সাম্প্রতিক

রাষ্ট্রীয়ভাবে রাধা বিনোদ পালের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালনের দাবি ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছে

 রাষ্ট্রীয়ভাবে রাধা বিনোদ পালের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালনের দাবি ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছে


রাষ্ট্রীয়ভাবে রাধা বিনোদ পালের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালনের দাবি ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছে

রহমান মুকুলঃ ডঃ রাধা বিনোদ পাল রূপকথার রাজকুমার, মহানায়ক। এ ডালিম কুমারের জীবন সংগ্রাম  বাস্তবতাকে তো বটেই, খোদ রূপকথাকেও হার মানায়। বিস্ময়াভিভূত করে। মাত্র হাতে গোনা  যে কয়েকজন সাহসি পুরুষ ও নীতিক মানুষজাতির ইতিহাসকে মহিমান্বিত করেছেন, নিঃসন্দেহে তিনি তাদের অন্যতম। তিনিই তো হাজার বছরের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী।  বাঙ্গালী জাতির চূড়ান্ত অহম। আজ ১০ জানুয়ারি ছিল তার ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। অথচ তার বসতভিটা ছাড়া এ দিনে বাংলাদেশে কোথাও মহান এ বাঙ্গালীর জন্ম-মৃত্যুদিন পালন করা হয় না। জাস্টিজ্ ডঃ রাধা বিনোদ পালের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবি সচেতন মহলে ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছে। সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এ বাঙ্গালীর যথার্থ মর্যাদা প্রদান করা হলে আন্তর্জাতিকভাবে বাঙ্গালীরা আরও মর্যাদাবান হবে। বিশ্বে বাংলাদেশী বাঙ্গালীরা আত্মমর্যাদা ও গৌরবদীপ্ত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। এমনকি জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে।

 

জন্মঃ   ১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি  কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার খাস-মথুরাপুর ইউনিয়নের  তারাগুনিয়ার শালিমপুর মাতুতালয়ে।বাবার নাম বিপিন বিহারী পাল। মায়ের নাম মগ্নময়ী দেবী। ঠাকুর দার নাম ফ্যালান চন্দ্র পাল। (গৌতম কুমার রায়ের – ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল )।

 

পৈত্রিক নিবাসঃ বাবার বাড়ি মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের অখ্যাত গ্রাম কাকিলাদহের বর্তমানে জর্জ পাড়ায়। বিপিন বিহারী পালের ছেলে ড. রাধা বিনোদ পাল। বাবা ছিলেন দরিদ্র। রাধা বিনোদ পালের বয়স যখন মাত্র ৩ বছর তখন তিনি মারা যান। মতান্তরে তিনি সন্যাসব্রত গ্রহণ করে সংসারত্যাগি হন। (গৌতম কুমার রায়ের – ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল )।

 

যেভাবে বেড়ে উঠেনঃ  অকাল বিধবা মা মাত্র ৩ বছরের শিশুকে নিয়ে স্বামীর দাদা বৈদ্যনাথ ও কালীনাথ পালের আশ্রয়ে উঠেন। কিন্তু বেশি দিন তিষ্ঠোতে পারেন নি। সাড়ে ৪ বছরের শিশু সন্তান রাধা বিনোদ পালকে নিয়ে মা স্বামীর ভিটে ছেড়ে চলে যান চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী গ্রামে। কুমারী গ্রামের দুর্সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে থেকে ঝি’র কাজ করতেন মা। আর শিশুপুত্রের কাজ জোটে ওই  গেরস্থের বাড়িতে মাহেন্দার রাখালের।

 

ছেলেবেলার কিংবদন্তীর রাজকুমারঃ  শিশু রাধা বিনোদ পাল এখানে হয়ে উঠেন কিংবদন্তীর রাজ কুমার। তাকে বেশ কিছু কিংবদন্তী মিথের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানকার জনপদে।

