সাম্প্রতিক

উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আয়ের টার্গেট নিচ্ছে সরকার

আদায়ে ব্যর্থতার পরও আগামী অর্থবছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আয়ের টার্গেট নিচ্ছে সরকার। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের মোট রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। যা কি না চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে (২০১৮-২০১৯) মূল বাজেটে রাজস্ব প্রাপ্তি তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও আদায় ব্যর্থতার কারণে তা সংশোধন করে তিন লাখ ১৬ হাজার ৬১২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। 
অন্য দিকে, আগামী বাজেটে ভর্তুকি-প্রণোদনা দিতেই সরকারকে ব্যয় করতে প্রায় অর্ধলাখ কোটি টাকা। যা কি না চলতি অর্থবছরের এ খাতে বাজেট বরাদ্দের ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি-প্রণোদনা খাতে বাজেট রয়েছে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আজ বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকার এই বাজেট উত্থাপন করবেন। 

অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোডর্ (এনবিআর) থেকে আহরণ করা হবে তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যা কি না চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের ১৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে এনবিআর থেকে রাজস্ব আয়ের টার্গেট রয়েছে দুই লাখ ৯৯ হাজার ২০১ কোটি টাকা। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের হতাশাব্যঞ্জক পারফরমেন্স হওয়ায় গত মাসে এই টার্গেট কমিয়ে করা হয়েছে দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। তারপরও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি হবে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। 
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে(জুলাই-মার্চ) প্রান্তিক রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। 

আগামী অর্থবছরে বিশাল বাজেটে ঘাটতি থাকবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। জিডিপির অংশ হিসেবে যা ৫ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই ঋণ নেয়া হবে ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ঋণের সুদের জন্য আগামী অর্থবছরে ব্যয় করা হবে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের জন্য গুনতে হবে ৫২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। আর বিদেশী ঋণের সুদ ব্যয় হবে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। 

উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার রয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা করা হয়েছে। 

আগামী বাজেটে ভর্তুকি-প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ থাকবে ৪৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা করে ভর্তুকি দেয়া হবে। কৃষি খাতে ভর্তুকি থাকবে ৯ হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্যে ভর্তুকি থাকবে ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংক খাত নিয়ে বাজেটে কিছু থাকছে না। 
বাজেটে রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হবে। অর্থাৎ কেউ বিদেশ থেকে ১০০ টাকা পাঠালে সরকার তাকে দুই টাকা প্রণোদনা দিবে। এবারকার বাজেটে উৎপাদনমুখী শিল্পে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হবে। এ জন্য মাত্র ১০ শতাংশ কর দিলেই চলবে। একই সাথে সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে। তৈরী পোশাক খাতে ১ ভাগ প্রণোদনা বাড়ানো হবে। তবে বাড়ানো হবে ব্যক্তি খাতে আয়করমুক্ত সীমা। কিছু ক্ষেত্রে করপোরেট কর কমানোর ঘোষণা আসতে পারে বাজেটে। বাড়ানো হবে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকা। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হতে পারে। কমতে পারে আবাসন খাতে নিবন্ধন ফিও। 

‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামের এবারের বাজেট হবে ‘স্মার্ট’ বাজেট। প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে এই বাজেট। এবারের বাজেটের আকার বাড়লেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা হবে সংক্ষিপ্ত। মাত্র ৫০ পাতা। এই ৫০ পাতায় অর্থমন্ত্রী সংসদে পাঠ করবেন। তবে এ বক্তৃতার একটি বর্ধিত সংস্করণ বাজেট বই আকারে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে, যা সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য হবে সহজপাঠ্য। 

বলা হয়েছে, রাজস্ব আদায়ে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে এনবিআরের জন্য নতুন করে দিকনির্দেশনা থাকবে। ভ্যাট আইন কার্যকর করার বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকবে এবারের বাজেটে। আইন কার্যকর করতে ভ্যাটের একাধিক স্তর থাকবে। কাস্টমস আইন ও আয়কর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে সহজবোধ্য ও ব্যবসায়বান্ধব করা হবে। সব আমদানি-রফতানি পণ্য শতভাগ স্ক্যানিং করা হবে।

বাজেটে শিক্ষা খাতের সংস্কার, আর্থিক খাতের সংস্কার, শেয়ারবাজারে সুশাসন ও প্রণোদনা প্রদান বিষয়ে সংস্কারমূলক দিকনির্দেশনা থাকবে। এবার আকর্ষণীয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হবে। বাজেট বক্তৃতার বর্ধিত সংস্করণ, মূল বাজেট বক্তৃতাসহ অন্য সব ডকুমেন্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশসহ জাতীয় সংসদ থেকে সরবরাহ করা হবে।