সাম্প্রতিক

সেলটন জোয়ার্দ্দারের কড়চাঃ গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বৈধ সংস্হা প্রেস কাউন্সিল

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার জন্য? কেনো করা হলো এই আইন? এই আইনের সুবিধা পাবে কে? এই প্রশ্নগুলোর একটাই উত্তর। সরকারের নিরাপত্তার স্বার্থে এই কালাকানুন তৈরি করা হয়েছে। মোর্দ্দাকথা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আওয়ামীলীগ সরকারের রক্ষা কবজ। সরকার, সরকারের মন্ত্রী পরিষদের কোনো সদস্য, সরকারি আমলা ও অন্যান্যরা অপরাধ আর দূর্ণীতি করলে চোখে আঙ্গল দিয়ে তা দেখিয়ে দেন গণমাধ্যম কর্মিরা। সরকারদলীয় অনিয়ম আর আকাশ ছোয়া যে দূর্ণীতির খবর যেন জনগণের সামনে প্রকাশিত হতে না পারে তার জন্যই করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হলে গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ। পুলিশের খেয়াল খুশির উপর নির্ভর করবে সাংবাদিকতা। পুলিশের দায়িত্বে থাকবে সাংবাদিকতা। সংবাদকর্মি, মিডিয়াকর্মি বা সাংবাদিকদের জন্য এর থেকে লজ্জার আর কি হতে পারে? এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের চরম অপমান করা হলো। সাংবাদিকের ব্যবহার করা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মোবাইল ইত্যাদি জদ্ব করে নিয়ে যেতে পারবে পুলিশ। ইতিপূর্বে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধ অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাত শতাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অবস্হা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে, সরকার দেশকে ক্রমশ পুলিশী রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলছে। পুলিশ সর্বেসেবা হয়ে পড়ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় একজন পুলিশ অফিসারকে এমন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যে, আদালতের নির্দেশ ছাড়া যে কোনো স্হানে যে কোনো ব্যক্তিকে এবং যে কোনো সময় তল্লাশি ও গ্রেফতার করতে পারবে। তদন্তের নামে তার কাছে বা অফিসে/ বাসায় থাকা কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই পুলিশী হেফাজতে নিতে পারবে। সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার যে নিশ্চয়তা দিয়েছে তা এক্ষেত্রে একেবারেই গুরুত্বহীন। পুলিশকে দোষ দিয়ে লাভ কি? পুলিশকে তো মানতেই হবে। কারণ, এটাই আইন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কালাকানুন বাতিলের দাবীতে দেশের সকল সাংবাদিক সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সেটা আদৌও সম্ভব হবে বলে আমার মনে যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে। সাংবাদিকদের ঐক্যশক্তি ভেতর থেকে ভেংগে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারায় পরোয়ানা ব্যাতিরেকে তল্লাশি, গ্রেফতার ও জদ্ব করার কথা সুস্পষ্ট বলা হয়েছে। ১, যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তার এরুপ বিশ্বাস করার থাকে যে কোনো স্হানে এ আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নস্ট হওয়া, মুছে ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দূস্প্রাপ্য হওয়ার বা করার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে তিনি অনুরুপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করে নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করতে পারবেন: ক,উক্ত স্হানে প্রবেশ করে তল্লাশি এবং প্রবেশে বাঁধাপ্রাপ্ত হলে ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
খ,উক্ত স্হানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য- উপাত্ত বা অন্যান্য সরন্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জদ্বকরণ;
গ,উক্ত স্হানে উপস্হিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি;
ঘ, উক্ত স্হানে উপস্হিত কোনো ব্যক্তি এ আইনের অধীন কোনো অপরাধ করেছেন বা করছেন বলে সন্দেহ হলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।
বাংলাদেশের সম্পাদক পরিষদ এই কালাকানুনের কাছে বড় অসহায়। বাংলাদেশজুড়ে বিভিন্ন মিডিয়াতে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের মধ্যে এখন সরকার সমর্থকের সংখ্যায় বেশি বলে আমার মনে হয়। দেশে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব না থাকায় সাংবাদিকরা নিজেদের নিরাপদ রাখতে অনেকটা ক্ষমতাসীন সরকারের সমর্থকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পড়েছে। সত্য প্রকাশে নিরপেক্ষতা বজায় না রেখে অনেকেই সরকারি দলের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য দালাল হয়ে পড়েছেন। ফলে সরকারও সুযোগ ও সময় বুঝে এই মহাকালাকানুন করেছে। খুব সহসায় সাংবাদিক সমাজ এই কালাকানুনের বিপক্ষে দাঁড়াবে না সরকার এমনটা ভেবেই এই কালাকানুনের মাধ্যমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পথে পা দিয়েছে। গণমাধ্যমের কর্মিরা এখনো নিশ্চুপ রয়েছেন। গণমাধ্যম বা সাংবাদিক সমাজ রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এখন সেই তাদের কিনা নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ? এটাও বিশ্বাস করতে হবে? আইন অনুযায়ী বিশ্বাস করতেই হচ্ছে। সাংবাদিক যদি সত্য সংবাদ প্রকাশে আপোষহীন ভূমিকা পালন না করতে পারে তাহলে জনগণের অধিকার রক্ষার কথা কারা বলবে? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব কার? সরকারের না বিরোধী দলের? না, কারো নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব সাংবাদিক সমাজের। কাজেই গণমাধ্যম আর কলমের স্বাধীনতা রক্ষা ও নিশ্চিত করতে সাংবাদিক সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীন গণমাধ্যম, মুক্ত সাংবাদিকতা থাকবে কি থাকবে না সেই সিদ্ধান্ত অবশ্যই সাংবাদিকদেরকেই নিতে হবে। নিউজ মিডিয়া বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হলো সকল স্বাধীনতার মা বা জননী। তাই এই জননীর স্বাধীনতাকে যে কোনো মূল্যেই রক্ষা করতে হবে দেশের সাংবাদিকদের। পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করুক গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের এটা কোনো মতেই সহ্য করা যায় না, যাবে না। বাংলাদেশ পুলিশী রাষ্ট্র নয়, এটা সাংবাদিকদেরকে বুঝতে হবে। নিজেদের দায়িত্ব ও মর্যাদার কথা ভুলে গেলে চলবে না। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের একমাত্র বৈধ সংস্হা হলো প্রেস কাউন্সিল। পুলিশী নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আইনের আওতায় গঠিত একমাত্র প্রেস কাউন্সিলই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সংস্হা। মানুষের বলিষ্ঠ ও স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে সকল গণমাধ্যম ও কলম সৈনিকদের অবশ্যই টিকে থাকতে হবে। ###
লেখক পরিচিতি : সেলটন জোয়ার্দ্দার, কলামিস্ট ও সংবিধান গবেষক।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না