সাম্প্রতিক

ধুলোমাটির যতিচিহ্ন

গল্পকার: রফিকুর রশীদ

imagesএক.
কারা মুক্তির পর আবার নতুন করে জীবন শুরু করবে কি, ঐ একটি যতিচিহ্ন স্পর্শ করার কারণে শরাফত আলীর জীবনটাই যেন সহসা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। পতাকা তোলার সময় রশিতে হঠাৎ গিট পড়লে পতাকা যেমন মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ে, অনেকটা সেই রকম। একে এখন অর্ধনমিত নাকি অর্ধউত্থিত দশা বলবে সে? শরাফত আলীর মনে হয়, নিজের অলক্ষেই সে কিশোরবেলার কোনো খেলায় শামিল হয়েছে যেনবা। তারই ছেলে স¦পন এ খেলায় প্রতিপক্ষ। প্রথম দান খেলেছে সে নিজে। পরের দান স¦পনের। এখন উভয়ের শোধবোধ। কিন্তু তারপর?
এ খেলার সূত্রপাত হয় বেশ কবছর আগে যখন মেয়েঘটিত কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে খুন খারাবি করে স্বপন হাজতে ঢোকে তখন। পিতৃত্বের দায় বলে কথা। এরশাদ সরকারের এক পাতিমন্ত্রীকে ধরে এবং জলের মতো বেসুমার টাকা ঢেলে সে যাত্রা পুত্র- উদ্ধার ঘটে। অচিরেই ম্যানপাওয়ার বিজনেসের সঙ্গে সোনার বিস্কুট হজম করার আঁটঘাট চিনিয়ে দিয়ে সদাশয় সেই মন্ত্রী অবশ্য তার টাকার শোক ভুলতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও স¦পনকে তার নিজস¦ জগৎ থেকে আর ফেরাতে পারেনি। ছাত্রজীবনের বারোটা বাজিয়ে সে করে সৈ¦রাচার বিরোধী আন্দোলন, মিছিল মিটিং জ্বালাও পোড়াও— যত্তোসব লম্ফ ঝম্ফ!
বাপের দুর্দিনে সেই স¦পন এমন ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, ভাবতেই পারেনি শরাফত আলী। অসময়ে বিস্কুটের চালান আটকে কারাগারে ঢুকলে, সিকি হোক-হাফ হোক সেই বিস্কুট গেলানো মন্ত্রীর কথা মনে পড়েছিল তার। কিন্তু মনে পড়লে হবে কী— সেই মন্ত্রীদের তখন বোরখার আড়ালেও গা ঢাকা পড়ে না, এমনই দুর্দশা! শরাফত আলীর খবর নেবে কে! অথচ সেই দুঃসময়ে মাত্র ছমাসের মাথায় জন্মদাতা বাপকে হাজত থেকে বের করে এনে স¦পন সগর্বে জানায়— সরকার বদলেছে তাতে কি, মন্ত্রীরা তো ভিনগ্রহ থেকে আসেনি! আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করে তাদের ক্ষমতায় এনেছি, আর এখন একটা দাবি মানবে না! শরাফত আলী নতুন চোখে নিজের ছেলেকে দেখে— এই তার স¦পন! প্রথম যৌবনের বিমুগ্ধ স¦প্ন। তিনটে না চারটে বাজে মামলার আসামী হয়ে হাতকড়া পড়লো— এই তো গত বছর, অথচ হাজত থেকে বেরিয়ে এলো সৈ¦রাচারবিরোধী আন্দোলনের সাহসী কর্মী হিসেবে গলায় মালা পরে। তবু স¦পন যে আদৌ কোনো মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে এবং বাপের জন্যে দৌড়ঝাঁপ করবে, এমন ঊর্বর ভাবনার উদয় হয়নি কখনো শরাফত আলীর মাথায়। কিন্তু বাস্তবে হলো তাই! হাজত থেকে বাপকে বাড়িতে এনে রীতিমতো অভিভাবকের কণ্ঠে তিরষ্কার করে ওঠে স¦পন- রাজনীতিটাও দেখেশুনে করতে হয়, বুঝেছ?
গিটে আটকে যাওয়া অর্ধউত্থিত জীবনে রাজনীতি করবে কি— শরাফত আলী কোনো কিছুতেই উদ্যম পায় না। পুত্রের উপর থেকে অনেক আগে আশা ভরসা উঠে গেলেও একমাত্র কন্যা মায়া ছিল তার মানসিক নির্ভরতার অবলম্বন। বাড়ি এসে নাগাদ সেই মায়াকে কোথাও দেখতে না পেয়ে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কীর্তিমান পুত্রের কণ্ঠে অভিভাবকত্বের তড়পানি শোনার পর জননীপ্রতিম কন্যার কাছে একটু আশ্রয় খোঁজে তার মন। তাকে জড়িয়ে ধরে এত যে আকুলি বিকুলি অশ্রুপাত করে তার স্ত্রী, তবু কী এক দুর্বোধ্য কারণে এই মহিলাকে ভয়ানক দূরের মানুষ মনে হয় । সে অস্ফুট কণ্ঠে মায়াকেই ডেকে ওঠে— মায়া!
