সাম্প্রতিক

হাজার বছরের আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের আজ জন্মদিন

রহমান মুকুলঃ এসএম সুলতান; আমাদের লাল মিয়ার আজ জন্মদিন। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী চিত্রশিল্পী তিনি। ইউরোপীয় অনেক শিল্পবোদ্ধা তাকে ভ্যান গগ, মাতিস কিংবা ভিঞ্চির চেয়েও বড় শিল্পীর মর্যাদা দেন। প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন হতদরিদ্র এ অসাধারণ ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন এক ভিন্নমাত্রিক উচ্চতায়। কোন প্রতিষ্ঠিত শিল্পধারা অনুসরণ না করেই তিনি নিজেকে নির্মাণ করেছিলেন এমন ঈর্ষনীয় উচ্চতায় এবং নিজেই সৃষ্টি করেছেন এক স্বাতন্ত্র্য শিল্পধারা।
তিনি জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছে। তাঁর ছবিগুলোতে উঠে এসেছে গ্রাম এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর কাছে অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি; তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো ‘আধুনিকতা’, অর্থাৎ তিনি ইউরো-কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্মবিশ্বকে।

তাঁর ছবিতে গ্রামীণ রমণীদের দেখা যায় সুডৌল ও সুঠাম গড়নে। নারীর মধ্যে উপস্থিত চিরাচরিত রূপলাবণ্যের সাথে তিনি শক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। একই সাথে তাঁর এ ছবিগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণী-দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু ক্রুর বাস্তবতা উঠে এসেছে। তাঁর এরকম দুটি বিখ্যাত ছবি হচ্ছে: হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এবং চরদখল(১৯৮৮)।

তিনি ছিলেন একজন সুর সাধক এবং বাঁশিও বাজাতেন।
অত্যন্ত ছন্নছাড়া ও বোহেমিয়ান স্বভাবের এস এম সুলতানের অধিকাংশ সৃষ্টিকর্ম হারিয়ে ও নষ্ট হয়ে গেছে।
সুলতানের বাল্যবয়সের চরিত্র-গঠন সম্পর্কে আহমদ ছফা লিখেছেন: কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বভাবিক আকুতি। …শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের বরে অভিশপ্তও।

একটা কাহিনি উল্লেখ করে শেষ করব। সে সময় এরশাদ প্রেসিডেন্ট। তিনি আমেরিকা সফরে গেছেন। সেখানে এক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থিরা তাকে ভৎসনা করেছিলেন তিনি এস এম সুলতানকে জানেন না বলে।
দেশে ফিরে তিনি এস এম সুলতানের খোঁজ শুরু করলেন। জানতে পারলেন যশোরের এক অখ্যাত গাঁয়ে পড়ে আছেন তিনি। ঢাকায় গিয়ে দেখা করতে বার বার সংবাদ পাঠালেও ভ্রুক্ষেপ করলেন না। অগত্যা সেনাবাহিনী ব্যবহার করে তাকে ঢাকায় নেওয়া হল। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে প্রেসিডেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। প্রেসিডেন্ট তাকে কেন গ্রামে পড়ে আছেন তা জিজ্ঞেস করলেন এবং প্রেসিডেন্ট তার জন্য ঢাকা শহরে কী কী করলে খুশি হবেন জিজ্ঞেস করলেন।
” মিঃ প্রেসিডেন্ট আমি এখন বটবৃক্ষ ” তিনি বিললেন। তিনি আরও বলেছিলেন যে, বটবৃক্ষকে গ্রামের নদীতীর থেকে তুলে এনে শহরে লাগালে তা বাঁচবে না। আমার জন্য কিছুই করতে হবে না। পারলে বাচ্চাদের জন্য কিছু করুন।
তিনি শিশুদের ও পশুপাখি খুব ভালবাসতেন। তার স্মারক হয়ে আছে শিশুস্বর্গসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
আজ জন্মবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের অনিঃশেষ গর্ব লাল মিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না