সাম্প্রতিক

প্রবাসীর ঈদ

গল্পকার: খ. হামিদুল ইসলাম আজম

30_days_of_night_red_black_blood_3826_1920x1080

প্রবাসে দশ বছর জীবন যাপন করে হাফিয়ে উঠেছে আকাশ। এবার তার ইচ্ছা বাবা, মা, আত্মীয়, স্বজন বন্ধু, বান্ধবদের সাথে একত্রে ঈদের নামাজ পড়বে। আনন্দ করবে। ঘুরবে, মজা করে এ বাড়ি ও বাড়ি খেয়ে বেড়াবে। পুরোনো দিনের পাইলট হাইস্কুলের সাথিদের সাথে ঈদ পূর্ণমিলনি অনুষ্ঠানে যোগ দেবে। এ ব্যাপারে আকাশের এক সময়ের নাটকের সাথি শেখ নূর মোহাম্মদ জকু ও আকাশের বন্ধু মতিয়ারের বড় ভাই আরশাদুল আলম মন্টু তাকে ফোনে জানিয়েছে। সময় যেন পার হতে চাচ্ছে না আকাশের। এরই মধ্যে ঈদের কেনা কাটা সেরে ফেলেছে সে। আজ একটা ক্যাফে টেরিয়ার বসে কফি খেতে খেতে দেশের কথা ভাবছে আকাশ। চিকেট কাটা হয়ে গেছে। আজ ওর কান্তাকে বার বার মনে পড়ছে। মুখটা কেন যেন বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সেই মায়াবী চোখ, মুখের এক পাশে তিল, মিষ্টি মিষ্টি আঁখি সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উঠে পড়ে আকাশ, আগামিকাল ফ্লাইট। ঈদের আর মাত্র ৭ দিন বাকী। আমেরিকার নিউইয়র্কে থাকে আকাশ। এখানে আজ সবাইকে বলতে হবে। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে। যেখানে কাজ করে মালিককে আগেই বলেছে আজ আবার বলবে। বিল পেমন্টে করে বেরিয়ে পড়ে। ব্যাগেজ গোছানো হয়ে গেছে। বাসায় ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। কিছুতেই ঘুম আসছে না। ছোট বেলার কথা মনে পড়ছে। আকাশ ১৯৭০ সালে আলমডাঙ্গা পাইলট স্কুলের বড় ভাইদের সাথে তৎকালিন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যেসব মিছিল হতো সেই মিছিলে যোগ দিত। একবার মিছিল নিয়ে থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পাইলট স্কুলের ছাত্র মঈন উদ্দিন ভাই ও লতিফ ভাই সহ আরও ২/১ জন থানার ভিতরে ঢুকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে দেয়। সেদিন অন্যদেরকে ছাড়লেও মঈন উদ্দিন ও লতিফ ভাইকে পুলিশ আটক করে চুয়াডাঙ্গা জেল হাজতে প্রেরণ করেছিল। সেদিন ছাত্রদের সাথে মিছিলে স্লোগান দিয়েছিলাম- জেলের তালা ভঙব, মঈন উদ্দিন, লতিফকে আনব। আজ যেন সব স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠছে। ১৯৭১ সাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবার রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বললেন, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। জয় বাংলা। পাকিস্তানিরা সেদিন বাঙালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। সেই ছোট বয়সে বড় ভাইদের সাথে আমিও ভারতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ছুটে গিয়েছিলাম। কি সাহস থাকলে এমন কাজ করা যায় আজ মনে পড়লে শিউরে উঠি। দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের মাঝ থেকে কত আপনজন বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে এদেশের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছে। বিশেষ করে আকাশের এক ভাই টগর, আশুসহ অনেকের কথায় মনে পড়ছে।  এছাড়াও বড় ভাই, আব্বা, চাচাদের সাথে হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগায় যেতাম। নামাজ শেষে কোলা কুলি, বড় চাচা আমাকে কোলে নিয়ে কোলাকুলি করতো। এদিকে রিতা অভিমান করে কাঁদবে ওর সাথে কেউ কোলাকুলি করে না। সবাই ওকে আদর করে। রিতা আকাশ পিঠা পিঠি ভাই বোন। বিছানার এপাশ ওপাশ করে রাত পার করতে চাচ্ছে আকাশ। নাহ আজ ঘুম হবে না। আজ দশ বছর এদেশে ঈদের নামাজে জামাতের কথা ভুলেই গেছে। কাল বাড়ী যাবে সবাই ব্যাস্ত। কাজ কাজ আর কাজ। সব যেন যন্ত্রের মতো হয়ে উঠেছে। বাড়ীর সবার কথা মনে করছে, কোন কিছু কেনা বাদ আছে কিনা মিলিয়ে নিচ্ছে। কান্তার জন্য কি কি কিনেছে একবার চোখ বুঝে মিলিয়ে নিচ্ছে। আচ্ছা একটা কাজ করলে কি হয় একটা ফোন করি- না্হ্। ফোন করব না হঠাৎ ওকে চমকে দেব। কোনমতে ঘুমের ভান করে শুয়ে পড়ে। ভোর হতেই তাড়াহুড়ো বাধে, নাস্তা সেরে রেডি হতে বেশ সময় লেগে গেছে। এক বন্ধু আসার কথা- কি ব্যাপার ও কি ভুলে গেছে হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠার শব্দে দৌড়ে দরজা খুলে দেখে রবি। এখানে সাবই সময়ের মূল্য দেয়। রবিও ঠিক সময় এসে পৌছেছে। রবির বাড়ী বাংলাদেশের খুলনায়। ও বাড়ীর জন্য কিছু জিনিস দিয়েছে। ও গুলি পৌছে দিতে হবে। বাসা থেকে সোজা বিমান বন্ধর। রবিকে বিদায় দিয়ে সব কাজ শেষ করে ফ্লাইটে উঠে বসল আকাশ। আজ কেন যে এত আনন্দ লাগছে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌছালো আকাশ। ওর এক আত্মীয় ঢাকা বারিধারায় থাকে। প্রথমে ও সেখা্নে উঠেছে। ওরা তো ভিষন খুশি। অবশ্য আগে একবার ফোনে বলেছে-