বহুদূর থেকে মায়ার মা জানায়— মায়া নেই।
নেই! নেই মানে? কান্নার ভাঁজ খুলে খুলে জননী জানায়, মাসখানেক আগে স¦পনের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের বুলেট বাদল ভাগিয়ে নিয়ে গেছে মায়াকে। এখন বুলেট বাদলের উপরে বদলা নেওয়ার জন্যে দিনরাত তড়পে বেড়াচ্ছে স¦পন। কন্যার ভবিষ্যৎ ভাবনায় উৎকণ্ঠিত জননী কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতেই থাকে। পুরানো ঢাকার ভয়ংকর ত্রাস বাদলকে বেশ চিনতে পারে, তবু যেন শরাফত আলীর কিছুই যায় আসে না।
স্ত্রী পুত্র কন্যা— সবাই যেন নাগালের বাইরে চলে গেছে দূরে— বহু দূরে। দেখে শুনে রাজনীতি করার যতোই শক্ত ছবক দিক পুত্র, রাজনীতি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ কখনোই ছিল না তার। পাকিস্তান ফেরত রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার মাথার উপরে বস হয়ে আসার পর তার রোষানলে পড়ে চাকরি হারানোর ফলে শরাফত আলী ব্যবসাটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। মাত্র ১০/১২ বছরে যা কামাই করছে, তা কম কিছু নয়। টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে আর ইচ্ছে করে না মোটেই। ব্যবসা বাণিজ্য মানেই তো নতুন নতুন ঘাটে ঘাটে আবারও ফুলজলের নৈবদ্য দিয়ে পারানিদের তুষ্ট করা। নাহ্, আর কেন! তাহলে এখন কী করবে সে, সামনের জীবনটাকে কীভাবে বয়ে নিয়ে যাবে?
ঘরে বসেই স¦পনের বিপুল কর্মতৎপরতা দেখতে দেখতে এক সময় নিজের অকর্মন্যতাই বড় হয়ে উঠছে শরাফত আলীর কাছে। ওদের পার্টি পাওয়ারে। কতো কাজ ওদের! দম ফেলার ফুরসত নেই। রাজনীতিটাও দেখেশুনে করতে হয়— ছেলের উপদেশ বাণী কানের দরজায় দম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। না, রাজনীতি তো সে কোন দিনই করেনি। তার সে যোগ্যতা আছে বলে কখনো মনে হয়নি। এতে এতদিনে নিজের সন্তানের যোগ্যতা ও তৎপরতা দেখে দেখে তার মনে হয়— অর্থ নয়, রাজনীতিই সব ক্ষমতার উৎস। জো মতো ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারলে অর্থ, মর্যাদা, প্রতিপত্তি সবই এসে ধরা দেয়। বছর না ঘুরতেই স¦পনের পৃথক গাড়ি বাড়ি হয়েছে; হোক হিন্দুর বাড়ি, তবু তো সে কব্জা করেছে! ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের নতুন ওয়ার্ড কমিটিতে সভাপতির পদটা দখল করতে গিয়ে সামান্য রক্তা-রক্তি হয়েছে। একজন কর্মী নাকি মারাও গেছে, তা বড় কিছু অর্জন করতে গেলে অমন ছোটখাটো ত্যাগ স¦ীকার করতেই হয়। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের জন্যে স¦পন করেছেও যথাসাধ্য। বিরোধীদলের গু-াদের উপরে খুনের দায় চাপিয়ে লাখ টাকার ব্যবস্থা করেছে। হ্যাঁ, এক লাশের জন্যে এক লাখ! প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সেই লাখ টাকার চেক গ্রহণের সময় নিহতের পিতামাতার মাঝখানে স¦পনও দাঁড়িয়েছিল হাসিমুখে। ফলে সেদিনের আটটা-দশটার টিভি নিউজে এবং পরদিনের জাতীয় দৈনিকগুলোতে যুবনেতা স¦পনের দন্তবিকশিত হাসিরও প্রচার হয়ে যায়। এই সব নিয়েই স¦পনের রাজনৈতিক ব্যস্ততা। মা বাপের খোঁজ খবর নেয়ার মতো তুচ্ছ কাজে সময় দেয়ার অবকাশই ঘটে না তার। তবু এরই মাঝে হঠাৎ একদিন বাপের মুখোমুখি হয়ে একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে জানতে চায়— তুমি তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলে, তাই না বাবা?
প্রশ্ন শুনে শরাফত আলীর তো চোখ কপালে— এতদিন পর ছেলের কাছে তার কৈফিয়ৎ দিতে হবে নাকি! মুখ হা হয়ে যায় কিন্তু কোনো জবাব ফোটে না; কেবল চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থাকে। স¦পন আবারও প্রশ্ন করে— সত্যিই করেছিলে যুদ্ধ?
কী জবাব দেবে শরাফত আলী! শুধু মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের কারণে চাকরি হারিয়েছে। কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান পাকিস্তান ফেরত রিটায়ার্ড মেজর দাঁতে দাঁত পিষে শুনিয়েছে, অল অব ফ্রিডম ফাইটার্স আর বাস্টার্ড। এতদিন পরে ছেলের মুখে আর কতো নির্মম উচ্চারণ শুনতে হবে কে জানে! ভয়ে ভয়ে একবার চোখ তুলে তাকায় মাত্র। পুত্রের চোখেমুখে কি তবে অবিশ্বাসের খররৌদ্র ঝলসে ওঠে! তার মানে পিতার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সেই সর্বনাশা যুদ্ধের কারণে পিতামহের শহীদ হওয়া, ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হওয়া, সব কিছুতেই স¦পনের অবিশ্বাস! ভয়ানক অপমানে ধ্বসনামা কণ্ঠে সে কেবল ছোট্ট ধ্বনিতে উচ্চারণ করে— হুঁ।
যুদ্ধ করেছ, তবু রাজনীতির হাওয়াটা তুমি ধরতেই পারোনি। সিরাজ আঙ্কেলের খবর জানো?
সিরাজ আঙ্কেল? স¥ৃতি হাতড়ে শরাফত আলী যাকে খুঁজে পায়, সেই সিরাজউদ্দিন তার চাকরি জীবনের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মী। বসের মুখের ‘বাস্টার্ড’ গালি যাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না। এক সময়ে সে-ই চাকরিচ্যুত শরাফত আলীকে ব্যবসা বাণিজ্যের লাইনঘাট চিনিয়ে ছিল বটে কিন্তু অল্পদিনেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার কারণে ওর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ফাটল দেখা দেয়। তারপর দীর্ঘদিন যে যার পথে চলেছে, কেউ কাউকে ঘাঁটায়নি। এতদিন পর স¦পন আচানক সংবাদ জানায়— সেই সিরাজউদ্দিন সাহেব নাকি কুমিল্লার কোন আসন থেকে ওদের পার্টির টিকেটে এমপি হয়েছে। জোর লবিং চলছে, ছোটখাটো মিনিস্টারও হয়ে যেতে পারে। একদা নিকটজনের এই সাফল্য-সংবাদে শরাফত আলীর কোনো প্রতিক্রিয়া নিরূপন করতে পারে না স¦পন। তাই সে ফস্ করে প্রস্তাব দিয়ে বসে,
দেখা করবে নাকি একদিন আঙ্কেলের সঙ্গে? ব্যবস্থা করবো?
শরাফত আলী একটুখানি চমকে ওঠে, সিরাজুদ্দিনের সঙ্গে সে দেখা করবে? কী প্রয়োজন? তারও ব্যবস্থা করে দেবে স¦পন তারপর ভিজিটর হয়ে গিয়ে সাক্ষাৎপ্রার্থীর লাইনে শামিল হবে? ডানে বামে তার ঘাড় দুলে ওঠে, অষ্ফুটে জানায়-নাহ।
তোমার এক সময়ের কলিগ, কাল বাদে পরশু মন্ত্রী হবে- তবু দেখা করবে না? শরাফত আলী পূর্বাপর নির্বিকার। বাপের নির্লিপ্ততা সহ্য হয় না স¦পনের, সে আবার পুরানো ক্ষত খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে— এই জন্যেই তো বলি, তুমি রাজনীতিটাও দেখেশুনে করতে শিখলে না।
এতক্ষণে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় শরাফত আলীর।
আমি কখনোই রাজনীতি করিনি স¦পন। ওটা তুই করিস।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই করবো। তুমি থেকো তোমার জগৎ নিয়ে।
রাগে গজগজ করতে করতে চলে যায় স¦পন।
কিন্তু এ ঘটনার পর শরাফত আলী নতুন করে নিজের জগৎ খুঁজতে শুরু করে এবং সহসা একদিন সকালে উঠে টুথব্রাশ হাতে বেসিনের সামনে দাঁড়াতেই আয়নার মধ্যে এক নতুন শরাফত আলীকে আবিষ্কার করে বসে। কাঁচা পাকা দাঁড়িতে দিব্যি ঢেকে দিয়েছে পুরানো চেহারাটা। ডানে বামে ঘুরে নানান প্রোফাইলে নিজের চেহারাটা দেখে তার খুব মনে হয়— অযতেœ বেড়ে ওঠা শ্মশ্রুরাশির আড়ালে কখন অলক্ষে হারিয়ে গেছে পুরানো শরাফত আলী। এই শ্মশ্রুরাশি তার ছমাসের কারাজীবনের অক্লেশ সঞ্চয়। বাড়ি এসেও বহুবার দাড়ি কেটে ফেলার কথা মনে হয়েছে। বাথরুমে ঢুকে রেজার হাতে নিতেই আবার অন্যরকম অনুভূতি জেগে ওঠে, মনে হয়— থাক না এগুলো বন্দিজীবনের সাক্ষী হয়ে। প্রথম দিনেই বাহাদুরী দেখাতে স¦পন আশ্বস্ত করেছে, কোন বিশেষ যাদুমন্ত্রবলে সে নাকি বাপের মামলার ফাইলটাই গায়ের করে দেবে! তা সে পারবওে হয়তো বা। তাহলে আর শরাফত আলীর কারাজীবনের চিহ্ন থাকবে কীসে! শ্মশ্রুশোভিত মুখে হাত বুলিয়ে বারবার নামিয়ে রেখেছে রেজার।
সেই গোঁফদাড়ির জঁঙ্গলে আচ্ছাদিত নতুন শরাফত আলী নিজের জন্যে সেদিনই নতুন ঠিকানাও নির্ধারণ করে নেয়। নতুন বললে নতুন, আবার তার সেই ঠিকানা চির পুরাতনও বটে। অনেক হলো ঢাকাবাস। এবার সে গ্রামে ফিরে যাবে। আঁতুড়বেলার নাড়িপোঁতা গ্রাম নীলগঞ্জের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে সেই কবে— মাতৃবিয়োগের পর থেকেই যোগাযোগ নেই। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয় কখনো! বরং এতদিন পর তার মনে হয় যেন— ঢাকাবাসের প্রতিটি দিনই ছিল বুঝিবা কারাজীবনের দিন। সেই দুঃসহ দিনের সহসা অবসান ঘটেছে। এখন সে মুক্তির আনন্দ নিয়ে ফিরে যাবে নীলগঞ্জে। পিতামাতা ঘুমিয়ে আছে, থাক সেই মাটিতে; জেগে আছে চেনা অচেনা অসংখ্য স¦জন। শরাফত আলী ফিরে যাবে জান-পস্তানো স¦জনের মাঝে। এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে সব চেয়ে খুশি হয় স¦পন। প্রবল উৎসাহে সে জানায়— আজকাল এ রকমই তো হচ্ছে। মানুষ ঢাকা থেকে মফস¦লে গিয়ে একটা পার্টির ভেতরে ঢুকে ধাক্কাধাক্কি করে কিছু দিনের মধ্যে নেতা হয়ে ফিরে আসছে। পার্টি ফান্ডে মালপানি ঢেলে নমিনেশনটা বের করে নিয়ে যেতে পারলেই হলো। পাবলিক তো হাওয়ায় ভাসে। হাওয়া ঘুরলে তখন কলাগাছও বেরিয়ে যায়। তুমি যাও। এখন থেকে কাজ করো। নোমিনেশনের ব্যাপারটা আমি দেখবো।

দুই
পুত্রের কাছ থেকে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সরল পাঠ গ্রহণের পরও নীলগঞ্জে এসে শরাফত আলীর মনে হয় পুরো ব্যাপারটা মোটেই অতো সহজ নয়। তার জন্যে কোথাও রূপকথার ফুল ছিটানো আসন পাতা নেই। নীলগঞ্জে সবই আছে, তবু যেন তার শৈশব কৈশোরের স¥ৃতিমাখা সেই গ্রামটিই আর নেই। গত সরকারের আমলেই দুপাশ থেকে দুটো তিনটি করে ইউনিয়ন কেটে নিয়ে নীলগঞ্জ থানা হয়েছে, থানা থেকে এক লাফে ভোল পাল্টে আবার উপজেলা। বিদ্যুতের আলো, নতুন রাস্তাঘাট সব কিছু মিলিয়ে শহর শহর ভড়ংটুকু ঠিকই এসেছে কিন্তু গ্রাম্যতা দোষ থেকে এতটুকু মুক্তি ঘটেনি। প্রতিহিংসাপরায়ন রাজনীতির কুৎসিত এবং ভয়ংঙ্কর ছোবলে গ্রামীণ সারল্য এখানে ছিন্নভিন্ন ক্ষতবিক্ষত। তবু সবার চোখে মুখে শরাফত আলী খুঁজে পায় অপরিসীম কৌতুহল আর আঁধার। তাড়ানো উৎসাহ। সপ্তাহ না পেরুতেই চাচাতো মামাতো ভাই-ভাইপোদের বৃত্তে তাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়। সে টের পায়, তবু গায়ে মাখে না। একদিন তো প্রকাশ্যেই একজন সন্দেহ— কুতকুতে প্রশ্ন করে বসে— মিয়াভাই কি পলিটিকস্ করতি চান?
প্রশ্নকর্তা আবু বকর মাস্টার যে তার দুধাপ দূরের চাচাতো ভাই, কদিন আগে এ কথা সে নিজে মনে করিয়ে না দিলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। বয়সে ছোট, অথচ চুলদাড়ি, বেশভূষায় মুরুব্বির একশেষ। থুঁতনিতে ঝুলে থাকা ফুরফুরে দাড়ির গোছায় হাত বুলাতে বুলাতে সে তার কৌতুহলের ব্যাখ্যা দেয়— না মানে, আওয়ামীলীগ-বিএনপি সবার কথাই শুধু হচ্ছে তো, তাই তি বুলচি। এরপর সে নিজে থেকেই সঠিক পার্টিরও নির্দেশনা দেয়— শোনেন মিয়াভাই, ও সব দুনিয়াভি পার্টির দিন শেষ। যদি চান তো আল্লার পার্টি করেন। আবু বকর মাস্টারের আল্লার পার্টি সম্পর্কে আর বিস্তারিত জানার কৌতূহল দেখায় না শরাফত আলী। সে হা-হা করে হেসে জানায়— শেষ বয়সটা আমি আপনজনের মধ্যে কাটাতে চাই। ঢাকায় আমার বাড়ি গাড়ি, টাকা পয়সা আছে, আপনজন কে আছে?
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে খুব ধীরে ধীরে নীলগঞ্জের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রাজনৈতিক অঙ্গনে শরাফত আলী আপনজনের বৃত্তকে প্রসারিত করেছে। বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দিয়েছে উদার পৃষ্ঠপোষকতা। একটি কেজি স্কুল খুলতে গিয়ে এক ঝাঁক শিক্ষিত বেকার উদ্যমী তরুণকে নাগালে পেয়ে যায়। তাদের খুব ইচ্ছে নীলগঞ্জে একটি মহিলা কলেজ খোলার। এ প্রস্তাবে শরাফত আলী প্রথম একটু চমকে ওঠে, তাদের ছাত্র জীবনে নীলগঞ্জে একটি কলেজ খোলার বাস্তবতাই ছিল না, সাতাশ মাইল দূরের কুষ্টিয়া কলেজে গিয়ে তাকে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে হয়েছে; এখন এই নীলগঞ্জেই মেয়েদের জন্যে পৃথক কলেজ খোলার দাবি উঠছে। নারী শিক্ষা প্রসারের এই প্রস্তাবেও সে একবাক্যে সমর্থন জানায়, তবে আগে স্কুল তারপর কলেজ। একটু ধীরে দেখে শুনে এগুতে চায় সে। এ সব নানামুখী কর্মব্যস্ততার মধ্যে দেশ জুড়ে আবার সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলে তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল অদম্য হয়ে ওঠে। দুটি প্রধান দলেরই চেনাজানা কিছু কিছু কর্মী সমর্থক তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা প্রত্যাশা করে। ঋষিবৎ ঔদাসীন্যে সে সবাইকেই জানায়— না-রে ভাই, এক সময় দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি, সেই যুদ্ধে বাপকে হারিয়েছি, রাজনীতি করলে সে আমলেই করতাম। শ্রোতা সাধারণের চোখে মুখে কৌতূহলের তীব্রতা প্রত্যক্ষ করে সে সাবিনয়ে নিবেদন করে— গরীবের ছেলে, পেটের ধান্দায় টাকার পেছনে ঘুরেছি দিনরাত, রাজনীতি করবো কখন? এখন সেই টাকায় দেশের কাজ করছি, এতেই আমার আনন্দ। রাজনীতি যারা করছে, তাদেরই করতে দাও। শরাফত আলীর বিস¥ৃতপ্রায় মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে যারা বিশেষভাবে উদ্দীপ্ত হয়, তারা তার রাজনীতিনিস্পৃহ বক্তব্যকে মহতের উদারতা ভেবে আরো প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে। এমন কি তারা একদিন রাজধানীর অনুকরণে নীলগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়ে জনতার মঞ্চ বানিয়ে শরাফত আলীকে এক প্রকার জোর করে সেখানে তুলে দেয় এবং মাইকে নাম ঘোষণার সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদপুত্র শিক্ষানুরাগী সমাজসেবী… ইত্যাদি বিভূষণে কন্টকিত করে মূল নামটাকেই আড়াল করে ফেলে। সেদিন মঞ্চে উঠে বিশেষ কিছুই বলতে পারেনি সে। তার কেবলই মনে হয়েছে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স¦পন, মুখ খুললেই গলা টিপে ধরবে। কেবল দেশের কাজ করার জন্যে সে মানুষের দোয়া চেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসেছে। ধোপদুরস্ত পোষাকের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী এরপর সাজিয়ে গুছিয়ে অনেক কথা বলেন।
সামান্য এই দোয়া চাওয়াতেই নীলগঞ্জের রাজনৈতিক সামাজিক অঙ্গনে শরাফত আলী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং তার গায়ে দলীয় ছাপ লেগে যায়। তখন চায়ের দোকানে, বৈঠকখানায়, গ্রাম্য মাচায়, মানুষের মুখে মুখে বিস্তর গবেষণার সূত্রপাত হয় তার আয়ের উৎস এবং সর্বোপরি তার ছেলে স¦পনের কীর্তিকলাপ নিয়ে। কারো কোনো কথায় কান না দিয়ে সে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে ডুব দেয়। বিশ বছরের একটি পুরানো কলেজ থাকলেও নিভৃত এই মফস¦লে আরেকটি কলেজ খোলা কি চাট্টিখানি কথা! কতো পরিকল্পনা, কতো কাজ, কতো ব্যস্ততা তার! এরই মাঝে বিচারপতি হাবিবুর রহমান দেশের ভার কাঁধে নিলে ঢাকা থেকে টেলিফোনে স¦পন জানায়, নোমিনেশন নিতে হলে এক্ষুনি ঢাকায় এসো, ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলে ফাইনাল করে যাও।
শরাফত আলী ঢাকা যাবার কোন প্রকার গরজই অনুভব করে না। স¦পনদের দলের জন্যে নীলগঞ্জ অত্যন্ত উর্বর ক্ষেত্র। পঁচাত্তরের পর থেকে নামে বেনামে এখানে সেই দলের লোকই বরাবর জিতেছে। দুর্ভাগ্য তবু থানা কমিটির সভাপতি আলহাজ নাজিমুদ্দীনের, নীলগঞ্জে পার্টির হাল ধরে থাকে সে অথচ নির্বাচনের মৌসুমে জেলা কমিটির প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারী দু’জনের মধ্যে যে কেউ একজন কোর্টের উকিল— কেন্দ্র থেকে নোমিনেশন বাগিয়ে যেখানে যাবার ঠিক চলে যায়। এ নিয়ে দলে চরম অন্তর্কোন্দল। এই সুযোগে কাড়িখানিক টাকা খসিয়ে নিলামে জিনিস কেনার মতো করে নোমিনেশনটাও হয়তো যোগাড় করে ফেলতে পারে স¦পন। কিন্তু শরাফত আলীকে যে তাহলে পিতৃহন্তÍারক নাজিমুদ্দীনের পায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করে দলে নামতে হয়। জীবনে অনেক বৈপরীত্যের কাছে আত্মসমর্পন করলেও এই কাজটি তার কাছে অসম্ভব মনে হয়। একদা গোটা দেশের নেতা সব রাজাকারকে ক্ষমা করেছেন, কিন্তু নীলগঞ্জ পিসকমিটির নেতা সেই রাজাকার সর্দার নাজিমুদ্দিনকে ক্ষমা করার মতো মহানুভব সে কখনোই হতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে না হোক, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ব্যক্তিগত ক্ষতি ও ক্ষতকে কিছুতেই সে অতিক্রম করতে পারে না। নাজিমউদ্দীনকেই তার পিতৃহত্যার আদেশদাতা হিসেবে সন্দেহাতীতভাবে শনাক্ত করার পর শরাফত আলীর দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সব কিছু অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে ওই একটি মাত্র শীর্ষবিন্দুতে এসে স্থির দাঁড়িয়ে পড়ে। এতো দীর্ঘদিনের ব্যবধানেও মে ঐ বিন্দু থেকে সরে আসতে পারে না।
এদিকে জনতার মঞ্চঅলাদের মধ্যে থেকেও যারা সম্ভাব্য এমপি প্রার্থিকে সমর্থন করতে পারে না, তাদের ভেতরে দু’চারজন এসে শেষবারের মতো ঝাঁকুনি দিয়ে দেখে—
সত্যিই আপনি রাজনীতি করবেন না শরাফত ভাই?
শরাফত আলী একগাল হেসে জবাব দেয়—
আমি তো বলেইছি, আমাকে আগে আমার কাজ করতে দাও। রাজনীতির কথা পরে ভাবা যাবে।
এবারের ইলেকশনে হবে টাকার লড়াই। হারুন ভাই অতো টাকা কোথায় পাবে?
টাকা? মানুষের একতা থাকলে টাকার কোনো সমস্যা হয় নাকি? যাও, সবাই মিলে কাজ করোগে।
নির্বাচনের সাতদিন আগে হারুন অর রশীদের নির্বাচনী তহবিলে একেবারে তলানি পড়ে গেলে শরাফত আলী নিঃশর্তভাবে এক লাখ টাকা ঢেলেছে, তবু তরী জল পায়নি। নীলগঞ্জের রাজনৈতিক চারিত্র্যটাই বড় অদ্ভুত। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলে পক্ষাপক্ষ স্পষ্ট হয়ে যায়, চোখের আড়ালে অঘোষিত ঐক্যও ঠিকই হয়ে যায় আপন গরজে। নোমিনেশন না পাবার দুঃখ ভুলতেও সময় লাগে না নাজিমউদ্দিনের। সারা দেশে সরকার গঠন করতে না পারলেও নীলগঞ্জের আসন তো থাকে তার দলেরই দখলে। এতেই ঢের আনন্দ তার। এমপি বসে ক্যাদ্যানি মারে ঢাকার রঙমহলে, এ দিকে স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়ার হ্যান্ডেলিং করে সে। এতদিন এমনই হয়ে এসেছে। কিন্তু আবার সরকার গঠনের পর অচিরেই সে উপলব্ধি করে— পাওয়ার গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থি হারুন অর রশীদের মুঠোয়।
পাওয়ারের ধর্ম কি তবে পানির মতো—পাত্রের রঙেই রঙ!
এদিকে দুদুবার সময় পরিবর্তনের পরও নীলগঞ্জে মহিলা কলেজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিন শরাফত আলীর মন বিষন্ন হয়ে যায়। শিক্ষামন্ত্রীর নামে প্রস্তরফলক সেঁটে দেয়ার পরও সময় অভাবে তিনি আসতে না পারায় অগত্যা সরকারি দলের স্থানীয় সভাপতি হারুন অর রশীদই ফিতে কেটে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন এবং বিরস বদনে মন্তব্য করেন— এ সব রাশভারী আমলা দিয়ে কি রাজনীতি চলে নাকি মিনিস্ট্রি চলে। যত্তোসব! অথচ শিক্ষামন্ত্রীকে আনার প্রস্তাবও ছিল তার, দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনিই। নিন্দুকেরা এরই মাঝে কানাঘুষা করে, মন্ত্রী না আসার পেছনেও নাকি তার হাত আছে। শরাফত আলী এ সব কথা কানে তোলে না। কিন্তু প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও নবনিযুক্ত শিক্ষকমন্ডলী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার নামে একটি ছোট্ট ফলক দেয়ালে সেঁটে তার পর্দা উন্মোচনের জন্যে আহ্বান জানালে সে খুবই বিব্রত বোধ করে। তারা তো কলেজেরই নামকরণ করতে চেয়েছিল শরাফত আলী অথবা তার শহীদ পিতার নামে। কঠোরভাবে তাদের নিবৃত করলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবার সেই প্রসঙ্গ উঠে আসে সুধীজনের মধ্যে থেকে। শরাফত আলী সবাইকে সবিনয়ে জানায়— নামের ফাঁদে আটকে গেলে কাজ হবে না। এখনো তার অনেক কিছু করার আছে।
এরপর জনতার মুখে আর কথা সরে না।
তারা কথা বলে শরাফত আলীর একটানা পাঁচ-ছয় বছরের কর্মকা- পর্যবেক্ষণের পর। কথা বলে মানে জোরে দাবি তোলে শরাফত আলীর পক্ষে। ফলে এক সময় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ তার জন্যে অনিবার্য হয়ে ওঠে। এমন কি দীর্ঘদিন গোঁ ধরে থাকার পরও হঠাৎ কী ভেবে হারুন অর রশীদও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। মোটামুটি সব মহলের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে মনে হয় পঁচাত্তরের পর এই প্রথম বুঝিবা নীলগঞ্জের রাজনৈতিক হাওয়া ঘুরে যায়। শরাফত আলীর প্রতিপক্ষ আলহাজ্ব নাজিমউদ্দীন। জীবনের অন্তিমবেলায় দলীয় মনোনয়ন জুটেছে তার। এবারে অঘোষিত ঐক্য নয়, প্রকাশ্যে গঠিত ঐক্যজোটের প্রার্থি হবার সুযোগ হয়েছে নাজিমউদ্দীনের। উপযুক্ত প্রতিপক্ষ পাওয়ার বিষয়টা শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবেই গ্রহণ করে শরাফত আলী। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র পনের দিন আগে ঢাকা থেকে গাড়ি হাকিয়ে নীলগঞ্জে এসে স¦পন হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা তছনছ করে দিয়ে যায়। না, ওদের দলীয় প্রার্থি নাজিমউদ্দিনের কাছে সে যায়নি। সোজা বাপের কাছে এসে বলেছে—তোমার এই পার্টি আমাকে পাঁচ বছর জেল খাটিয়েছে। তুমি একবারও খোঁজ নাওনি, সে জন্যে দুঃখ নেই। বুড়ো বয়সে রাজনীতিটাও দেখে শুনে করতে শিখলে না বাবা!
শুধু এই কথাটুকু বলতেই যেন তার এতদূরে ছুটে আসা। যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল তেমনই করে আবার গাড়ি হাকিয়ে চলে যায়। অথচ স¦পনের এই আকসি¥ক আসা যাওয়া নিয়ে নীলগঞ্জে নানান জল্পনা কল্পনা হয়, ডালপালা ছড়ানো কেচ্ছা রচনা হয়। সময় দ্রুত বয়ে যায় দেখে সমস্ত মানসিক শক্তি জড়ো করে গা ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে আসে শরাফত আলী, নিজে থেকেই জনতাকে ব্যাখ্যা দেয়— স¦পন এসেছিল। অনেক চেষ্টা করেও ‘ঘোড়া স¦পন’ শব্দবন্ধ উচ্চারণ করতে পারে না। কেন যে নামের আগে ঘোড়া উঠেছে পিতা হয়ে সে তদন্ত করার রুচি হয়নি তার। কিন্তু ঢাকাতে এই বিকৃত শিরোনাম হবার সুবাদে ঐ অদ্ভুত নাম প্রচারও হয়ে গেছে। সে নিজেই পত্রিকায় খবর দেখেছিল— অস্ত্রসহ সাত মামলার আসামী ঘোড়া স¦পন গ্রেফতার। শরাফত আলী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জনতাকে জানায়— আমার ছেলে স¦পন, নব্যরাজাকার। অনেক আগেই আমি তাকে ত্যাগ করেছি। এদের বিরুদ্ধেই এখন আমাদের লড়াই। আপনারা আর কী চান?
না, জনতা আর কিছুই চায় না। পুত্রের সঙ্গে নেতার সম্পর্ক নিয়ে নানান সংশয় ছিল, গালগল্প চালু ছিল, এখন তার অবসান হলো। আবার কী চাইবে! জনতাও লড়াই চায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা শরাফত আলীর নেতৃত্বে রাজাকার সর্দার নাজিমউদ্দিনের বিরুদ্ধে ভোটের লড়াইয়ে জিততে চায়। স¦স্তস্ফুর্ত সেøাগানও উঠে পড়ে— লড়াই লড়াই লড়াই চাই, এ লড়ায়ে জিততে চাই। শরাফত আলীরও মনে হয়, সত্যি এ বুঝি আরেক একাত্তর!
অনেক আশা, উদ্দীপনা আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঢাক ঢোল পেটানোর শেষে নির্দিষ্ট দিনে পাতাবাহার বেষ্টনির মধ্যে সেই লড়াই হয়ে যাবার পর মধ্যরাতের আগেই জানা গেল— এবারে আলহাজ্ব নাজিমউদ্দীনের অন্তিম বাসনা পূরণ হয়েছে। দলমতের উর্ধে উঠে বহুবছর পর নীলগঞ্জের সচেতন জনগণ স্থানীয় একজন বর্ষীয়ান সম্ভ্রান্ত মানুষকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছে। শরাফত আলীর রক্তঘাম, এমন কি তার শহীদ পিতার দেহাবশেষ এ মাটিতে মিশে থাকলেও নীলগঞ্জের মানুষ শেষ পর্যন্ত তাকে বাহিরাগত হিসেবেই চিহ্নিত করে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে প্রতিপক্ষ এই প্রচারণাাতেই জোর হাওয়া দিয়েছিল। কিন্তু নীলগঞ্জবাসী যে এই বহিরাগত তত্ত্ব খুব গ্রহণ করছে এমনও মনে হয়নি কিছুতেই। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক টিমের সদস্য হিসেবে মহিলা কলেজের বাংলার শিক্ষক অমূল্য সাহা যেদিন চৌরাস্তার মোড়ে গমগমে কণ্ঠে কবিতা পড়ে— আসমানের তারা সাক্ষী, সাক্ষী এই জমিনের ফুল…আমি কোনো অভ্যাগত নই…, সেদিন নীলগঞ্জের মানুষ নতুন করে জড়িয়ে ধরে শরাফত আলীকে। কবিতা টবিতার সঙ্গে কোনো কালেই বিশেষ সম্পর্ক ছিল না তার, তবু অমূল্য সাহার কাছ থেকে এই কবিতা সে চেয়ে নেয়। সারাদিনের প্রচারাভিযান শেষে গভীর রাতে বিছানায় গড়িয়ে পড়ার পরও ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরে সেই কবিতা- ‘কার্তিকের ধানের মঞ্জরী সাক্ষী, সাক্ষী তার চিরল পাতার টলমল শিশির… সাক্ষী জোৎ¯œার চাদরে ঢাকা নিশিন্দার ছায়া…’ মায়ের মমতার মতো স্নেহমাখা শব্দপুঞ্জ তাকে এক সময় ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই-কুৎসিত ইঙ্গিতবিদ্ধ সেøাগানে মধ্যরাতের বৃষ্টিভেজা স্নিগ্ধ হাওয়া বিষিয়ে দিয়ে বিজয় মিছিল বেরিয়ে যাবার পর কয়েকজন উৎকণ্ঠিত কর্মী জানতে চায়— আপনি কি ঢাকায় যেতে চান শরাফত ভাই?
-কেন, ঢাকা কেন? অবাক বিষ্ময়ে চোখ গোল করে তাকিয়ে থাকে শরাফত আলী, সহসা উৎকট সন্দেহ ঘূর্ণি তোলে মগজে, তবে কি এই নিকটজনেরাও তাকে বহিরাগত বলেই ধরে রেখেছে? একজন কর্মী আবার কী যেন যুক্তি দেখাতে উদ্যত হয়, সে হাত ইশারায় তাকে থামিয়ে দেয়। তারপর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে খুব নিরুদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে ইজি চেয়ারে হেলান দেয়। খুব ইচ্ছে হয়, এ সময় যদি অমূল্য সাহা পাশে বসে শোনাতো- ‘আমি ছিলাম এখানে, আমি স¦াভাবিক নিয়মে এখানেই থাকি, আর এখানে থাকার নাম সর্বত্রই থাকা, সারা দেশে।’
পরদিন বেশ খানিক বেলা হবার পর বিছানা ত্যাগ করে শরাফত আলী। গোসল নাস্তা সেরে জামা কাপড় বদলে অত্যন্ত স¦াভাবিক ভঙ্গিতে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। যেন গতকাল যা ঘটে গেল, তার কোন মালিন্যই তাকে স্পর্শ করেনি। আকাশ তখনো মেঘাচ্ছন্ন। দুজন কর্মী পরামর্শ দেয়- এ সময় বাইরে না বেরুনোই ভালো ছিল। কোনো জবাব না দিয়ে নীলগঞ্জের প্রধান রাস্তা ধরে সে হাঁটতে থাকে। মহিলা কলেজের মূল গেট হা করে খোলা দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছু উন্মত্ত তরুণ সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর নামাঙ্কিত প্রস্তরফলক উপড়ে ফেলার পর প্রতিষ্ঠাতার নামফলক উচ্ছেদে ব্যস্ত। শরাফত আলী দ্রুত চোখ বুলায়, ভয় হয়— ওদের মধ্যে স¦পনও আছে নাকি! সব চেয়ে অবাক কন্ড, ঘাড় বাঁকিয়ে একবার রাস্তার দিকে তাকানোর পর ওরা সুড়ৎ করে পালিয়ে যায়। শরাফত আলী যেনবা লজ্জা পায়, ওরা কেন পালাবে!
