায় (ধারাবাহিক ৩য় পর্ব)

লালিমাঃ হ্যালো, হ্যালো?
শুভ্রঃ “আসিবে তুমি জানি প্রিয়/
আনন্দ বনে বসন্ত এল/ ভুবন হল সহসা প্রিয় দরশা মনোহর।“
লালিমাঃ গান থামাও। তোমাএ শহরে হচ্ছেটা কী শুনি?
শুভ্রঃ কী আবার হলো, একটু ঝেড়ে কাশ তো।
লালিমাঃ আজ না খুব হেসেছি। একেবারে প্রাণ খুলে। হয়েছে কী — সকালে আমার বান্ধবী ফোন করেছিল। বললো গতকাল সকালে ছোট বাচ্চাকে স্কুলে রাখতে যাচ্ছিল বান্ধবী। পথিমধ্যে পশু হাসপাতাল গলিতে বেশ একঝাঁক কিশোরী ও বেশ কয়েকজন কিশোর উত্তীর্ণ ছেলে জটলা। কিশোরীরা সম্ভবত প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিল। ওরা আমার বান্ধবীকে দেখেনি। সে তাদের পেছন পেছন যাচ্ছিল। বুঝতে পারছে যে, ছেলেগুলো কিশোরীদের উত্যক্ত করছে। এক পর্যায়ে এক ছেলে অপেক্ষাকৃত এক বাড়ন্ত কিশোরীকে উত্যক্ত করতে শুনতে পেল। বান্ধবী তাদের কথোপকথন পেছন পেছন শুনতে শুনতে গেল। সকালে বান্ধবী সবিস্তারে আবার আমাকে রিলে করেছে। শুনবে?
শুভ্রঃ হু।
লালিমাঃ শোন, ছেলেটি মেয়েটিকে বলছে – তোমার বুকের উপর উঁচু উঁচু ও দু’টো কি গো?
কিশোরী – তোর বাপের কবর।
ছেলে – আয় না একটু জিয়ারত করি।
কিশোরী – দূর থেকে কর আমিন আমিন।
শুভ্রঃ খুব ভাল। স্মার্ট তরুণ-তরুণী। আমি কি তোমার পেছনে বাইকের কম তেল পুড়িয়েছি? তারপরও ভুল সবি ভুল!
লালিমাঃ এই দেখ দেখ কিছু ভুল ছিল না। শুধুমাত্র ভুল ছিলে তুমি। তুমি তো ফেরেস্তা সাজলে। সুমহান ফেরেস্তা। এ নিয়ে আমি নতুন করে অশান্তি চাচ্ছি না।
শুভ্রঃ আচ্ছা বাবা আমিও চাচ্ছি না।
লালিমাঃ তোমার শহরে মাত্রাতিরিক্ত উত্যক্তকারিদের গোর আজাব বেড়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহি অফিসারের কঠোর পদক্ষেপে কিছুদিন পরিবেশ বেশ ভাল ছিল। এখন আবার সেই তথৈবচ অবস্থা। গার্লস স্কুলের সামনে রোমিওদের তেমন একটা দেখা না গেলেও পশু হাসপাতালের পাশে, পেছনে, বিদ্যুৎ অফিসের পাশে, মহিলা কলেজের আশপাশ এলাকায় তাদের দৌরাত্ব সীমাহীন। এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বেশি বেশি রিপোর্ট আবশ্যক। প্রয়োজন রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ। প্রয়োজন রোমিওদের সামাজিকী করণ। এজন্য এলাকায় সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উঠতি বয়সিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে সমাজকর্তাদের সচেতন করার দায়িত্ব সাংবাদিকের। মশাই তুমিও এড়িয়ে যেতে পারছো না।
শুভ্রঃ যথাজ্ঞা মহারানী। তারপর?
লালিমাঃ বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের রিজার্ভ চুরির সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে অগ্নি সংযোগের কি আদৌ কোন সংযোগ আছে?
