সাম্প্রতিক

ছোটদের দুখু মিয়া

কচিকাঁচা-কাজী-নজরুল-ইসলাম-tসাম্প্রতিকী ডেক্স: ক্লাস সিক্সের ছাত্র দুখু মিয়া। স্কুলেরই খুব পুরোনো একটি দালানে থাকে দরিদ্র সেই ছেলেটি। সেখানেই চলে তার পড়াশোনা আর অল্প-স্বল্প লেখালেখি। দুখু মিয়ার পুরোনো আমলের ঘরের ছাদে উইলাগা কোঠরে ছিল চড়ুইপাখির বাসা। কোনো এক ঝড়ের দিন পাখির সেই বাসাটি উড়ে গেল আর তখনই মেঝেতে পড়লো ছোট্ট একটি চড়ুইছানা। মেঝেতে পড়ে ছানাটি চিঁচিঁ করে ডাকছিল আর মাকে খুঁজছিল। দুখু মিয়া ছানাটিকে হাতে তুলে নিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। চড়ুই ছানাটির মমতায় তিনি লিখলেন কুড়ি লাইনের একটি কবিতা। নাম তার-‘চড়ুইপাখির ছানা’। কবিতাটির প্রথম দু’টো লাইন এরকম-

‘‘মস্ত বড় দালান বাড়ির উইলাগা ওই কড়ির ফাঁকে,
ছোট্ট একটি চড়াইছানা কেঁদে কেঁদে ডাকছে মাকে।’’

অদম্য প্রতিভাবান ওই শিশুটির আসল নাম কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি আমাদের জাতীয় কবি। ছোট বেলায় দুঃখ আর কষ্টে কাটানো ওই শিশুকে সবাই ডাকতো দুখু মিয়া নামেই। ছোট্ট যে বয়সে দুষ্টুমি, পড়ালেখা আর খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকার কথা সে বয়সে মক্তবে পড়িয়ে, কখনও বা বিভিন্ন গানের দলে গান গেয়ে কিংবা দোকানে কাজ করে সংসার চালাতে হতো ছোট্ট দুখু মিয়াকে।

দশ বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেন দুখু মিয়া। শিশু দুখু মিয়ার সংসারে তখন ছিল দুখিনী মা আর ছোট ভাই-বোন। মাত্র ১০ বছর বয়সেই মক্তবের পড়ালেখা শেষ করে সেই মক্তবেরই শিক্ষক হলেন। কোরআনে হাফেজ দুখু মিয়া ওই সময়ই ছিলেন মাজারশরীফের খাদেম আর পাড়ার মসজিদের ইমাম। গ্রামের ছোট্ট হুজুর দুখু মিয়ার যেমন সুফি, সাধক, দরবেশদের সঙ্গে মেলামেশা ছিল তেমনি সাধু-সন্যাসীদের সঙ্গেও ছিল সখ্যতা। দুখু মিয়া যেমন হামদ-নাতে দক্ষ ছিলেন, তেমনি কীর্তন, লেটোগানেও ছিলেন অদম্য।

দুখু মিয়ার লেখালেখির হাতেখড়ি তাঁর এক দূর সম্পর্কের চাচা মুন্সি বজলে করিমের হাতে। তিনি ছিলেন গ্রাম্য কবি। বাংলার সঙ্গে আরবি-ফারসি মিলিয়ে গজল লিখতেন। তার দেখাদেখি দুখু মিয়াও পদ মেলাতেন। অদম্য মেধাবী দুখু মিয়া ওই বয়সেই একদিন লিখে ফেললেন-

‘‘নামাজ পড়ো মিয়া,ওগো নামাজ পড়ো মিয়া,
সবার সাথে জমায়েতে মসজিদেতে গিয়া।’’

দুখু মিয়ার সংসারের অভাব কিন্তু তখনও যায়নি। সবকিছু ছেড়েছুড়ে এবার দুখু মিয়া যোগ দিলেন গ্রামের যাত্রাগানের দলে যেটি পরিচিত ছিল লেটো গানের দল নামে। প্রতিভাবান দুখু সেই দলে নিজে নিজেই গান বানান। মেতে ওঠে আসর। আসর মাতানো ছোট্ট এক লেটোকারের নাম ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে। তার দলের মালিক আদর করে দুখুকে ডাকতেন ‘ব্যাঙাচি’ নামে। দুখুর তখন কী খেয়াল হলো কে জানে? একদিন সেই লেটোর দল ছেড়ে ভর্তি হলেন সে সময়ের অন্যতম সেরা স্কুল মাথরুন ইংরেজি স্কুলে। কিছুক্ষণ আগে যে চড়ুই পাখি নিয়ে কবিতা লেখার গল্প বলছিলাম, সেটি তখনকারই ঘটনা। কিন্তু না, দারিদ্রতার কারণে দুখুর সেখানে পড়ালেখা করা হলো না।

ক্লাস সেভেনে উঠেই দুখু এবার পাড়ি দিলেন আসানসোল শহরে। সেখানে এক রুটির দোকানে এক টাকা বেতনের চাকরি পেলেন। সেখানেই একদিন তাঁর পরিচয় হয় রফিজ উল্লাহ নামে এক দারোগার সঙ্গে। ছোট্ট দুখুর পরিশ্রম দেখে দারোগা রফিজ উল্লাহর মায়া হলো। দুখুকে পড়ালেখা করানোর দায়িত্ব নিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন ত্রিশালে। তবে ত্রিশালেও বেশিদিন থাকেননি দুখু মিয়া। বছরখানেক পর তিনি আবার বর্ধমান ফিরে যান। সেখানে ফিরে ভর্তি হন রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে। সেখানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন তিনি।

মাঝখানে এন্ট্রান্স পরীক্ষা মানে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। সে সময় বছর দুয়েক চাকরি করেন সশস্ত্রবাহিনীতেও। ১৯১৯ সালে দুখু মিয়া যান কলকাতায়। সেখানেই লিখলেন ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ নামের একটি গল্প। ছাপা হলো ‘সওগাত’ পত্রিকায়। তাঁর জীবনের প্রথম ছাপা লেখা সেটি। এরপর ‘মুক্তি’ নামে একটি কবিতা ছাপা হলো বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায়। সেটি তাঁর প্রথম ছাপা হওয়া কবিতা। আস্তে আস্তে দুখু মিয়া পরিচিতি পেতে থাকলেন নিজের আসল নামে। অর্থাৎ তাঁকে সবাই চেনা শুরু করলো কাজী নজরুল ইসলাম নামে।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে। বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ। ভারতের বর্ধমানের চুরুলিয়া নামের একটি গ্রামে জন্ম নেয়া দুখু মিয়ার বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম এবং মা জাহেদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী।

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। বাঁধনহারা, সর্বহারা, ভাঙার গান, বিষের বাঁশি, অগ্নিবীণা তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই। কুহেলিকা, রিক্তের বেদন তাঁর উপন্যাস।

ছোটদের জন্যও তাঁর লেখা কম নয়। অসংখ্য হাসির কবিতা, মজার ছড়াপদ্য, মিষ্টি মিষ্টি নাটক আর কত যে গান তিনি লিখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। ঝিঙেফুল, পুতুলের বিয়ে, ঘুমজাগানো পাখি, জাগো সুন্দর চিরকিশোর ইত্যাদি তাঁর লেখা ছোটদের বই। তাঁর লিচুচোর, খুকি ও কাঠবেড়ালি, খাঁদুদাদু, প্রভাতি, শিশু জাদুকর এসব কবিতা তো শিশুদের মুখে-মুখে।

আমাদের প্রিয় এই কবির বিখ্যাত গান- ‘চল চল চল…’ বাংলাদেশের রণসংগীত। কাজী নজরুল ইসলাম সাংবাদিকতাও করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং তাতে অভিনয়ও করেছেন।

সে সময় গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে ছিল ইংরেজদের শাসনের নামে অত্যাচার আর জুলুম। নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেন মানুষের মাঝে। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প-উপন্যাস তাঁর সবকিছুতেই বিদ্রোহের আগুন। তাঁর রচিত কবিতার বিদ্রোহে কেঁপে কেঁপে উঠতো ব্রিটিশ সিংহাসন। ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখির জন্য জেলে থেকেছেন দীর্ঘ সময়। তাঁর লেখা নানা বিদ্রোহী গান ও কবিতা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের জুগিয়েছে প্রেরণা। সেসময় তাঁর গান, কবিতা স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচার হতো।

১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত থেকে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর থেকে কবির পরবর্তী জীবন বাংলাদেশেই কাটে। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং জাতীয় কবি খেতাবে ভূষিত করা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডি লিট’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাভ করেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘একুশে পদক’। এছাড়া কবি তাঁর জীবনে ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘পদ্মভূষণ’য়েও ভূষিত হয়েছেন।

জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। এরও অনেক আগে ১৯৪২ সালে দুরারোগ্যে আক্রান্ত হয়ে কবির বাক ও লেখনী শক্তি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৩৪ বছর এভাবেই বেঁচে ছিলেন তিনি। ৭৭ বছর জীবনে মাত্র ২৩ বছর তিনি লেখালেখি করতে পেরেছেন।

১৯৭৬ সালে স্বাস্থ্যেও আরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল)। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট, বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ ভাদ্র আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অনেক দিন আগে কবিতার মধ্যেই তিনি প্রকাশ করেছিলেন জীবনের শেষ ইচ্ছে। তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মসজিদের পাশেই তাঁর মরদেহ সমাহিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন জাতীয় কবি।