এ কি খাঁচা থেকে মুরগি নিয়ে পালানো খ্যাঁকশেয়াল যে গৃহস্থকে দেখে লেজ গুটিয়ে পালাতে হবে! নাহ, সে দ্রুত পায়ে নিজেকে সরিয়ে নেয়। এরই মাঝে হটাৎ একজন কর্মী দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানায়— অমূল্যবাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না শরাফত ভাই। ভোর রাতে কারা যেন তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে। আর বৌদিকে…। এরপর সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শরাফত আলী এক মিনিটে হিসেব করে নেয়, আঘাতটা কোন দিক থেকে আসছে। কর্মীদের কাঁধে হাত রেখে নির্দেশ দেয়— অনিশেষ নিতাই, গোবিন্দ, সুবোধ কাকা- সবাইকে সাবধান করে দে। আর শোন, হারুন ভাইকে ফোন করে পাচ্ছি না, খবর দে দেখি— বিকেলে যেন দেখা করে। ইয়াছিন! শফিক! তোরা থানা কমিটির সবাইকে আসতে বলিস। সবাইকে।
না, বিকেল কেন, সন্ধ্যে গড়িয়ে যাবার পরও সেদিন আর থানা কমিটির নেতৃবৃন্দের কেউই আসে না। হারুন ভাই কোথায়! তার ছোটভাই সরকারি গাছ কেটে লোপাট করা যুবনেতা মামুনও টিপ টিপানো বৃষ্টির মধ্যেই নীলগঞ্জ ছেড়েছে। যে দুচার জন কর্মী ছাতার আড়ালে মাথা লুকিয়ে কোনো রকমে এসে পৌঁছেছে, তাদের সবারই মুখ শুকিয়ে আমচুর। প্রত্যেকেই বয়ে আনে নানান দুঃসংবাদ— নবীনপুরে হিন্দুপাড়ায় আগুন, হিতিমডাঙ্গার মোল্লাদের পৈতিক সম্পত্তির ভাগবাটেয়ারা কেন্দ্রিক বিরোধ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বীভৎসতায় ফেটে পড়েছে, ছোটভাইয়ের হাতে খুন হয়েছে বড়ভাই, সর্বজন-শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সুবোধবাবুকে প্রকাশ্যে দিবালোকে একশবার কান ধরে ওঠ্ বস্ করানো হয়েছে… এ রকম অসংখ্যা অভিযোগ এসে রাতের আঁধার ভারি করে তোলে। এ সব শুনতে শুনতে শরাফত আলীর শ্রবণেন্দ্রিয় বধির হয়ে আসে প্রায়। কিন্তু তখনই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে উদ্ধত ভঙ্গিতে বেজে ওঠে টেলিফোন। একজন কর্মী রিসিভার তুলে শুকনো গলায় খানিক হ্যালো হ্যালো করে তারপর সেই রিসিভার বাড়িয়ে ধরে— লিডার, ঢাকার ফোন।
ঢাকার ফোন? শরাফত আলীর কপালে ভাঁজ পড়ে, হাত কেঁপে ওঠে, তবু উচ্চকণ্ঠে বলে- হ্যালো…। ওপার থেকে প্রতিধ্বনি হয় স¦পনের সেই পুরানো বুলি— রাজনীতিটাও তুমি করতে শিখলে না বাবা! খুব হয়েছে, তুমি ঢাকায় চলে এসো। শরাফত আলী টেলিফোন ছেড়ে দিতেই যাচ্ছে প্রায়, কিন্তু স¦পনের শেষবাক্যটি তাকে চমকে দেয়— তোমাদের দিন শেষ। এবার আমি যাবো নীলগঞ্জ। নেক্সট টার্মে আমিই ভোট করবো। তুমি চলে এসো ঢাকায়। কথা শেষ হলে টেলিফোন ছেড়ে দেয় স¦পন। এপারে শরাফত আলীর হাতে ধরাই থাকে বিমূঢ় রিসিভার।
কর্মীদের চোখে মুখে গভীর উদ্বেগ এবং অপার কৌতূহল। প্রথমে টেলিফোন রিসিভ করেছিল যে কর্মী, সে-ই জানতে চায়— কী খবর লিডার?
খবর?
হাতের রিসিভার ক্রাডেলে নামিয়ে রেখে শরাফত আলী এই  দুঃসময়েও এক চিলতে হেসে ওঠে। তারপর অত্যন্ত স¦াভাবিক ভঙ্গিতে জানায়— আগামীতে এই উর্বর মাটির দখল নিতে আসছে আমার ছেলে ঘোড়াস¦পন। ওর জন্ম, ওর বেড়ে ওঠা, ওর কর্মকান্ড সব ঢাকাতে, নীলগঞ্জের মাটি কেন ওর হতে যাবে বলো দেখি! এ মাটি তো আমার জন্মমাটি। তোরা যে কজন আছিস, কাল থেকে তাদের নিয়েই আমি আবার মাঠে নামবো।