ভালো আছেন খালা আম্মা।, নাশির কোথায় ? শিরিন তো বেশ বড় হয়েগেছে। পড়া শোনা কতদূর?

বিবিএ করছে।

বাহ, এই না হলে খালা আম্মার মেয়ে।

খেতে খেতে গল্প করছে। জিনিসপত্র রেখে বিকালে ঢাকায় একটু বেড়াতে বের হয়েছে আকাশ। এই দশ বছরে বাংলাদেশ কিন্তু বেশ উন্নয়ত হয়েছে, তাই না শিরিন।

হ্যা, ভাইয়া। তোমরা আমেরিকায় থাক। ঢাকা কি পছন্দ হবে তোমাদের।

খুব পেকে গেছ না? চল ওই রেষ্টুরেন্টে বসে ঠান্ডা খাই।

দুজনা গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে বসে নাস্তার অর্ডার দিয়ে বসে গল্প করছে। এই এলাকায় সব বিদেশীদের বসবাস। স্বভাবতই এখানে বিদেশীদের ভীড় বেশি। সবাই যার যার টেবিলে বসে খাচ্ছে। হঠাৎ ৭/৮ জন যুবক রেষ্টুরেন্টে প্রবেশ করে প্রথমে বিদেশেীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে । তারপর সবাইকে হুমকি দেয়- কেউ নড়ার চেষ্টা করলে গুলি করে হতা করা হবে। এরপর ঘটে গেল নাররকিয় ঘটনা সন্ত্রীরা একে একে হ্যাতাযজ্ঞ শুরু করে বোমা বিষ্কারণ সহ তলয়ার দিয়ে জবাই করে, লুটিয়ে পড়ে শিরিন। গুলির শব্দে পড়ে যায়। সামান্য আহত হয় শিরিন। কিন্তু আকাশ ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে দেশে এসে বড় ঈদগায় ঈদের নামাজ পড়বে মা ভাই বোনদের সাথে । হাসি খুসি করবে। মাত্র কয়েক মিনিটে সব শেষ হয়ে গেল। কে জানত এই রেষ্টুরেন্টে আকাশের আজ শেষ দিন হবে। সবার সাথে ঈদের নামজ না পড়তে পারলেও তার লাশ দেশের বাড়ী সমাধিস্থ্য করতে পেরেছে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে।