সাম্প্রতিক

সালমান শাহঃ গণ মানুষের নায়ক

শাহীন আহমেদ টিটোঃ

ঐ সময়টা ছিল তরুণদের। মানে তখন যারা কৈশর থেকে যৌবনে পা রাখছিল বা রেখেছিল এবং তারপর কাটিয়ে ছিল বেশ কিছু বছর যুবক কিংবা যুবতী হিসাবে, ঐ সময়টা ছিল তাদের। সময়গুলো সব সময় তরুদেরই হয়, সব যুগেই। ওটা ছিল তাদের বেড়ে ওঠার সময়, গড়ে ওঠার সময়। কেমন ছিল সেই সময়টা? খুব স্থির ছিল, খুব অস্থির ছিল, কেউ কেউ নিজেকে গড়ে তুলছিল, কেউ কেউ ভাঙছিল, গ্রহন করছিল অনেক কিছু, বর্জন এবং বাতিল করছিল অনেক কিছু, যেমন করে থাকে প্রজন্মের অগ্রজরা তাঁদের সময়ে, যেমন করবে অনুজরা তাঁদের সময়ে। সময়টা ছিল গত শতাব্দীর নব্বই দশকের প্রথম ভাগ থেকে শুরু করে পরের কয়েকটা বছর।

অবাধ নির্বাচনের পর গণতন্ত্র তখন হামাগুড়ি দিচ্ছিল। সাপটা চুক্তি আর ডিশ এন্টেনার বদৌলতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল ভারত এবং তাঁর সংস্কৃতি। বিপণী বিতানগুলো ভরে উঠছিল ভারতীয় পণ্যে, ব্লেড থেকে শুরু করে মুরগীর ডিম, ডন তাস সব কিছুই। বসার বা শোবার ঘরে রাখা বোকা বাক্সে জি টিভি সহ নানা পদের ভারতীয় চ্যানেল, খাবার টেবিলগুলো ভরে উঠছিল খানা খাজানা কেতায় রান্না করা খাবার দাবারে। খোলা বাজারের হাওয়ায় তখন সবাই বিশ্ব নাগরিক। আপামর জনসাধারণের ডুব দিয়েছিল (এখনও ডুব দিয়ে আছে) ভারতীয় তিন খান, অক্ষয় কুমার, সুনীল শেঠি ইত্যাদির পুরুষালী ভঙ্গিমায়; আর মাধুরী, কারিশমা, কাজল, রাভিনা ট্যান্ডন, টাবু এবং আরো অনেকের নিপুন দেহের বাঁকে, আর দিব্যা ভারতীর অকাল মৃত্যুর করুণ রসে। সারা দেশকে নতুন করে থরথর কাপিয়ে দিয়েছিল বোম্বাই ছবির সাইমুম। হরিয়ান গরুর মাংস চিবাতে চিবাতে অনেককেই দাঁত মুখ খিচিয়ে বলতে শোনা যেত- শালার ইন্ডিয়া দেশটা শেষ করে দিল!

তখনকার তরুদের অনেকেই ওগুলো মানতে পারত না। তদের দরকার ছিল দেশীয় কিছুর, যা হবে একান্তই তাদের নিজের। তাদের ছিল সালমান শাহ সহ অনেক দেশীয় অভিনেতা। কিন্তু সালমান শাহ ছিল বেশি প্রিয়, তাঁর মধ্যেই তারা সব কিছু খুঁজে পেতো, এমন কি তাদের মুখের আদলও। প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’এ সালমান দেখিয়েছিলেন তার অভিনয় দক্ষতা, বম্বের আমির খানের ছায়া থেকে বের করতে পেরেছিলেন নিজেকে। এরপর প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য নিজের সাথেই প্রতিযোগিতা করতেন। তাই প্রতিটি সিনেমায় তাঁকে পেতাম নতুন ভাবে। নিজেকে নতুন নতুন ভাবে উপস্থাপন করার অসামান্য প্রতিভা ছিল তাঁর। বৈচিত্রতার দিক থেকে তাঁকে নায়ক রাজ রাজ্জাক কিংবা বলিউডের আমির খানের সাথে তুলনা করা যায়। আমির খান নিজের কেতা ভাঙা শুরু করেছিলেন ২০০০ সালের পরে। কিন্তু আমাদের সালমান শাহ সেটা শুরু করেছিলেন গত শতাব্দীর নব্বই দশকের প্রথম ভাগেই, যেই গুনটা উপমহাদেশের অভিনেতাদের মধ্যে কমই পাওয়া যায়।

