সাম্প্রতিক

বাংলাদেশকে উচ্চ সুদে ঋণসহায়তা দিচ্ছে চীন

বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশকে ৫০০ কোটি ডলার (প্রায় সাড়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকা) উচ্চ সুদে ঋণসহায়তা দিচ্ছে চীন। গত বছরের

মাঝামাঝিতে ১১টি প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশটিকে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই প্রস্তাবে চীনের এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া

গেছে। এ প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) দ্রুত চুক্তিসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তোড়জোড় শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর

কার্যালয়ে আজ এ-সংক্রান্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ছক অনুযায়ী ইআরডি চীনের প্রস্তাবিত ঋণের গ্রান্ট এলিমেন্ট হিসাব করেছে। এ হিসাবে চীনের অর্থায়নে প্রস্তাবিত প্রকল্পের গ্রান্ট

এলিমেন্ট মাত্র ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে চলমান প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড সাত বছর, সুদের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর প্রস্তাবিত প্রকল্পে সুদের

হার ২ শতাংশ। ঋণগুলো ২০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে আরো রয়েছে দশমিক ২ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি ও ম্যানেজমেন্ট ফি দশমিক ২

শতাংশ। অন্যান্য ফি মিলে প্রায় ৫ শতাংশের উপরে সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। আবার প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পণ্য চীনের কাছ থেকে কেনার শর্ত

রয়েছে। ফলে সব বিবেচনায় চীনের ঋণ হবে অতি চড়া সুদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ব্যয়বহুল ঋণের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। এমন চড়া সুদে বায়ার্স ক্রেডিট নিলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশি।

কারণ যেসব প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, সেগুলোর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ দেয়া হবে। ফলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন যেমন

রয়েছে, একই সঙ্গে ব্যয় নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। এর পরও চীনের কাছ থেকে একের পর এক ঋণ নেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, চীনের ঋণের আওতায় যেসব প্রকল্প নেয়া হচ্ছে,

সেগুলোর খুব বেশি প্রয়োজন নেই। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প হাতে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হচ্ছে। একদিকে কঠিন শর্তের ঋণ নেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণের

বিপরীতে নিম্নমানের পণ্য দেশে আসছে। এ ধরনের ঋণ অতিপ্রয়োজনীয় হলে উৎপাদনশীল খাতে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু যেসব প্রকল্পে ঋণ নেয়া হচ্ছে, তা আগামী

দিনে দেশের অর্থনীতিতে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অবকাঠামো খাতসহ সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্প

বাস্তবায়ন ও সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি করপোরেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণে কঠিন শর্তে ঋণ নেয়া হচ্ছে। সহজ শর্তের ঋণের তুলনায় উচ্চ সুদের হার ও স্বল্প

সময়ে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় অনমনীয় ঋণ পাবলিক খাতে সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দেশে বৈদেশিক উৎস থেকে সহজ শর্তের চেয়ে

কঠিন শর্তে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

চীনের কাছে প্রস্তাবিত ১১ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে— ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রজেক্ট, এটি বাস্তবায়নে চাওয়া হয়েছে ২০০ কোটি ডলার। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন

কোম্পানির (ডিপিডিসি) বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চাওয়া হয়েছে ৯৫ কোটি ডলার। এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে

৮০ কোটি ডলার ও চট্টগ্রামে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৩ কোটি ডলার অর্থায়নে রাজি হয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। এসব প্রকল্পের উন্নয়ন

প্রকল্প প্রস্তাবনাও (ডিপিপি) প্রস্তুত। চুক্তি সম্পন্নসহ যাবতীয় কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ।

এ বিষয়ে ইআরডির এশিয়া উইং প্রধান আসিফ-উজ-জামান বলেন, ‘এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের জন্য আমরা চীনকে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। এখনো

আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। আশা করছি, চীন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে। আমাদের দিক থেকে প্রকল্পগুলোর বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’

সূত্র জানায়, এর আগে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল চীন। এজন্য বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার জন্য দেশটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়।

প্রাথমিক প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, কর্ণফুলী নদীর অন্য প্রান্তে আনোয়ারা উপজেলায় সরকার যদি একটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল তৈরি করে, তাহলে টানেল

তৈরিতে বিনিয়োগ করবে চীন।

চীনের প্রাথমিক এ প্রস্তাব পর্যালোচনার পর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। চীনের এ প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থনৈতিক অঞ্চল

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কর্ণফুলী নদীর ওপারে আনোয়ারা উপজেলায় এরই মধ্যে ১৩৫ একর সরকারি জমি রয়েছে। তাই চীনের প্রস্তাবের শর্ত অনুযায়ী বিশেষ

অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে কোনো সমস্যা হবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থায়ন করতে চূড়ান্ত প্রস্তাব দেয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয় চীনকে। নদীর

উপরে ব্রিজ তৈরি করলে নানা সমস্যা দেখা দেয়। যেমন বড় বড় জাহাজের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে টানেল তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে

চীনের পক্ষ থেকে। এ টানেল দিয়ে নির্বিঘ্নে গাড়িসহ সব ভারী যানবাহন চলাচল করতে পারবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তা বাড়াচ্ছে চীন। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ছয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করতে সম্মত হয় দেশটি। এসব প্রকল্পের

মধ্যে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র-সংক্রান্ত একটি এবং বাকি পাঁচটি গ্যাস সরবরাহ-সংক্রান্ত প্রকল্প রয়েছে। এরই মধ্যে এসব প্রকল্পের ডিপিপি

ইআরডিতে পাঠানো হয়েছে; যা যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে।