সাম্প্রতিক

মধ্যরাতের আলমডাঙ্গা –এপিসোড বাঁশি

মধ্যরাতের আলমডাঙ্গা –এপিসোড বাঁশি

মধ্যরাতের আলমডাঙ্গা –এপিসোড বাঁশি

মধ্যরাতের আলমডাঙ্গা –এপিসোড বাঁশি

মধ্যরাতের আলমডাঙ্গা –এপিসোড বাঁশি

“ মহুয়া বনে লুটিয়ে পড়ে মাতাল চাঁদের হাসি রে।” এমন মাতাল চাঁদের উন্মাতাল হাসি মাথায় নিয়ে আমরা মানে আমি আর আতিক বিশ্বাস অফিস থেকে বের হলাম। গন্তব্য আনন্দধাম। আনন্দধাম ব্রীজের রেলিং-এ বসে আমরা। আতিক বিশ্বাস ধীরে সুস্থে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলেন। আমি নীচে বহমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচখালের প্রবহমান পানির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছি। ক্যানেলের স্বচ্ছতোয়া জলে প্রতিফলিত হচ্ছে চাঁদের রূপোলী আলো। কিন্তু এ সৌন্দর্য্যের বৈভব বেশি সময় ধরে উপভোগ করা হল না। সিদ্ধান্ত নিলাম দুজন দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতে বিলি কেটে যাওয়া শিশির ভেজা  জোছনার অবর্চনীয় সৌন্দর্য উপভোগের। আমাদের মোটর সাইকেল ছুটল জামজামির দিকে।

“ খোল খোল খোল গো দোয়ার/ নীল ছাপিয়া এল চাঁদের জোয়ার।। /——/ গঙ্গায় তার চিতা নিভেছে কবে।/ মোর বুকে সেই চিতা আজও জ্বলে নিরবে।/ জানি, স্মৃতির চিতা তার নিভিবে না বুঝি আর/ কোন সে লোকে কোন সে জনমে।”

রাত ১১টা ছুঁই ছুঁই। বাদেমাজু গ্রামের মোড়ের বাজারে তখনও প্রবেশ করিনি। দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির সুরের সুনিপূণ হৃদয়হরণ তান। যান্ত্রিক যুগে নগরে কি গ্রামে, কোথাও বাঁশির সেই আবেগী সুর আগের মতো আর শুনতে পাওয়া যায় না।  তারপরও যখন কানে ভেসে আসে চিরচেনা সেই সুর, তখন উদাসী মন হঠাৎই থমকে দাঁড়ায়। বুঝতে পারি  স্কুলমাঠ থেকে সে সুর লহরি ভেসে আসছে।  এগিয়ে গিয়ে দেখি এ বংশীবাদক তো খোকন।  মানোয়ার হোসেন খোকন।  আমি তাকে বাঁশিওয়ালা নামে ডাকি।  সুদর্শন ও মিষ্টভাষি এ যুবক ইতোমধ্যে দেশের সকল টিভি চ্যানেলে নামি শিল্পীদের সাথে সঙ্গত দিয়েছেন।  ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের নিমন্ত্রণে একাধিক বার ভারতের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন।

সিদ্ধান্ত হল খোকন বাঁশিওয়ালাকে আজ রাতে সঙ্গে নেওয়ার। আমার কথা ফেলতে না পেরে শেষতক খোকন আমাদের সাথে আনন্দধাম চলল।  প্রথমে আমরা চললাম আটকপাটে। আটকপাটে বসে উন্মাতাল জোছনায় ভাসছি। এমন উন্মাতাল জোছনাময় আফিমরাতে কত কথায় মনে পড়ছে।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র সত্ত্বাজুড়ে বাঁশি ছিল কতখানি, তা তার বিভিন্ন সঙ্গীতে বিধৃত হয়েছে।  অবচেতন মনে রাধিকাকে সম্মোহিত করতেই যেন তার বাঁশির অপূর্ব ব্যবহার।

“ বাঁশি বাজায় কে কদম তলায় ওলো ললিতে/ শুনে সরে না পা পথ চলিতে॥ / তার বাঁশির ধ্বনি যেন ঝুরে ঝুরে/  আমারে খোঁজে লো ভুবন ঘুরে/ তার মনের বেদন শত সুরে সুরে/ (ওসে) কি যেন চাহে মোরে বলিতে॥/ সখি নির্মল কুলে মোর কৃষ্ণ-কালি/ কেন লাগালে কালিয়া বনমালী/ আমার বুকে দিল তুষের আগুন জ্বালি/ আরো কত জনম যাবে  জ্বলিতে॥ ”

বুকের অসহ্য দহনজ্বালাও মেটাতেন বাঁশির অনুষঙ্গে।

“ কে বিদেশী/   বন-উদাসী’/ বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে।/ সুর-সোহাগে তন্দ্রা লাগে/ কুসুম-বাগের গুল-বদনে॥ / ঝিমিয়ে আসে ভোমরা-পাখা/ যূথীর চোখে আবেশ মাখা/ কাতর ঘুমে চাঁদিমা রাকা/ ভোর গগনের দর্‌-দালানে/ দর্‌-দালানে ভোরগগনে॥/ লজ্জাবতীর ললিত লতায়/ শিহর লাগে পুলক-ব্যথায়/ মালিকা সম বঁধুরে জড়ায়/বালিকা-বঁধু সুখ-স্বপনে॥/ বৃথাই গাঁথি,  কথার মালা/লুকাস্‌ কবি বুকেরজ্বালা,/ কাঁদে নিরালা বন্‌শীওয়ালা /তোরি উতালা বিরহী মনে॥ ”

শুধু নজরুলই পারতেন বাঁশির সুরে বনে ফুল ফোটাতে।

“ ওরে ডেকে দে দে লো, মহুয়া-বনে ফুল ফোটাত /বাজিয়ে বাঁশি কে।/বনের হরিণ নাচাত, পাখি কে গান গাওয়া তো, / ঢেউ ওঠাতো ঝরনা জলে – পা্হাড় তলিতে॥ / তার গানের কথা জানিয়ে দিত ফুলের মধুকে,(তার) সুরের নেশা করত ব্যাকুল মনের বঁধুকে/গো মনের বঁধুকে / বুকের মাঝে বাজত নূপুর চপল হাসিতে/ লো তার চপল হাসিতে॥ / আঁধার রাতে ফোটাত সে হলুদ গাঁদার ফুল, / সে বন কাঁদাতো, মন কাঁদাতো, / কাজ করাতো ভুল / লো কাজ করা ত ভুল।/ আর সে বাঁশি শুনি না/ ধোঁয়ার ছলে কাঁদিনা,/ আর রাঙা শাড়ি পরিনা, নোটন খোঁপা বাঁধিনা, /আমি রইতে নারি না হেরে সেই বন-উদাসীকে লো/বন-উদাসীকে॥ ”

তরুণ নজরুল তখন কুমিল্লার নার্গিসের প্রেমে দিশেহারা।  শোনা যায় – নজরুল ইসলাম চ্যালেঞ্জ করতেন হাওড়পাড়ের সমস্ত বক-পাখি বাঁশি বাজিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসার।  কুমিল্লার হাওড়পাড়ে এক বড় বটগাছ ছিল।  নজরুল বাঁশি নিয়ে ওই বটগাছে উঠে তন্ময় হয়ে বাঁশি বাজাতেন। এক পর্যায়ে হাওড়ের পাখ-পাখালি উড়ে উড়ে বটগাছে ভীড় জমাত।

 

কবি রবি ঠাকুরের সঙ্গীত ও কবিতায় বাঁশির অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে।  যে কথা কখনও কাউকে বলা হয়নি, তিনি সে কথা শুধু বাঁশিকেই বলে যেতে চেয়েছে।

“ আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে॥ / ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয়নি বলা, / কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে॥/ আমার চোখে ঘুম ছিল না গভীর রাতে, / চেয়েছিলেম চেয়ে থাকা তারার সাথ এমনি গেল সারারাতি, পাইনি আমার জায়গার সাথি–  /বাঁশিটিরে জাগিয়ে গেলেম গানে গানে॥ ”

আগেই উল্লেখ করেছি যে আজ আমাদের সাথে সঙ্গ দিতে উপস্থিত আলমডাঙ্গার বাঁশিওয়ালা খ্যাত খোকন। খোকন আলমডাঙ্গার বাদেমাজু গ্রামের সুদর্শন যুবক। স্বশিক্ষিত সুদর্শন এই খ্যাতিমান যুবকের এখন আমাদের সাথে রাত্রি জাগরণ।  এখন তার সাথে আমাদের আলাপন।

: আচ্ছা, বাঁশিবাদন কি গুরুমুখী বিদ্যে?

