সাম্প্রতিক

বসন্তে বেড়িয়ে আসুন “ ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত”-র কবির পিতৃ বাস্তুভিটা চুয়াডাঙ্গার গ্রামে

রহমান মুকুলঃ নাম বললে আচম্বিতে অনেকেই চিনে নাও উঠতে পারেন, কিন্তু তার কবিতার সাথে পরিচয় নেই তাবৎ ভারতবর্ষে এমন একজনও শিক্ষিত বাঙালী খুঁজে পাওয়া রীতিমত দুষ্কর। বিশেষ করে তার “ফুল ফুটুক না ফুটুক” কবিতার এই একটি ছত্র “ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।”এবার নিশ্চয় সকলেরই মনে পড়ছে বাংলা সাহিত্যের সেই বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকের নাম। সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তিনি একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক, ভ্রমণকাহিনিকার, অনুবাদক, সাংবাদিক, সংগঠক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তার ৭০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আরও লেখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বলে জানা যায়। বিভিন্ন সংগঠণ, পত্রিকা সম্পাদনাসহ নানা রকম কাজেও তিনি ছিলেন আত্মনিবেদিতপ্রাণ। তিনি সৃষ্টি করেছেন কবিতার পৃথক এক ভুবন। তিনি চল্লিশের সবচে’ উজ্জজ্বলতম কবি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংবেদনশীল ভূমিকার কারণেও তার কাছে আমাদের সবিশেষ ঋণ রয়ে গেছে। অথচ, বেশিরভাগ মানুষ জানেন না যে বসন্তের এই অগ্রদূত কবির পিতৃভূমি ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে; চুয়াডাঙ্গায়। যদিও ১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম হয়েছিল মাতুতালয় – কৃষ্ণনগরে। কিন্তু বাবা-দাদার বাস্তুভিটা চুয়াডাঙ্গা জেলার জয়রামপুর গ্রামে। বাবার নাম ক্ষিতিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মা যামিনী দেবী।
১৯৩৯ সালের দিকে অবিভক্ত বাংলায় বিভিন্ন জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সংগঠন গড়ে উঠলে–সাহিত্যিকদের মাঝেও সমাজতাত্ত্বিক চেতনার প্রভাববলয় বিস্তৃত হতে থাকে। তারই ক্রমধারায় সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা জীবনমুখী প্রগতিশীল কর্মকান্ডে অধিকতর ক্রীয়াশীল হয়ে উঠেন। এরই মধ্যে মাত্র ২১ বছর বয়সে সাম্যবাদে দীক্ষিত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ প্রকাশিত হয়। এই একটি মাত্র কবিতা গ্রন্থের অগ্নিস্ফুলিঙ্গসম কবিতা মাতিয়ে তুলেছিল সাম্যবাদী আন্দোলন কর্মিদের। এ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই তিনি ভারতবর্ষের তাবৎ সাহিত্যপ্রেমির হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। এ যেন “ এলেন, দেখলেন ও জয় করলেন।” ‘পদাতিক’ প্রকাশের বছরেই কবি, সমালোচক ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু এই গ্রন্থের কবিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা লিখেছিলেন। পঞ্চমুখে প্রশংসা করে লিখেছিলেন।
‘পদাতিক’ গ্রন্থের বহু সংস্করণ বের হয়েছে। প্রথম বাংলাদেশে সংস্করণ বের হয় ১৯৭৪ সালে। এই বাংলাদেশি সংস্করণের ভূমিকা দেখে হৃদয়াঙ্গম করা সহজ হয় যে “পদাতিক” গন্থের উপজীব্য ও উপাদান ছিল কবির স্বদেশ অর্থাৎ বাংলাদেশের পশ্চাদপদ, নির্যাতিত-অবহেলিত প্রান্তিক মানুষ। এ সংস্করণের ভুমিকা লিখতে গিয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : ‘এ পর্যন্ত ‘পদাতিক’র বহু সংস্করণ হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম এই বই ছাপা হচ্ছে। ‘লালন প্রকাশনী’র হাতযশে যদি ‘পদাতিক’ বাংলাদেশের ব্যাপকতম পাঠকমণ্ডলীর কাছে পৌঁছায়, তাহলে আমি যে খুশি হব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমি তখন এই ভেবে তৃপ্তি পাব যে, আমার কবিতা যেখান থেকে আমি কুড়িয়ে নিয়েছিলাম আবার সেইখানেই ছড়িয়ে দেওয়া গেল।’ বাংলাদেশের প্রতি তাঁর যে আকুলতা, হৃদয়জাত অকৃত্রিম পক্ষপাত, তা সহজে বোধগম্য হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির সহ-সভাপতি হয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালনের মাধ্য দিয়ে। নিজ রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব ফেলে তিনি ভিয়েতনাম থেকে ছুটে এসেছিলেন। লিখলেন, ‘চোখের সামনে জ্বলছে আমার প্রিয় জন্মভূমি, বাংলাদেশ। বাতাসে ভাসছে আমার ধর্ষিতবোনের চিৎকার–দু’আঙুলে কান চাপা দেই। বানের জলের মতো সর্বহারা মানুষ আসছে এপারে, প্রাণ নিয়ে সম্ভ্রম বাঁচাতে। কী লিখব আমি ভিয়েতনাম নিয়ে? আমার সামনে আর এক ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ।’ এমন কী নিজের রাজনৈতিক দলের অবস্থানের বিপক্ষে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