একটা গল্প এরকমঃ – রাধা বিনোদ পালের গেরস্থের বাড়িতে চুল কাটতে এসেছেন এক নাপিত। বছর কন্ট্রাক্টে। পরিবারের সকলের চুল কাটা শেষ হলে রাধা বিনোদ পালকে তাঁর মা নাপিতের নিকট নিয়ে গিয়ে চুল কেটে দিতে অনুরোধ করলেন। নাপিত চুল কেটে দেওয়ার পর যথারীতি পারিশ্রমিক বাবদ পয়সা চাইলেন। কিন্তু সহায় সম্বলহীন মা পয়সা দিবেন কীভাবে। তিনি পয়সা দিতে অপারগতা স্বীকার করলেন। এতে রাগে-ক্ষোভে নাপিত ব্যাটা এক অবাক কান্ড করে বসলেন! তিনি রাধা বিনোদ পালকে আবার ধরে এনে মাথা মুড়িয়ে দিলেন।

প্রচলিত আরেকটি কিংবদন্তী – শিশু রাধা বিনোদ পাল গরু চরানোর সময় প্রায় কুমারী এম ই স্কুলের ( বর্তমানে কুমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে) আশপাশে ঘুরাফেরা করতেন। শিক্ষক ক্লাসে গেলে তিনি স্কুল ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে পাঠদান দেখতেন। এটা ছিল তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এক দিন শহর থেকে এক অফিসার বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলেন। তিনি ক্লাসে ঢুকে শিক্ষার্থিদের কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। সকলেই চুপ। কারো মুখে রা নেই। এরই এক পর্যায়ে ক্লাসের বাইরে জানালার ওপাশ থেকে স্পর্ধিত এক রাখালের কন্ঠস্বর শোনা গেল। “ আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর জানি।”  অফিসার রাধা বিনোদ পালকে ডেকে ভেতরে নিলেন। একে একে সকল প্রশ্নের জবাব দিলেন রাধা বিনোদ পাল। অফিসার জিজ্ঞেস করলেন – “তুমি কোন ক্লাসে পড়?” “ আমি পড়ি নে, গরু চরাই।“ –রাধা বিনোদ পালের মুখে এমন কথা শুনে অফিসার তো হতবাক। তিনি প্রধান শিক্ষককে ডেকে রাধা বিনোদ পালকে স্কুলে ভর্তি করে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন বলে কথিত রয়েছে।

আরেকটি কিংবদন্তী এরকম – রাধা বিনোদ পাল তখন হাইকোর্টের বিচারপতি। সারা দেশে তার নামডাক। এ বিখ্যাত ছাত্রের নামডাক শুনে মাতোয়ারা পাঠশালার বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহজ-সরল গুরু। তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্রকে দেখার জন্য বড়ই উতলা হয়ে উঠলেন। বৃদ্ধ বয়সে শরীরে কুলাবে না তাও সিদ্ধান্ত নিলেন যেভাবেই হোক কলকাতায় যাবেন। সতি সতিই একদিন তিনি কলকাতা গেলেন। খুঁজে খুঁজে হাইকোর্টে গেলেন। দেখেন সতিই তো তার রাধা বিনোদ উঁচু মঞ্চে সাহেবি পোষাক পরে গুরু গম্ভীরভাবে উকিলদের যুক্তিতর্ক শুনছেন। ভেতরে চাকর-বাকর মাথার উপর পাখা টানছেন। দরজায় আর্দালি –পুলিশ-দেহরক্ষী দাঁড়িয়ে। তিনি রাধা বিনোদ পালের কাছে যেতে চাইলেন। কিন্তু রক্ষীরা রাজি হল না। কিন্তু গুরুজী একটু অধীর হয়ে উঠলেন – তিনি আপত্তি সত্ত্বেও ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। এমন বিশ্রী পোষাকে গেয়ো এক বৃদ্ধকে যেতে দিতে চাচ্ছিলেন না। বেশ জোরাজুরি করাতে বৃদ্ধকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া হল। বিষয়টি দৃষ্টি এড়াল না রাধা বিনোদ পালের। তিনি কী ঘটনা জিজ্ঞেস করলেন। সব শুনে নিজেই বিচারকের চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। বৃদ্ধকে হাত ধরে টেনে তোলেন। একি! এ যে তাঁর গুরুজ্বী! তিনি গাট হয়ে বসে গুরুজ্বীর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। সকলে অবাক বিস্ময়ে তা দেখছিল। পরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে সকলের সাথে গুরুজ্বীর পরিচয় করিয়ে দলেন। বিচারকাজ বন্ধ করে গুরুজ্বীকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। কয়েক দিন নিজ বাড়িতে রেখে আপ্যায়ন করে পরে নিজে গ্রামে রেখে এসেছিলেন। এমনই গুরু ভক্তি ছিল এ মহান বিচারকের।