খোকনঃ অবশ্যইবাঁশি গুরুমুখি বিদ্যা। বাঁশি বাজানোর কৌশল রপ্ত করতে হলে গুরুর স্মরণাপন্ন হবার বিকল্প হয়না।

: আচ্ছা, বাঁশি কী বিভিন্ন রকম হয়?

খোকনঃ হ্যাঁ। বাঁশি নানান রকম স্কেলের হয়।যেমন ছয়, সাড়েছয়,সাত, সাড়েসাত, আট, সাড়েআট, নয়, সাড়েনয়, এগারো, সাড়ে এগারো ইত্যাদি।স্কেল। গোল বাঁশির আকার ও স্বরেরও পর নির্ভর করে আলাদা করা হয়।

: আচ্ছা, সংগীত-ইতিহাসবিদ ব্রুনো লিখেছেন, ভারতের সমস্ত প্রাচীন পুরাতাত্ত্বিক ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় বাঁশিকে অনুভূমিকভাবে (একটুনিচুকরে) বাজানোর রীতি পাওয়া যায়। সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে, সেকালে বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে কোনো লিঙ্গভেদ ছিলনা―নিদর্শনগুলোতে প্রচুর নারী শিল্পীর ছবিও পাওয়া গেছে । বাংলাদেশে কি নারী বংশিবাদক আছেন?

খোকনঃ আমি পাইনি।

: পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার নাম শুনেছেন?

খোকনঃ তার বাদন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে শোনার সৌভাগ্য  হয়েছিল। তিনি উপমহাদেশের খ্যাতিমান বংশীবাদক । ভারত সরকার তাকে পদ্ম-বিভূষণ, পদ্মভূষণ, সংগীত নাটক একাডেমি পদক, নর্থ উড়িষ্যা বিশ্ববিদ্যালয় ও উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে ।

: তার সম্পর্কে আর কী জানেন?

খোকনঃ বেশি কিছু না। আপনি কিছু জানলে বলেন।

: ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে তার একবার দেখা হয়েছিল, সে সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি তখন ছোট। তার একসহপাঠী একদিন বললেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এসেছেন চল দেখা করে আসি । তো হাফপ্যান্ট, হাফ শার্ট পরে গেলেন । তিনি হরপ্রসাদকে দেখেই কাছে ডাকলেন । কাছে গিয়ে তাকে প্রণাম করলেন ।ওস্তাদজি বললেন, “ খাবে কিছু?”  তিনি বললেন, না না আপনাকে একটু দর্শন করতে এসেছি । তিনি বললেন, “ বস, আমি একটু সিগারেট টেনে তারপর তোর সঙ্গে কথা বলব । ” এরপর তিনি বললেন, “ বাজা।” এ কথা শুনে হরপ্রসাদ তো ভীষণ লজ্জা পেলেন, কী বাজাবেন বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞের সামনে ! তিনি বললেন,” যা পারিস বাজা।” সে সময় হরপ্রসাদ তাকে একটু ইমন শিখেছিলেন সেটুকু তাকে শোনালেন । তখন তিনি বেহালা বাজিয়ে হরপ্রসাদকে শোনালেন । এরকম বাদন আর  কখনও শোনেননি হরপ্রশাদ বলেও উল্লেখ করেন ।ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাকে বলেছিলেন, “ তুমি মিউজিক শিখলে আমার মেয়ের কাছে যাবে।। ” পরবর্তিতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কন্যা সুরবাহারের কিংবদন্তি শিল্পী অন্নপূর্ণা দেবীর সান্নিধ্য লাভ করেন ।তিনি ছিলেন হরপ্রসাদের গুরুমা । সুরপ্রক্ষেপণ, সুরেরওঠানামা, সুরেরআবেগ, সুরের কারুকাজ ইত্যাদি তিনিই নাকি শিখিয়েছেন । তিনি হরপ্রসাদকে শেখালেন গায়কী (সংগীতপরিবেশনারীতি), গৎকারী (সেতার, সরোদবাদনের শৃঙ্খলা ) । সুরের প্রবাহে তিনি বিভিন্ন স্টোক উপস্থাপন শেখেন । ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি গুরুমার কাছে সুরের আবর্তন, প্রক্ষেপণ শিখেছেন ।

: যাহোক, এ বাঁশি আবার কারও কারও  জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনে । সেকারণে নিরীহ বাঁশিকে অনেকে ডাকাত সম্বোধন করেছেন ।

খোকনঃ সে কী কথা !