অনেক বাংলাদেশী নায়কদেরকে তখন বলতে শুনতাম, তাঁরা হলিউডের অমুক নায়ককে অনুসরণ করেন। একজন নায়কের কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে, যিনি সদ্য ভিলেন হয়েছেন এবং বিরক্তিকর ভাবে বাম হাতটা সবসময় আগে চালান, তিনি একবার বলেছিলেন তিনি নাকি হলিউডের এক বিখ্যাত নায়ককে অনুসরণ করে চুল কাটান। শুনে আমরা কয়েকজন বন্ধু একসাথে হেসে উঠেছিলাম। আমাদের সালমান অনুসরণ করতেন নায়ক রাজ রাজ্জককে। হলিউড বলিউডের দিকে তাকান নি, তাকিয়ে ছিলেন শেকড়ের দিকে, সেখান থেকে নিয়েছিলেন নির্যাস, দ্রুতই হয়ে উঠেছিলেন গণ মানুষের নায়ক, পরিণত হয়েছিলেন একজন বাঙালি আইকনে। হলিউড বলিউডের অনুসারীরা যেখানে রুচিহীন জামা প্যান্ট জুতা বেল্ট পরে ক্যামেরার সামনে দাড়াতেন, সালমান শাহ সেখানে পরতেন রুচিশীল কেতার পোশাক, যা তখন তরুণদের মাঝে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।

তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা বুঝতে হলে তাঁর মৃত্যুর পরের কিছু ঘটনা মনে করলেই বোঝা যাবে। তাঁর মৃত্যু সংবাদ দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষের মাঝে তীব্র শক হিসাবে প্রবাহিত হয়েছিল, লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল বিএফডিসির গেইটে, অনেক তরুণী তাঁর মৃত্যুকে মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল, হাজার হাজার তরুন সালমান শাহ সেজে বিএফডিসির সামনে গিয়ে লাইন দিইয়েছিল তাঁর অসম্পূর্ণ ছবিতে অভিনয় করার জন্য। শোকে আছন্ন কোটি মানুষ বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তিনি আর নেই। আসলে কেউই তাঁর অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছিল না।

আমাদের কবি নজরুল যদি তাঁর জীবনের মধ্যগগণে এসে অসুস্থ না হতেন, কিংবা শেলি-কিটস-সুকান্ত যদি অকালে মারা না যেতেন, তাহলে পৃথিবী তাঁদের কাছ থেকে আরো কি কি পেত তা আমরা এখন আর পরিমাপ করতে পারবো না, ঠিক তেমন সালমান শাহ অকালে চলে না গেলে তিনি বাংলা সিনেমাকে আরো কি দিতে পারতেন তাও আমরা পরিমাপ করতে পারবো না। তবে এটুকু বলতে পারি তিনি থাকলে বাংলাদেশের সিনেমার মান এতটা ধ্বসে যেত না।

তাঁর মৃত্যু এখনও রহস্য ঘেরা। আমরা জানি না সত্যটা কোনদিন বের হয়ে আসবে কি না। তবে হত্যা হোক বা আত্মহত্যা, এর বিচার হওয়াটা জরুরী। আজ বাংলাদেশের এই গণ মানুষের নায়কের প্রয়াণ দিবস। তাঁর প্রতি জানায় অতল শ্রদ্ধা।

– শাহীন আহমেদ টিটো

সহ-সম্পাদক,samprotikee.com

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না

error: Content is protected !!