কুমারী গ্রামে কিছুকাল কাটিয়ে এবার রাধা বিনোদ পাল কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মোড়ভাঙ্গা গ্রামে তাঁর অবস্থাসম্পন্ন  আত্মীয় মেসোমশায় কৃষ্ণবন্ধু পালের আশ্রয়ে উঠেন। এখানেও প্রথম দিকে তাঁকে রাখালের কাজ করতে হত। সারাদিন গরু, ছাগল-ভেড়া চরিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন শিশু রাধা বিনোদ পাল। রাতে মুনিবের সন্তানদের পাশে বসে তাদের লেখাপড়া করা দেখতেন। তাদের লেখাপড়া দেখে অসম্ভব মেধাবি রাধা বিনোদ পাল নিজে নিজেই ভালভাবে লেখা শিখে গেলেন। তিনি মুনিবের ঘরের মাটির দেয়ালে চুরি করে কয়লা দিয়ে লিখতেন। ছবি আঁকতেন। জেনে গেলেন একদিন মুনিব মেসো কৃষ্ণবন্ধু পাল। তিনি নিজের সন্তানদের সাথে সাথে রাধা বিনোদ পালকেও  লেখাপড়ার সুযোগ করে দিলেন। পার্শ্ববর্তি বৈদ্যনাথপুরের গোলাম রহমানের টোলে পাঠাতেন। কিন্তু নতুন এক দায়িত্ব কাধে চাপল রাধা বিনোদ পালের। হাটবোয়ালিয়া বাজারে মামার একটা মিষ্টির দোকান ছিল। সেই দোকানে মিষ্টি বিক্রি ও হিসেব নিকেশের কাজ করতে হত। বেশ রাতে মাথাভাঙ্গা নদী পার হয়ে মেসোবাড়ি ফিরতে হত ১১ বছরের শিশুকে। এত পরিশ্রমের পর রাধা বিনোদ পালের পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক মোটেও কমল না। বরং পড়ালেখার প্রতি রাধা বিনোদ পালের একাগ্রতা দেখে কৃষ্ণবন্ধু মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি মাঝে-মধ্যে কুমারীর জমিদার শৈলেন সাহার বাড়িতে যেতেন। একদিন তিনি রাধা বিনোদ পালের পড়ালেখার প্রতি গভীর অনুরাগ আর একাগ্রতার গল্প বলেন। সব শুনে জমিদার শৈলেন সাহা রাধা বিনোদ পালকে নিজ আশ্রয়ে নিয়ে যান। নিজের বাড়িতে অবস্থানের সুযোগ দিয়ে কুমারী গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন। এ পাঠশালার নাম পরবর্তিকালে কুমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিবর্তিত হয়। তৎকালে সম্ভবত নাম ছিল কুমারী এম,ই স্কুল। এই বিদ্যালয় থেকে মাইনর পরীক্ষায় সমগ্র প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে ১ম স্থান অধিকার করেন এই হতদরিদ্র রাধা বিনোদ পাল।

 