রিজার্ভ চুরি কলঙ্কজনক ঘটনার প্রায় বছর পার হতে চলল। বিষয়টি নিয়ে সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা সংবাদপত্র সন্তোষজনক ভূমিকা পালন করেনি। তবে পৃথিবীর বহু দেশে এ নিয়ে অনেক তোড়পাড় হয়েছে। তারা নিজেদের মত করে এ রিজার্ভ চুরির রহস্য উদঘাটন করতে সচেষ্ট। ফিলিপাইনের এক সাংবাদিক তো অনুসন্ধানে অনেক সাফল্য পেয়েছেন। রিপোর্টি কয়েক দিন আগে বিবিসি প্রকাশ করে। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের লোকজন ওই রিজার্ভ চুরির সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি নতুন করে উঠে আসে। রিজার্ভ চুরি এবং সর্বশেষ ই-মেইল হ্যাকিং সংক্রান্ত নানা তথ্য গায়েব করতেই পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হতে পারে বলে অনেকই খুব স্বাভাবিকভাবে মনে করছে। বিবিসি-তে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর পরই এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মানুষের মনে আরও বেশি সন্দেহের দানা বেঁধেছে। সন্দেহের অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে – এই অগ্নিকান্ডের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসকে ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু না জানানোর ঘটনায়।
শুভ্রঃ আচ্ছা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ করে নাকি ইন্ডিয়ার আইটি বিশেষজ্ঞরা? তোমার এ সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা রয়েছে বলে জানিয়েছিলে। এখন কি মনে করতে পারবে?
লালিমাঃ ধর্য্য ধরে শোন – “যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ” বিশ্বব্যাপী মুদ্রা ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের দাপট, রাজনৈতিক ও সামরিক পলিসির উত্থানের সূতিকাগার হিসেবে ফেডারেল রিজার্ভকেই বিশ্বব্যাপী নির্ধারণ করা হয়। সেই ফেডারেল রিজার্ভ থেকে সুক্ষ পরিকল্পনা মোতাবেক ছক অনুযায়ী বাংলাদেশের বৈদেশিক রিজার্ভ চুরি করে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া, এক মাসের অধিক তা গোপন রাখা, সফটওয়্যার নতুনভাবে ইন্সটল করা, ভারতীয় বিতর্কিত আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে তদন্ত করা এবং সর্বোপরি এখনো কোন ফৌজদারি মামলা থানায় দায়ের না হওয়ায় নানান প্রশ্ন উঠেছে। বাঙ্গলাদেশের নীরবতা ও সবাইকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ভারত সফর বিষয়টিতে ভয়ংকর কিছু নির্দেশ করে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রশ্ন উঠেছে তবে কি যুক্তরাষ্ট্রকে হেয় করতেই ভারতের ছকে বাংলাদেশ এই ভয়ংকর ঝুঁকি নিল? যুক্তরাষ্ট্রকে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিন এশিয়ার সবকিছু থেকে বাইরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেও যখন ভারত ব্যর্থ, তখন বাংলাদেশের উপর ভর করেই যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সরকার বিরোধী বাংলাদেশ সরকারের কাঁধে সওয়ার হয় কংগ্রেস আমলিয় ভারতীয় পলিসিমেকার ও গোয়েন্দারা। ফেডারেল রিজার্ভ থেকে টাকা সরিয়ে ফেলার অনেক দিন পরে যখন প্রমানাদি অনেকাংশেই ধংস হয়ে যায়, তখনি বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হয় হ্যাকারদের উপর দোষারোপ করে। সেই সাথে বাংলাদেশ সরকারের হুমকি ধামকি শুরু হয়ে যায় ফেডারেল রিজার্ভের উপর। এমনকি মামলা করার মত হুমকিও দেয়া হয়। অথচ এখনো এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় কোন মামলা করা হয় নাই। এক এক সংস্থা একেকভাবে শুধু তদন্তই করে চলেছে আর সময় ক্ষেপন করছে। অথচ কেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ও ফিলিপিনো ব্যাংকের সিসিটিভি ও বিশেষ সময়গুলোতে কাজ করেনি, বা অকেজো করে রাখা হয়েছিল। ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন কোন অফিসার ফিলিপাইন সফরে গিয়েছিল বলে খবরও রয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনফরমেশন সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধানের নাম দেব দুলাল রায়। কিন্তু তিনিও একদম সুনশান নীরবতা পালন করছেন যাতে অনেকের মনেই সন্দেহ বাড়ছে। তবে দীর্ঘ সুনামের অধিকারী ফেডারেল রিজার্ভ থেকে নিজেরাই টাকা সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বব্যাপী সাইজ করার যে পদেক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে অনেকেই এখন খোলামেলা মন্তব্য করছেন। মিসেস হিলারি ক্লিনটনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই এই পদক্ষেপ ডঃ ইউনুসের বিষয়ে আর নাক না গলানোর একটি অংশ ছিল কিনা তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এমনকি অনেকটা ডিঙ্গিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তাদের অধিকহারে ব্যাংকিং সেক্টরে নিয়োগ দেয়ার সময়েই গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বিপর্যয় আসন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪ জন গুরত্বপূর্ণ নির্বাহী পরিচালক ও ১ জন ডেপুটি গভর্নর রয়েছে সংখ্যালঘু থেকে। সেই সাথে দেশের আইটিতে সংখ্যালঘুদের অধিকহারে হথাৎ করে উদয় হওয়াকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখলেও তা এতদুর গড়াতে পারে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সোনালি ব্যাংক কেলেংকারি এবং শেয়ার মার্কেট কেলেংকারির সাথেও সংখ্যালঘু ব্যাংকাররা জড়িত বলে অভিযোগ প্রকট। এদের দেখভাল ও সামাল দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রনালয়ের ৫ জন অতিরিক্ত সচিবের ৩ জনই হিন্দু রাখা হয়েছে ভারতের নির্দেশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা আত্মসাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কেলেংকারির এই ঘটনা হ্যাকারদের উপর চাপানো হলেও হ্যাকারগন কখনো হ্যাক করা টাকা নিয়ে জুয়া খেলে শেষ করেছে এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি। এমনভাবে ক্যাসিনোতে টাকা ঢুকানো হয়েছে তাতে মনে হয় এই টাকার আত্মসাতের পরিকল্পনায় ক্যাসিনো মালিকেরা বা ম্যানেজমেন্ট জড়িত। আর এরা জড়িত হওয়া মানে মাফিয়া গোষ্ঠী এর সাথে জড়িত। আর মাফিয়া গোষ্ঠীর সাথে কেবলমাত্র বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থার সংযোগ রয়েছে। এটি অংকের মত সাজানো। সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র ‘র’কেই এর সাথে সন্দেহ করা চলে। কারন আইএসআই বা চীনা গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বাংলাদেশের এখন দা- কুমড়া সম্পর্ক। তারা সরকারের বা ভারতীয়দের কোন কথাই শুনবে না। চোর যেমন তার সবুদ রেখে যায়; ডঃ আতিউরের হঠাৎ ভারত গমন, জনৈক আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্তানাকে নিয়োগ দেয়া, ভারতীয় আইটি কোম্পানিকে তদন্ত করতে দেয়া, সুইফট কোড ভারতীয় কোম্পানির কাছে থাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পর্শ কাতর বিষয়াদি ও দপ্তর ভারতীয় ও সংখ্যালঘুদের হাতে ছেড়ে দেয়া, থানায় এখনো এজাহার দায়ের না করা, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ফিলিপিনো ব্যাংকে ঘটনার সময়কালগুলোতে সিসিটিভি কাজ না করা, ক্যাসিনোতে টাকা উজাড় করে সরিয়ে ফেলা এবং বাঙ্গলাদেশ সরকারের নীরবতা সবকিছুর যোগফল বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ফেডারেল রিজার্ভ থেকে চুরির উত্তর। বাংলাদেশ পক্ষ কম বুঝে খেললেও ভারতীয় পক্ষের রয়েছে সুদুর প্রসারী লক্ষ্য যা সামনের দিকগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।
লালিমাঃ আচ্ছা আলমডাঙ্গা কৃষিব্যাংকের দুর্নীতির সংবাদ পড়লাম। শেষ পর্যন্ত একেবারে মফস্বল ব্যাংকেরও এমন দশা? এবারও কি ছাড় পাবে ব্যাংককর্মকর্তা আব্দুল হান্নান?
শুভ্রঃ বেশ কয়েক বছর ধরেই আব্দুল হান্নান এমন অপকর্মে জড়িত। বাদেমাজু, বিণোদপুর এলাকার বহু কৃষক তার নিকট প্রতারিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারীর অভিযোগও রয়েছে। তারপরও এক শ্রেণির রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধি তাকে বাঁচাতে উঠে পড়ে লেগেছে। এর অন্তরালেও চলছে টাকার খেলা।
লালিমাঃ অনেক হয়েছে। এবার তবে যায়।
শুভ্রঃ তোমার যাওয়ার কথায় আমার প্রাণের মাঝে নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর “ তোমার যাবার সময় বুঝি হয়ে যায়/ আমার দেবার কিছু বাকী রয়ে যায়“গানটি ডানা ঝাপটে মরছে।
আচ্ছা তোমাকে কী দেওয়া যায়, কীভাবে দেওয়া যায়?
লালিমাঃ জানিনা ফাজিল! এখন রাখি। সাবধানে থেকো।
শুভ্রঃ তুমিও ভীষণ ভীষণ ভাল থেকো।