সাম্প্রতিক

আগামীকাল থেকে কুষ্টিয়ায় শুরু হচ্ছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র স্মরনে দোল উৎসব

আগামীকাল বুধবার থেকে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে বাউল সাধক ফকির লালন শাহ এর স্মরনে তিন দিনের দোল পুর্ণিমার উৎসব। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় ও লালন একাডেমীর আয়োজনে এরই মধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বুধবার থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলবে শুক্রবার পর্যন্ত। এরইমধ্যে আখড়াবাড়িতে আসতে শুরু করেছেন লালন ভক্ত, অনুসারীরা। জীবদ্দশায় বাউল শিরোমনি লালন শাহ দোল পুর্ণিমার রাতে শিষ্যদের নিয়ে বসতেন সাধুসংঘে। তারই ধারাবাহিকতায় লালন শাহ এর তিরোধানের পরও কালীগঙ্গার ধারে প্রতি বছর দিবসটি ঘিরে পালিত হচ্ছে এ উৎসব। বাউল ফকির লালন শাহ্ এর জন্ম পরিচয়ের বিষয়ে নানা পন্ডিত গণের নানা মত রয়েছে। এবিষয়ে অসংখ্য গবেষক নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যালোচনা করেছেন। তবে এসবরে মধ্যে দু’টি ধারণার প্রাধান্য পাওয়া যায়। অন্যরা বলছেন, লালন জন্ম সূত্রে একজন মুসলমান এবং তার জন্ম স্থান বর্তমান ঝিনাইদাহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে। নানা প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে উঠা লালন তার গুরু সিরাজ সাঁই’য়ের কাছে ফকিরী দর্শন গ্রহণ করেন।

তবে এসব মতামতের মধ্যে নানা ভিন্নতা থাকলেও লালন ফকির তার সাধন ভজনের তীর্থস্থান হিসেবে ছেঁউড়িয়া গ্রামের আঁকড়া বাড়ির বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামের এই আঁকড়া বাড়িই ছিল প্রধান অবস্থান এবং এখানেই তিনি জীবনের শেষ প্রয়ান গ্রহণ করেন। সেখানে বর্তমানে লালন ভক্ত ও আগ্রহীদের ইচ্ছায়ই গড়ে উঠেছে লালন একাডেমী। এখানে লালন সমাধীস্থলকে স্মরণীয় করতে ১৯৬২সালে একটি সমাধী সৌধ নির্মিত হয়েছে। লালন ভক্ত, অনুসারী ও শিষ্যদের মতে, লালন তরুণ বয়সে রোগাক্রান্ত ও অচেতন অবস্থায় ছেঁউড়িয়া গ্রামের কালী গঙ্গার পূর্বপাশের্^ থাকতে দেখা যায়। ঐ গ্রামের মলম ফকিরের স্ত্রী মতিজান প্রথমে লালন’কে এঅবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি গ্রামের অন্যান্য লোকজনের সাহায্যে লালনকে উদ্ধার করে তার বাড়িতে এনে সেবা যতœ করেন। মলম কবিরাজ তিনি নিজেও লালন সাঁইয়ের অনুসারী হয়ে উঠেন এবং তার ঘরেরই লালন সাইয়ের সাতে পরিচিত হন। লালন গুরু সিরাজ সাই’য়ের কাছে দীক্ষা লাভ এবং লালনের কন্ঠে পবিত্র কোরআন শরীফের শুদ্ধ পাঠ শুনে মলম কবিরাজ, স্ত্রী মতিজানসহ আশপাশের পাড়া প্রতিবেশীরাও আশ্চর্য হয়ে যান এবং সকলেই লালনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। এই সময় লালান কোথাকার কে, কার সন্তান, কোথায় তার জন্ম, কি তার পরিচয় এ নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। কিন্তু এ প্রশ্নের জবাবে লালন ছিলেন নিশ্চুপ। এরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও লালন গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সিরাজ সাঁই’য়ের কাছে দীক্ষা লাভের পর মলম কবিরাজ তার ভূসম্পত্তির একটা অংশ লালনকে লিখে দেন। একই সাথে মলম কবিরাজের অনুরোধ ও গুরু সিরাজ সাঁই’য়ের নির্দেশক্রমে লালন এই ছেউড়িয়া গ্রামে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। কিছুদিন বসবাসের পর একদিন লালন ফকির একটি অল্প বয়সী মেয়েকে তার খানকায় (আঁখড়া বাড়িতে) আশ্রয় দেন এবং নিজ স্ত্রী রূপে পরচয় দান করেন। আখড়াবাড়ির সেই নারী সদস্যের নামই বিশাখা। লালন ফকির প্রতি বছর শতি কালে মহোৎসব করতেন, এবং সে উৎসবে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত আশেকান সাধু বাউল ফকিরেরা মিলিত হতো। ঐ উৎসবকে ঘিরে সেখানে বাউল গানের আসর হতো এবং লালন ও তার স্ত্রী পরিচয়ধারী বিশাখাও সেই জলসায় অংশ নিতেন। তবে সেসকল গানই মূলত: লালন নিজেই রচনা ও সুর সংযোজন করতেন যা পরবর্তীতে তার শিষ্য-অনুসারীরা রপ্ত করতেন।