শিক্ষাজীবনঃ  জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি এগিয়ে যায় তাঁর শিক্ষা জীবন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের শুরু কুমারী গ্রামের পাঠশালায়। সেখানে সহপাঠিদের চে’ অনেক মেধার পরিচয় রাখেন তিনি। এলাকায় কথিত আছে – ওই পাঠশালায় তিনি ৩ বছর পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি পার্শ্ববর্তি  বাঁশবাড়িয়া গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। তাঁর অমিত প্রতিভার স্বাক্ষর দেখতে পেয়ে এ সময় অনেকেই সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন কুষ্টিয়ার কমলাপুরের জমিদার রামচন্দ্র রায় চৌধুরী। জমিদারের প্রত্যক্ষ প্রযত্নে এরপর ভর্তি হন  কুষ্টিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে (কুষ্টিয়া এইচ ই স্কুল)। কথিত আছে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অম্বিকাচরণ মুখোপাধ্যায় রাধা বিনোদ পালের মেধায় অভিভূত হয়ে পরবর্তি এক ক্লাস উপরে ভর্তি করে নেন। তিনি প্রথমে জমিদার রামচন্দ্র চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান করলেও পরবর্তিতে কুষ্টিয়ায় এক বোর্ডিং-এ অবস্থান করে পড়তেন। সে সময় তিনি পার্ট টাইম বার্বুর্চিগিরি করে বোর্ডিং-এ থাকার খরচ যোগাড় করতেন। এ বিদ্যালয় থেকে ১৯০৩ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। সাথে পান মাসিক ৮ টাকার বৃত্তি। ( অনেক জীবনীকার উল্লেখ করেছেন যে, কুষ্টিয়া এইচ ই স্কুলে অধ্যায়নরত থাকলেই তিনি রাজশাহীর ডুবলহাতি রাজা হারানাথ হাই স্কুল থেকে এন্টারন্স পাশ করেন ১৯০৩ সালে) এ পরীক্ষায় তাঁর অসামান্য ফলাফল পুরো নদীয়া জেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঈর্ষনীয় সাফল্যের সাথে নিয়ে তিনি রাজশাহী ওল্ড কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৫ সালে এ কলেজ থেকে ডিস্টিকশনসহ এফএ পাশ করেন।  সে সময় তিনি বৃত্তির সমস্ত টাকা পাঠাতেন অভাগী মাকে। নিজে থাকতে রাজশাহীর সহকারি জেলার দীনবন্ধু পালের বাড়িতে। দীনবন্ধু পাল অন্যত্র বদলী হলে রাধা বিনোদ পাল কলেজের হেমন্ত কুমারী বোর্ডিং-এ আশ্রয় নেন। সেখানে তাকে মাসে ৬টাকা খরচ দিতে হত। অবশ্য ওই ৬ টাকা দিতেন কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক রাখালদাস ঘোষ। ফাইনাল পরীক্ষার সমস্ত ফি রাধা বিনোদ পালের পক্ষে তার বন্ধু তেজেন্দ্র সিংহ সরকার জমা দেন বলে জানা যায়। এফএ পাশের পর গেলেন রাজশাহী ছেড়ে পাড়ি জমান কললাতা। কলকাতার বেলেঘাটার ইন্সপেক্টর অব লাইটনিং কন্ডাক্টর পূর্ণচন্দ্র পালের বাড়ি গিয়ে উঠলেন তিনি।

 

১৯০৮ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়াল কলেজ থেকে  গণিতে প্রথম শ্রেণীতে (সন্মান) উত্তীর্ণ হন। এরপর  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ম শ্রেণিতে এমএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় হতেএলএলবি ও ১৯২০ সালে আইন বিষয়ে  ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯২৫ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএল ডিগ্রী লাভ করেন এবং ১৯২৫ সালে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল “হিন্দু ফিলোসফি অব ল’ ইন দ্য বেদিক এন্ড পোস্ট বেদিক টাইমস প্রাইওর তু দ্য ইন্সটিটিউট অব মন্যু।“ বৃত্তির সন্মানির অর্থে তিনি শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগ ব্যয়ভার নির্বাহ করতেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনঃ দরিদ্র পরিবারের অনাথ সন্তান হিসেবে শিশু বয়স থেকেই শুরু তাঁর কর্মজীবনের। মাহেন্দার রাখাল হিসেবে গেরস্থের বাড়ি কাজ করেই তাঁকে সংসার দেখতে হত শিশুকালেই। তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চাকুরি শুরু করেন পড়ালেখার পাশাপাশি। তিনি এমএ পরীক্ষা দিয়েই ভারতের এলাহাবাদে ছোটেন জীবিকার প্রয়োজনে। সেখানে এলাহাবাদ অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল অফিসে ক্লার্ক হিসেবে ২ বছর চাকুরি করেন। একদিকে, চাকুরী করতেন, অন্যদিকে, এলএলবি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতেন। এখানে ২ বছর চাকুরির পর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ১৯১১-১৯২০ সাল পর্যন্ত  ৯ বছর অধ্যাপনা করেন। যোগদানকালে বেতন পেতেন ১২০টাকা। এখানে অধ্যাপনার সাথে সাথে তিনি এমএল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেন। ১৯২০ সালে আইনে স্নাতকোত্তর পাশের পর তিনি আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা ছেড়ে হাইকোর্টে আইন ব্যাবসা শুরু করেন। ১৯১৭ সালের ২ মার্চ তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে এনরোল্ড হন। তখন তিনি আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা করতেন। ১৯২১ সালে আনন্দ মোহন কলেজ ছেড়ে আসার পর তিনি আইনব্যবসা শুরু করেন।  আইন পেশায়ও তিনি অল্প দিনেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়। আইনপেশার পাশাপাশি ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ল’ কলেজে অধ্যাপনাও করেন।