: কেন শোনেন নি শচীন কর্তার বিখ্যাত গান – “ বাঁশি শুনে আর কাজ নাই/ সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি।।/ সে যে দিন-দুপুরে চুরি করে /রাত্রিরেতে কথা নাই । /ডাকাতিয়া বাঁশি / ও…/ বাঁশেতে ঘুণ ধরে যদি কেন বাঁশিতে ঘুণ ধরেনা / কত জনায় মরে শুধু পোড়া বাঁশি কেন মরেনা।।”

খোকনঃ এ গান জানি। কিন্তু তা যে শচীনকর্তার তা জানতাম না।

: আপনার চেহারা মাশাআল্লাহ! বংশীবাদক হিসেবেও অনেক নাম । আপনি কি কখনও বাঁশী বাজিয়ে কোন রূপসীর তনুমন ডাকাতি করেছেন?

খোকনঃ এসব কথা থাক, সংসারে অশান্তি হবে । হা-হা-হা—। তারচে’ শচীন কর্তার গল্প বলেন।

শচীনকর্তার কথা কিছু বলেন । তিনি নাকি অনেক বড় গায়েন ছিলেন?

; হু ।  তা বলব, তবে এখানে নয় – আনন্দধাম ব্রীজে গিয়ে।

 

আনন্দধাম ব্রীজের উপর বসে আমরা তিন নেশাচর প্রাণি। চারিদিকে সুনসান নিরাবতা! খোকন বাঁশিতে সুর তুলছে। মনে হয় বাঁশির হৃদয় গুমরিয়ে গুমরিয়ে কাঁদছে। এমন সময় দুজন ব্যক্তি আসছেন। তাদের পথ আটকালাম। রাত প্রায় ১টা বাজে। এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন তারা? তাদের বাড়ি হাউসপুর জানাল। বললেন, হোটেলে কাজ করেন। তাই ফিরতে এত রাত হয়ে যায়। তাদের সাথে বেশ আলাপ হল। আতিক বিশ্বাস সিগারেট খাওয়ালেন তাদের।  তাদের নিকট থেকে অনেক তথ্য জানলাম আনন্দধাম এলাকার। জানালেন – আনন্দধাম থেকে এরশাদপুরের দিকে যে টার্সিয়ারি ক্যানেল উতপত্তিহয়েছে, সেই ঘোনায় একটি ওয়াপদার পরিত্যক্ত বিল্ডিং রয়েছে। সেটি দখল করে রমরমা পতিতাবৃত্তির ব্যবসা চলছে বলে। গভীর রাতে এক শ্রেণির ব্যক্তিরা ওই বিল্ডিং-এ ভীড় করে। এছাড়া শহরের দিক থেকে আনন্দধামের ব্রীজে উঠতে বাম পাশে এক বাড়িতে এ পতিতাবৃত্তির ব্যবসা চলে। এক সময় এ মহিলা জনপ্রতিনিধিও ছিলেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন।বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের দেখা উচিত। এ দুজন চলে গেলে খোকন বাঁশি থামিয়ে আবারও শচীন কর্তা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বলতেই হল কিছু।

: বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় বাংলা গানের কিংবদন্তীতুল্য শিল্পী শচীন দেব বর্মণ । তাকে আধুনিক হিন্দি গানেরও জনক বলা হয়।তিনি এস ডি বর্মণ হিসাবে ততোধিক পরিচিত। গত প্রায় একশত বছরেও বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে তার কালোত্তীর্ণ গানের আবেদন কিছুমাত্র লঘু হয়নি। কিছুটা আনুনাসিক( নাকেকথা) কন্ঠস্বরের জন্য শ্রোতাদের কাছে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। কেবল সংগীতশিল্পী হিসাবে নয়, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসাবেও তিনি ছিলেন সার্থক।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই সংগীতজ্ঞের জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লায়। ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় মানিক্য রাজপরিবারের সন্তান তিনি। তৎকালীন ত্রিপুরার অন্তর্গত কুমিল্লার রাজপরিবারের নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মা মণিপুরি রাজবংশের মেয়ে নিরুপমা দেবী। শচীনদেব বর্মনের পিতা নবদ্বীপ কুমার বর্মণ ছিলেন তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎ ভাই । বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎ মা পটরানীর পুত্র তার পথের কাটা দূর করার জন্য নবদ্বীপ কুমার বর্মণকে হত্যা করার চেষ্টা করেন। তখন শচীন দেব বর্মণের পিতা ১৮৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সপরিবারে এদেশে চলে আসে এবং কুমিল্লায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন সেই সঙ্গে সিংহাসনের দাবি ছেড়ে দেন।বীরচন্দ্র মাণিক্যের অর্থানুকূল্যে কুমিল্লায়৬০ একর জমি নিয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন কুমার বাহাদুর নবদ্বীপ চন্দ্র। এই প্রাসাদে ১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর তার ছোট সন্তান শচীন দেব বর্মণের জন্ম।