যেহেতু লালনের জন্ম সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী সঠিক ভাবে সনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি। সেকারনে জীবদ্দশায় তিনি প্রকৃত পক্ষে কত বছর বেঁচে ছিলেন তার নির্নয় করা যায়নি। তবে তিনি যে একজন দীর্ঘায়ু ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে ছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই বলে তার শিষ্য-অনুসারীদের দেয়া তথ্যে জানা যায়। তৎকালীন সময়ে শিলাইদহের জমিদার জ্যেতিরিন্দ্রনাথ ২৩ শে বৈশাখ ১২৯৬ বাংলা, ৫ই মে ১৮৮৯ইং সালে পঞ্চবোটে রবীন্দ্রনাথ সহ পরিবারের অন্যান্যদেরকে সামনে চেয়ারে বসিয়ে লালন ফকিরের একটি স্কেচ তৈরী করেন।স্কেচটি রবীন্দ্র ভারতী সোসাইটিতে রক্ষিত আছে আজও। তার একটি ফটো কপিও শিল্পী সহিদ হোসেন কর্তৃক উক্ত স্কেচের একটি নকল লালন একাডেমীতে রক্ষিত আছে। আচার্য নন্দলাল বসু কর্তৃককৃত লালন ফকিরের স্কেচটি শ্রী শচীন্দ্রনাথ অধিকারীর নির্দেশে কাল্পনিক ভাবে অংকিত হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্কেচটি অংকনের এক বছর পর ১২৯৭ সালের ১লা কার্তিক শুক্রবার ইংরেজী ১৯৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর মৃত্যুবরন করেন লালন ফকির। তৎকালীন কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকারী নামক পাক্ষিক পত্রিকায় লালন ফকিরের তিরোধানের উপর ভিত্তি করে রচিত সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। ঐ সম্পাদকীয় লেখার বিবরণানুযায়ী মৃত্যুকালে লালনের বয়স হয়েছিল ১১৬বছর। লালন ফকির মৃত্যুকালের একমাস আগে থেকে পেটের অসুখে পীড়িত হন এবং হাতপায়ের গ্রন্থী জলস্ফীত হয়।পীড়িত অবস্থায় দুধ ভিন্ন অন্য কিছু খান নাই। তবে মাঝে মধ্যে কিঞ্চিত মাছ খেতে পছন্দ করতেন। লালন ফকির মৃত্যুর আগের রাতেও ভক্ত শিষ্যদের সাথে গান করেছেন এবং ভোর পাঁচটার দিকে তিনি সজ্ঞানে মৃত্যু বরণ করেন। লালন শাহ্ এর ইচ্ছা ও পূর্ব নির্ধারিত ঘরেই তাতে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুকালে তার নিকট প্রায় ২হাজার টাকা ছিল।ছেউড়িয়া’তে তার সমাধির পশ্চিম পাশের্^ মলম সাঁহের স্ত্রী মতিজানেরও সমাধি রয়েছে।লালন শাহ্র স্ত্রী বিশাখা স্বামীর মৃত্যুর পর বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং তিনি মৃত্যু বরণ করলে লালন শাহ্ এর সমাধীর দক্ষিণ পাশের্^ তাকে সমাধিস্থ করা হয়। লালন ফকির দীর্ঘ সময়কাল ধরে তার নিজস্ব আত্ম দর্শনের আলোকে ভক্ত আশেকান ও শিষ্যদের নিয়ে যে সব উৎসব মুখর কর্মকান্ড করতেন তারই ধারাবহিকতায় আজও পর্যন্ত দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভক্ত শিষ্য অনুসারীরা পালন করতে বছরের দুইটি দিন যথা দোল উৎসব এবং পহেলা কার্তিক সাঁইজির অন্তর্ধান দিবস পালন করতে মিলিত হয়ে থাকে। এসব উৎসবে লালনের সহা¯্রাধিক মানবাত্মার মুক্তির খোঁজে রেখে যাওয়া আধ্যাত্মিক গান গাওয়া হয়।