এ হেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শৈশব কেটেছে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামে। সে সময় চুয়াডাঙ্গা জেলার জয়রামপুর ও পার্শ্ববর্তি লোকনাথপুর গ্রাম দুটি একদিকে যেমন হিন্দুপ্রধান, অন্যদিকে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তির বাস ছিল। এখনও এ গ্রাম দুটিতে ধনাঢ্য ও জমিদার শ্রেণির হিন্দুদের আভিজাত্য ও জৌলুসের সৌকর্য্যময় ইতিহাসের ভগ্ন খন্ড ইতোস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুধু একটি পরিবারের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত ইতিহাস উল্লেখ করছি। তা থেকেই উপলব্ধি করা যায় এ গ্রামের এলিট শ্রেণির হিন্দু সম্প্রদায়ের আভিজাত্য। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিদি ও মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীর শ্বশুরবাড়ি এ জয়রামপুরে। স্বামী জমিদার জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালি নেতা। স্বর্ণকুমারী দেবী শুধু সু-সাহিত্যিকই ছিলেন না, বিখ্যাত ভারতী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে ১ম মহিলা ঔপন্যাসিক। তার মেয়ে সরলা দেবী নানাবাড়ি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেই লেখাপড়া করতেন। সরলা দেবীই ঠাকুর পরিবারের ১ম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। স্বর্ণদেবীর একমাত্র পুত্র সিভিলিয়ান জ্যোৎস্নানাথ ঘোষাল বিহারের রাজকন্যা সুকৃতি বালাকে বিয়ে করেন। বিয়েতে স্বশরীরে উপস্থিত না থাকলেও মহারাণী ভিক্টোরিয়া ও তার স্বামী যুবরাজ সপ্তম অ্যাডওয়ার্ড ৩ লাখ টাকার উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন।
কবির বাবা আবগারি বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। চাকুরীর বদলিজনিত কারণে সপরিবারে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করেছেন। সেই সূত্রে কবির কৈশর কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। এদেশের অসহায়, বঞ্চিত-নির্যাতিত প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবন তার শিশু ও কিশোর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তিতে যা তার সাহিত্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শিক্ষার জন্য কলকাতা যাত্রা। কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন, পরে স্কটিশ্চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে অনার্স নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। এমএ পড়ার সময় সক্রীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় ২ দফা কারাবাসও করেন। দেশ বিভাগেরর পর আর কখনই বাংলাদেশে আসেন নি কবি। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
জয়রামপুর গ্রামের বেশ কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন জয়রামপুরের মল্লিকপাড়ার ঘটু মোল্লা পৈত্রিকসুত্রে যে ২তলা বাড়িতে বসবাস করছেন, সেই বাড়িটি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক বা মুখোপাধ্যায়দের বাড়ি ছিল বলে গ্রামের অনেকেই শনাক্ত করেছেন। বাড়িটিতে ’৪৭ পরবর্তিতে ঘটু মোল্লার প্রয়াত বাপ হাজী লাল মোহাম্মদ প্রথম বসবাস শুরু করেন। ’৪৭ –এর দেশ ভাগের সময় এ গ্রাম ছেড়ে জমিদার ও ধনাঢ্য বহু হিন্দু সম্প্রদায় বাড়িঘর ও জমিজিরাত ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান। সে সময় অবস্থাপন্ন বহু মুসলমানের মত হাজী লাল মোহাম্মদও ভারতে পাটুলী থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের জয়রামপুরে চলে আসেন। বসবাস শুরু করেন মুখার্জীদের শূণ্য বাড়িতে। যেভাবে ভারত থেকে আসা অন্যান্য রিফিউজিরা এই গ্রাম থেকে চলে যাওয়া ধনাঢ্য হিন্দুদের প্রাসাদোপম বাড়িগুলিতে বসবাস শুরু করেন।
এ গ্রামের পার্শ্ববর্তি গ্রাম লোকনাথপুর। অনেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পিতৃবাস্তুভিটা লোকনাথপুর গ্রামে বলেও দাবি করেন। তবে এ দুটি গ্রাম ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা সুমিরদিয়া গ্রামেও কবির পুর্বপুরুষের অনেকের বংশধর বসবাস করতেন বলে জানা যায়। কাজী নজরুল ইসলামের বান্ধবী – কবি ও সাংবাদিক সাবিত্রী প্রসন্ন চট্রোপাধ্যায়, নজরুল সঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পী সোহরব হোসেনের বাড়িও এই লোকনাথপুর গ্রামে। এ গ্রামবাসির মধ্যে প্রায় সকলেই ’৪৭ –র পরে এ গ্রামে বসবাস শুরু করেছেন। তারা কেউই সুভাষ মুখোপাধ্যায় কিংবা তার বাবার নামও জানেন না।
জয়রামপুর গ্রামের মধ্যবয়সি যুবক আব্দুল্লাহ। তিনি ধর্মান্তরিত মুসলমান। আব্দুল্লাহ পেশায় মহুরী। তিনি দাবি করেছেন – তার ( আব্দুল্লাহ’র) দাদির মামা ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। দাদির নিকট কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনেক গল্প শুনেছেন তিনি। এখন তার দাদী জীবিত নেই। আব্দুল্লাহ অত্যন্ত জোর গলায় দাবি করেন লোকনাথপুর নয়, জয়রামপুরই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পিতৃপুরুষের গ্রাম।
জয়রামপুর-লোকনাথপুর গ্রাম দুটি ঘুরে ঘুরে দেখার সময় বার বার মনে পড়ছিল কবির চিরকুট কবিতাটি। “পেট জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে/ হুজুর, জেনে রাখুন/ খাজনা এবার মাপ না হলে/ জ্বলে উঠবে আগুন।” বারবার চোখের সামনে ভেসে আসছে – খদ্দরের পাঞ্জাবি-পায়জামা, ঝাঁকড়া চুল আর মোটা ফ্রেমের চশমার কাচ ঠিকরে বেরিয়ে আসা একজোড়া প্রতিভাদীপ্ত চোখের উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি।
“কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?”