সাম্প্রতিক

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেলেই…

টানা ৫১ দিনের কর্মসূচির পর ‘ক্লান্ত’ বিএনপি জোটের নেতাকর্মীরা আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। কিন্তু হঠাৎ আন্দোলন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তে যে সাংগঠনিক দৈন্যদশা প্রকাশ পাবে-সেই চিন্তাই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের সামনে। এখন তারা তাকিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে। আপাতত আলোচনায় বসলে কিংবা অন্যকোনোভাবে নির্বাচনের ব্যাপারে ‘আশ্বস্ত’ করলেই চলমান আন্দোলনে ক্ষ্যান্ত দেয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয় বিএনপির সামনে। দলটির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য  বলেন, ‘সরকারের মধ্যে কোনো ধরনের নমনীয় ভাব নেই। অথচ তারা নমনীয় না হলে দেশকে চলমান সংকট থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। সরকার যতদ্রুত আলোচনায় আগ্রহী হবে ততদ্রুত সমাধানে পথ বের হবে।’

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপি এখন সংলাপের অপেক্ষায় আছে। তারা চাইছে সরকার আলোচনার ব্যাপারে উদ্যোগী হোক। পুরোপুরি না হলেও আপাতত পরবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু শুনতে চাইছেন তারা। প্রয়োজনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার সময় নিতে পারে। তবে সেটা অবশ্যই আলোচনার ভিত্তিতে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই পক্ষকেই ছাড় দিয়ে বসে কথা বলে সমাধানে পৌঁছা উচিত। সরকার যদি মনে করে এখন নির্বাচন দেয়া সম্ভব নয়, তবে তারা বলুক এখন নয়, ছয়মাস কিংবা একবছর পর নির্বাচন হবে। অথবা নির্দিষ্ট একটা সময়ের কথা বলতে পারে। তারা একটু বসলেই আজকে দেশে যে অনিশ্চয়তা আছে তা কিছুটা কাটবে।’

উদাহরণ টেনে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘ধরুন আপনার ছোট্ট ছেলেটি রাগ করেছে। তাকে আপনি তো এতটুকু বলতে পারেনÑ যে বাবা তোমায় পুতুল কিনে দেবো। এই আশ্বাসটুকু পেলেও তো তার রাগ ভাঙবে। তাছাড়া জেদাজেদি করে তো গণতন্ত্র চলে না।’

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় আরও একটি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন মহলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন বিএনপি নেতারা। যে করেই হোক সরকার প্রধানকে আলোচনায় বসার ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চাইছেন। এর বাইরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের মাধ্যমেও সরকারের ওপর আলোচনার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তারা আশা করেছিলেন, জাতিসংঘের মহাসচিবের আহ্বানের পর সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবে। অথচ বিষয়টি খুব বেশি আমলে না নেয়ায় অনেকটা হতাশায় বুক বাঁধছেন বিএনপি নেতারা।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান  বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানে পৌঁছতে হবে। সরকার তো সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করছে না। এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে। বিএনপি আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কারা এসব করছেÑতাদেরও তো খুঁজে বের করা যাচ্ছে না। এখন উপায় একটাই আলোচনায় টেবিলে বসে সরকারকে কথা বলতে হবে।’

টানা অর্ধশত দিনের আন্দোলনে মাঠ পর্যায়েও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ঘেয়েমি চলে এসেছে। কোনো ধরনের আশার আলো না দেখায় আন্দোলনে জোর পাচ্ছেন তারা। তাছাড়া ক্লান্তও হয়ে পড়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। বিষয়টি উঠে এসেছে নাগরিক ঐক্যের নেতার সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার ফোনালাপেও। যেখানে খোকাকে বলতে শোনা গেছে, তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকেই দীর্ঘ আন্দোলনে বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। এখন আন্দোলন সামনের দিকে টেনে নেওয়াও চ্যালেঞ্জ। তবে এগিয়ে নেয়া ছাড়াও তো উপায় নেই।

সিলেট জেলা বিএনপি একজন নেতা  হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, ‘ভাই এভাবে চলতে থাকলে কবে সরকার পতন হবে, কবে নির্বাচন হবে তার কোনো ঠিক নেই। সরকার তো পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ব্যবহার করে টিকে আছে। অস্ত্রের মুখে আর যাই হোক কেউ তো নিজের বুক পেতে দিতে পারে না। কেন্দ্র থেকেও কোনো আশ্বাস পাচ্ছি না। এভাবে আর কতদিন বলুন?’

শুধু যে বিএনপি নেতাকর্মীরাই নেতিয়ে পড়েছেন তা নয়, সাধারণ মানুষের মনও ধীরে ধীরে বিষিয়ে উঠছে বিএনপির ওপর। তারা এখন হরতাল-অবরোধের তোয়াক্কা না করেই বেরিয়ে পড়ছেন রাস্তা। অন্যদিকে আগে হরতাল ডাকলে দুজন বিএনপি নেতাকর্মীদেরও দেখা মিলতো রাজপথে। কিন্তু এখন গত কয়েকদিনের হরতালে কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মনোয়ার হোসেন। বিএনপি আন্দোলন কর্মসূচিতে নিজের ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘শুরুর দিকে বিএনপি আন্দোলন দেখে মনে হয়েছে তারা কিছু করতে পারবে। আর এখন দিন যতই যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে বিএনপিকে দিয়ে জনদুর্ভোগ বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই হবে না। না পারলে আন্দোলন থেকে সরে আসতে অসুবিধা কোথায়?’