তিনি ট্যাগর প্রফেসর অব ল’ পদে ১৯২৫-১৯৩০ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা  করেন। তার বিষয় ছিল ”the law of primogeniture with special reference to india, ancirnt and modern.’ ১৯৩০ সালে তিনি ২য় বারের মত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পদে যোগদান করেন। এবার তার বিষয় ছিল “ history of hindu law in the vedic age and in the post vedic times down to the institiute of manu.” ১৯৩৮ সালে আবার ৩য় বারের মত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যাগর প্রফেসর অব ল’ পদে যোগদান করেন। এবারের বিষয় ছিল “ crimes in international relation.”

একদিকে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা অন্যদিকে, আইনপেশা। দু’টি পেশাতেই ছিলেন সমানভাবে সফল।  ১৯৪১-১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক ছিলেন। ১৯৪১ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। ১৯৪২ সালের ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২য় মেয়াদে ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৩ সালের ২৩ জুন অবধি তিনি আবারও বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৪-১৯৪৬ সাল অবধি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলর – ভিসি’র দায়িত্ব পালন করেন।  একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা আরেকবার হাইকোর্টের বিচারপতি – এই দুই ধরনের পেশায় বার বার তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন –“ law and mathematics are no so different after all”.  সম্পর্কে এরপর ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি ১৯৪৬ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক নিযুক্ত হন। তিনি আজীবন বিপুল কর্মযজ্ঞের সুমহান পুরোহিত ছিলেন।

 

কৃতিত্বঃ  আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে ১৯১৩ সালে প্রণীত ভারতবর্ষের আয়কর আইনের সময়োপযোগী সংস্কার করেন।  ১৯২৭ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকারের আয়কর আইন-সংক্রান্ত উপদেষ্টা  ছিলেন। ১৯৪১-৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। আবারও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। ১৯৪৩-৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  তিনি ১৯৩৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল একাডেমী অব কম্পেরেটিভ ল’র যুগ্ন সভাপতি হন (গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রবন্ধ থেকে)। ১৯৪৬ সালে নিমন্ত্রণ পেলেন আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারপতি নিযুক্ত হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানি সৈন্যদের বিচার করার। ১৯৫২ সালে জাতিসঙ্ঘের আইন কমিশনের সদস্য, ১৯৫৪ সালে ভাইস চেয়ারম্যান ও ১৯৫৮ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে দ্বিতীয় বারের মত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সাল অবধি তিনি জাতিসংঘের আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ওয়াল্ড ফেডারেশন মুভমেন্ট’র প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন (গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রবন্ধ থেকে)। এমনকি জাতিসংঘের এ গুরু দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালনের পাশাপাশি তিনি ১৯৫৭ সালে হেগে অনুষ্ঠিত “ আন্তর্জাতিক ন্যায়-বিচার আদালতের”  বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন ( ভারত বিচিত্রা – জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা, ২০১৬)।

এছাড়া তিনি আলমডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়ার বর্তমান “ হাটবোয়ালিয়া স্কুল এন্ড কলেজ ” –এ (অধুনাতন এম,ই স্কুল ও এইচ,ই, স্কুল ) ১৯২৫ সাল যখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সে সময় থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত যখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সে অবধি একটানা ২০ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ভাবা যায় – ততকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হাটবোয়ালিয়ার মত একটা পাড়াগাঁইয়ের স্কুলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন সাগ্রহে! প্রায় প্রতিটি সভায় উপস্থিত থাকতেন তিনি। বিদ্যালয়ের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৯২৫ সালে হাটবোয়ালিয়ায় মাইনর ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সন্তানের মতই এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তিনি অনেক পরিশ্রমে তিল তিল করে ডাক্তার রিয়াজ উদ্দীনকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। হাটবোয়ালিয়ার সাথে তার নাড়ির ছিল লক্ষনীয়। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি হাটবোয়ালিয়ায় ছুটে যেতেন। তিনি এবং অনুজ ডাক্তার  রিয়াজ উদ্দীন আহমেদ দুজন জীবনের সবটুকু আলো উজাড় করে ঢেলেছেন নিভৃত পল্লি হাটবোয়ালিয়া গ্রামাঞ্চলকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে। বিশ্ববিখ্যাত একজন ব্যক্তির সাথে হাটবোয়ালিয়ার সম্পর্কের রসায়ন এখনও অনুদ্ধারিত অধ্যায়।

সুদৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যঃ শৈশবেই রাধা বিনোদ পালের সুদৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় লক্ষ্যনীয়। দারিদ্রের চরম কষাঘাতের ভেতরও লেখাপড়া করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রত্যয় থেকে বিচ্যূত হননি তিনি। পাহাড় সমান প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়েও জীবনের লক্ষ্য পূরণে অব্যর্থ ছিলেন তিনি। প্রতিনিয়ত সীমাহীন দারিদ্রের কষাঘাত ও বঞ্চনালে পদদলিত করে তিলে তিলে নিজকে তৈরি করেছিলেন বিশ্বমানের ব্যক্তিত্বে। এমনকি আইন পেশার শুরুতেও তাকে সীমাহীন অবজ্ঞা ও বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সব বিরূপতা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে অতি অল্প সময়েই তিনি খ্যাতির চুড়ায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন।

এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতের দায়িত্বভার গ্রহণকালেও তিনি প্রথাগত শপথ পড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের রায়ের ক্ষেত্রে সংখ্যা গরিষ্ঠ বিচারকের বিরুদ্ধাচরণ করেন অমিত সাহসে এই পাড়াগাঁয়ের দারিদ্রক্লিষ্ট ছেলেটি। আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক মনোনয়নকালে মনোনয়নদানকারি কর্তৃপক্ষ স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে, এই ভেতো বাঙ্গালী তাদের সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে দিবেন অবলীলায়। স্বাধীন রায় প্রদানে মিত্রশক্তির রক্তচক্ষুকে খুব স্বাভাবিকভাবে অবজ্ঞা করে গেছেন। আইনের দৃষ্টিকোণ ব্যাখ্যা করে তার উত্থাপিত ৩ প্রশ্ন আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল মিত্রশক্তির সমগ্র শক্তিমত্তাকে। বিচারের রায়ে তিনি উল্লেখ করেন, ইয়াল্টা সম্মেলনে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাংলিন রুজভেল্ট,রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট জোশেফ স্ট্যালিন ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রি উইনস্টন চার্চিল স্থায়ি শান্তির লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ি যুদ্ধ দ্রুত স্তিমিত করতে প্রচলিত অস্ত্র প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। তারপরও কেন জাপানে আনবিক বোমা নিক্ষেপ করা হল?

তাছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন জাপানের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণের ঈঙ্গিত দেওয়া সত্বেও জাপানের উপর আনবিক বোমা নিক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতার পরিপন্থী বলে দাবি করেন তিনি। তিনি ৮শ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায়ে উল্লেখ করেন যে, “ The law must always remain a dispassionate and uninvolved arbiter of facts and must disepense justice with absolute impartiality and fairness. The process of law and and the administration of justice must always be informed by absolute intergrity; it cannot be or even superficially appear to be vindictive. Further he added that the distinction between just and unjust war belongs to the theory of legal philosophy and that the rule concerning the crime againist peace was expost-facto legislation.”

তিনি রায়ে ভর ও গতি তত্বের উদ্ভাবক আলবার্ট আইনস্টাইন ও আনবিক বোমার আবিষ্কারক ওপেন হাইমারকেও সতর্ক করে দেন। তিনি অমিত বিক্রমে জাপানে আনবিক বোমা হামলার মধ্যে নিহিত আমেরিকার কী স্বার্থ নিহিত তাও প্রকাশ করে দেন। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রকারান্তরে ভয় দেখাতেই আমেরিকা জাপানে ওই আনবিক বোমা হামলা চালায় বলে ঈঙ্গিত করেন। রাধা বিনোদ পালের এত বড় স্পর্ধা দেখে বিশ্ববাসির সাথে সাথে খোদ ভারতবর্ষের মানুষও স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।