শচীন দেব বর্মণ কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস (এসএসসি) পাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। ঐ কলেজ থেকেই আইএ (এইচএসসি) পাস করেন। একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এরপর এমএ ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

লেখাপড়াশেষেতিনি কুমিল্লায় গিয়ে থাকলে রাজকীয় আরামে এবং রাজ্য সরকারের কোনো উচ্চপদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। তা না করে একা সংগ্রাম করে, নিজে উপার্জন করে সংগীত সাধনায় জীবন কাটিয়ে দিলেন। ত্রিপুরার প্রাসাদ ছেড়ে ভাড়া করা সামান্য একখানা ঘরে আস্তানা বাধঁলেন।

এসডি বর্মন হাই কোর্টের জজ কমলনাথ দাশগুপ্তের দৌহিত্রী, গানের ছাত্রী মীরা ধর গুপ্তকে বিবাহ করেন। মীরাও ছিলেন সংগীতশিল্পী ও নামকরা গীতিকার। শচীনদেববর্মণেরঅনেকজনপ্রিয়গানেরগীতিকারতারসহধর্মিনী। ১৯৩৯ সালে তাদের সন্তান রাহুলদেব বর্মণের জন্ম হয় (যিনি বর্তমানে আরডি বর্মন নামে বিখ্যাত)। তার পুত্রবধূ আশা ভোশলে সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তিনি সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। ট্যাক্সি ড্রাইভার ছবির জন্য ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার এবং পিয়াসা ছবির জন্যে এশিয়ান ফিল্ম সোসাইটি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি হেলসিনি, ফিনল্যান্ড আন্তর্জাতিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অন্যতম বিচারক ছিলেন। তিনি লাভ করেন সন্তহরিদাস পুরস্কারসহ অগণিত আরো অনেক পুরস্কার।কলকাতা শচীন দেব বর্মনকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে আর মুম্বাই দিয়েছে সুরের জগতে তাঁর পৃথিবীব্যাপি খ্যাতি। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমি পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে গান সংগ্রহ করতাম, কারণ গানকেই আমার একমাত্র সম্পদ মনে করতাম এবং এই সম্পদের জোরেই আমি সুরের সেবা করে চলেছি, আর তার আদি হল বাংলার পথেঘাটে ঘুরে সংগৃহীত ও রচিত আমার প্রাণের গানগুলো। থেকে। তিনি নিজের মুখে বলেছেন পূর্ববঙ্গের এমন কোন অঞ্চল নেই, এমন কোন নদী নেই যেখানে আমি যাইনি, ঘুরিনি। তিনি লোকজ সঙ্গীত ও ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের সংমিশ্রণে নিজস্ব ঘরনার সৃষ্টি করেন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে।

রাত পৌণে ৩ প্রহর। এত রাতে খোকন বাঁশিওয়ালাকে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক বিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে না। তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েই আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে। তাই, আর দেরি করা যাবে না। উঠতে হবে। আমরা মোটর সাইকেলে উঠলাম। গাড়ি স্ট্যার্ট দিয়েই আতিক বিশ্বাস গলা ছাড়লেন –

“ সে যে বাঁজিয়ে বাঁশি ফিরছে সদাই,/ কূলবতীর কূল নাশে/ সেই কালা চাঁদ নদে এসেছে।”

( এ পর্বটি লিখতে একটু বিলম্ব ঘটল। সে জন্য দুঃখিত)।

  • রহমান মুকুল

৭/১১/২০১৮ ইং।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না