পেশাগত আদর্শ তিনি আজীবন সমুন্নত রেখেছিলেন। চিহ্নিত অপরাধীর ব্রিফ তিনি ফিরিয়ে দিতেন। (এম এ বারী লিখিত “justice Dr. Ratha Binode pal; A poet of international Law and philosophy”) তিনি চিহ্নিত অপরাধির পক্ষে আদালতে হাজি রা দেওয়াকে নীতি বিরোধি কাজ বলে অধীনস্তদের নিরুতসাহিত করতেন। শান্তশিস্ট গুরুগম্ভীর রাধা বিনোদ পাল প্রথমদিকে ব্রিটিশ সরকার ও পরে ভারত সরকারকে তীর্ষক ভাষায় কটাক্ষ করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি উপমাসংবলিত বাকচাতুর্য্যের পরিচয় দিতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতির জন্য জন্য জোসেফ স্ট্যালিনের চারিত্রিক স্খলন কম দায়ি না। তার দুমুখো নীতি ও আচরন অনেকাংশেই দায়ি। রাধা বিনোদ পাল আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের রায়ে তা উল্লেখ করতে এতটুকু কুন্ঠাবোধ করেননি। (Thsome historical persons who is the past played debatable role in a critical juncture that ordinary reader may ignore the relevant ingredient; but watchdog  historians may not be liberal to that extent. Stalin is such exposure of historians like Simon sebag Montefiore. ( Joseph stalin by Simon Sebag Montifiore and rechardovery)

 

যে অসামান্য কর্ম তাকে সুখ্যাতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দেয়ঃ  ২য় বিশ্বিযুদ্ধে জার্মান আর জাপানের পরাজয় হলে এই দেশ দু’টির যুদ্ধের কুশীলবদের বিচারের জন্য যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক আদালতের দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠণ করা হয়। একটি জার্মানির  নুরেমবার্গে ও অন্যটি জাপানের টোকিওতে। হিটলারের যুদ্ধবাজ মন্ত্রিদের বিচার করা হয় নুরেমবার্গের ট্রাইব্যুনালে। আর জাপানের সমরবীদ জেনারেল হিদেকী তোজোর বিচার করা হয় টোকিও ট্রাইব্যুনালে । এ ২টি ট্রাইব্যুনালে বিশ্বের মোট ১১ জন জাঁদরেল বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের একজন ছিলেন ডঃ রাধা বিনোদ পাল। এশিয়া মহাদেশের একমাত্র বিচারক ছিলেন তিনি। ডঃ রাধা বিনোদ পাল টোকিও ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৪৬- ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে এ বিচারকার্য। বিচারের একপর্যায়ে রাধা বিনোদ পাল বাদে অন্য সব বিচারপতি জেনারেল তোজোকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে ফাঁসিতে ঝুলানোর সিদ্ধান্ত নেন। অন্যান্য বিচারপতির ধারণা ছিল, বিচারপতি পালও মিত্রশক্তির পক্ষে অনুগত থাকবেন। কিন্তু বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের ৮শ’ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায় মিত্রশক্তি এমনকি বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। ((গৌতম কুমার রায়  তার “ ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল” প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন  ওই ঐতিহাসিক রায় ছিল ১২৩৫ পৃষ্ঠার )।

আইনের শাসনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল বিচারপতি পাল কর্তৃক পূর্ববর্তী রায়কে বিতর্কিত প্রমাণ করে অকাট্য যুক্তি দেন।  তিনি মিত্রশক্তির পক্ষে রায় প্রদানকারি ৪ বিচারপতির রায়কে বিতর্কিত প্রমাণের জন্য ৩ টি বিষয় উপস্থাপন করেন। (ক) মিত্র শক্তির তিন প্রধান কর্তৃক স্থায়ী শাস্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দ্রুত স্তিমিতকরনে প্রথাগত অস্ত্রের অনুশীলন সম্পর্কিত ঘোষনা।

(খ) আন্তর্জাতিক আইনের সংযম ও নিরপেক্ষতার নীতিমালা লংঘন। (গ) জাপানের আত্মসমর্পনের ইঙ্গিত উপেক্ষা করতঃ ভয়ানক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী আনবিক বোমা ব্যবহার।মূলতঃ আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকার্য তাকে বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি এনে দেয়।

সন্মানঃ  তিনি জাপান-বন্ধু ভারতীয় বলে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে  রাধাবিনোদ পালকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করা হয় নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে। এমনকি জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে তাঁর নামে। তিনি জাপান সম্রাট হিরোহিতোর কাছ থেকে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মানীয় পদক ‘কোক্কা কুনশোও’ গ্রহণ করেছিলেন। জাপানের রাজধানী টোকিও’র অন্যতম  বৃহত ও ব্যস্ত সড়ক তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এখানেই বিচারকের গাউন পরিহিত এই কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্বের আবক্ষচিত্র জাপানিদের গর্বিত এক প্রতীক হিসেবে শোভা পাচ্ছে। এমনকি কিয়োটো শহরে তাঁর নামে রয়েছে জাদুঘর, সড়কের নাম ও আরেকটি স্ট্যাচু । টোকিও ট্রায়াল টেলিসিরিয়ালটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের ট্রায়াল নিয়ে নির্মিত হলে তাঁর চরিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খান। ( ভারত বিচিত্রা – জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা, ২০১৬)। জাপনের সাধারণ মানুষও ড রাধা বিনোদ পালকে কতটা আপন ভাবেন, নিচের গল্প থেকে তার কিঞ্চিত পরিচয় মেলে। ২০০৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত শান্তি সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন জাপানের ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক ওওৎসুকা। তিনি আয়োজকদের বার বার অনুরোধ করেন ড রাধা বিনোদ পালের কোন বংশধরের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে। সে সময় জাপানি গবেষকের অনুরোধে ডঃ রাধা বিনোদ পালের জামাই ডঃ দেবীপ্রসাদ পালের সাথে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। ডঃ দেবীপ্রসাদ পাল ভারত বিখ্যাত আইনজ্ঞ ও লোকসভার ৩ বারের নির্বাচিত সদস্য।(গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রবন্ধ থেকে)। তাঁর এ রায় জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি বই আকারে প্রকাশ করেন। জাপান, ইংলিশ ও জার্মানী ভাষায়। এটি জাপানে “শিক্ষামূলক মহা ইতিহাস গ্রন্থ” হিসেবে খ্যাত। ( ভারত বিচিত্রা – জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা, ২০১৬)। বর্তমানে বিখ্যাত রায়টি কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ও হাভার্ডসহ পৃথিবীখ্যাত নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আইন প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়।(গৌতম কুমার রায়ের – ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল )।

১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ উপাধি প্রদান করেন। এ বছরই তাকে ব্যবহারিক শাস্ত্রের জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। তিনি হিন্দু দর্শন আইন, বৈদিক যুগ, তামাদি আইন, আয়কর আইন, পূর্বাধিকার আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়ন ও বৈদিক যুগ হিন্দু আইনের ইতিহাস নিয়ে অনেক কাজ করেন। তিনি পৃথিবীর বহু দেশে আইন বিষয়ক  আন্তর্জাতিক সভায় সভাপতিত্ব করেন।

জানা যায়, রাধা বিনোদ পালের ডকুমেন্টারি তৈরির জন্য কাকিলাদহে জাপানের এনএইচকে টেলিভিশনের পরিচালক তরুতাকাজি, প্রকৌশলী দাই সহাকুরা, টেকনিশিয়ান সিংজিজু বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ ছাড়া জাপান সরকারের প্রতিনিধিরা স্মৃতিবিজড়িত এ জায়গায় অত্যাধুনিক হাসপাতাল , মিউজিয়ামসহসহ একাধিক স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রভাবশালীমহলের দৌরাত্বে সেগুলো সম্ভব হয়নি।

 

রাধা বিনোদ পালের কাকিলাদহ’র বাড়িঃ  কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার কাকিলাদহে তাঁর পুরাতন বাড়ির ধ্বংস্তূপ অবশিষ্ট রয়েছে। ড. রাধা বিনোদ পালের শৈশবের মাত্র কয়েক বছর কেটেছে এ গ্রামে। তাছাড়াও জীবনের বিভিন্ন সময়ে মাঝে-মধ্যে তিনি নিজের এই বাড়িতে অবস্থান করেছেন। এখন এলাকাটি এখন জজপাড়া নামে পরিচিত।

 

মৃত্যুঃ  তিনি ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি কলকাতাস্থ ১৬ নং ডোভার লেনের বাড়িতে এই বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্বের জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের মতই স্বজন হারানোর বেদনায় মূহ্যমান ছিল আলমডাঙ্গার কুমারী ও হাটবোয়ালিয়া এলাকাবাসি। ভারতবর্ষসহ বিশ্ব হারিয়েছে নির্ভিক ও ন্যায়নিষ্ঠ এক অভিভাবক।