সাম্প্রতিক

আনন্দগঞ্জ থেকে আনন্দধাম হওয়ার ইতিহাস

রহমান মুকুলঃ “কী গাব আমি কী শুনাব আজি এ আনন্দধামে!” না, এ গানের সাথে আলমডাঙ্গার আনন্দধামের কোন মেলবন্ধন নেই। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় বিস্ময়াভিভূত বিশ্বকবি আকুল আবেগে গেয়েছিলেন এ সঙ্গীত। আনন্দধাম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেই সংক্রমিত। কারণ আনন্দধামের ইতিহাস“ সংখ্যা গণনার অতীত প্রত্যুষের ”না হলেও বেশ পুরনো, বর্ণিল ও সর্পিল। এ যেন জলদ-গম্ভীর ইতিহাসদূহিতা।
তখন আলমডাঙ্গা শহর কিংবা আশপাশে লোকালয়ের অস্তিত্ব ছিল না। আলমডাঙ্গা শহরের অস্তিত্বের বীজ বপণের শ’ শ’ বছর পূর্বের কথা। কুমার নদ ছিল তখন প্রবল প্রমত্ত। পূর্বে বক্সীপুর আর পশ্চিমে বর্তমান আলমডাঙ্গা শহর অবধি ছিল তার উন্মত্ত জলধির বিপুল বিস্তার। দুরান্তের বাণিজ্য জলযানের নিত্য চলাচল ছিল তার ঐশ্বর্যময় বুক চিরে। বেশি দিনের কথা নয়-আলমডাঙ্গা শহরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় গঙ্গাধর জালানও এই নদীপথে ব্যবসা করতেন। পাট পাঠাতেন সুদূর ইংল্যান্ডের ডান্ডিতে। ১৯ শতকের গোড়ার দিকে রেললাইন ও ’৫০-র দশকের গোড়ার দিকে জিকে ক্যানেল সৃষ্টির পর সেই রাজসিক কুমার নদ এখন শুধুই স্মৃতি জাগানিয়া ইরিগেশন খাল। ১৯৬০ সালের দিকে যখন গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কাজ চলছিল সে সময় অনেক শ্রমিক নদীর মাটি কাটতে গিয়ে পলির তলদেশ থেকে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম আমলের মুদ্রা পেয়েছিলেন। নদের তলদেশে একটু বেশি পরিমান পয়সা পাওয়াতে শ্রমিকরা মাটি খননে বেশি উৎসাহিত ছিলেন বলে জানা যায়। এ উত্তাল নদীপথের যাতায়াতকারিদের অসাবধানতাবশত হারিয়ে যাওয়া কিংবা দুর্ঘটনায় হারানো মুদ্রাগুলির অংশ হয়ত উদ্ধারকৃত এ মুদ্রাগুলি।
সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম আমলের এ মুদ্রাই মোঘল আমলের শেষ মুদ্রা। এ মুদ্রার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে মোঘল সম্রাটদের শেষ কয়েকজন বংশধরের উত্থান-পতন, সীমাহীন হটকারিতা, আর অবিশ্বাস্য বিশ্বাসঘাতকতা। ১৭৫৯ সালের শীতকাল, যখন বাংলা-বিহার আর উড়িষ্যার মসনদ পরোক্ষভাবে ইংরেজের করায়ত্ব। দিল্লীর সম্রাটের উজির বিশ্বাসঘাতক নবাব ইমাদুল মূলক সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলঙ্গীরকে হত্যা করে দিল্লীর মসনদ দখল করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের দৌহিত্র মোহাম্মদ আজিজ ওরফে সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর রঙ্গিলা সম্রাট নামে খ্যাত ছিলেন। একহাতে সুরা আর অন্যহাতে নারী- এমন শ্লোগান তৈরি হয়েছিল তাকে ঘিরে। বলা হতো সম্রাটের আদেশ হেরেমেও অচল। নিহত সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের বড় ছেলে মির্জা আব্দুল্লাহ আলি গহর দ্বিতীয় শাহ আলম (মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের সপ্তদশ উত্তরাধিকারি) দিল্লীর মসনদ ছেড়ে অযোধ্যায় পালিয়ে যান। সেখানে গিয়ে নিজেকে দিল্লীর সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম বলে ঘোষণা করেন। ভেবেছিলেন- বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের কোন লোকপ্রিয়তা নেই, সহজেই হয়ত ইংরেজদের বদ্যান্যতা পেয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদে বসতে পারবেন। কিন্তু শেয়ালচালাক ক্লাইভ তাকে সন্তষ্ট করেননি। বরং দিল্লীর মসনদের উত্তরাধিকারি হিসেবে মহামহিম দ্বিতীয় শাহ আলমকে মাত্র ১ হাজার পাউন্ড দিয়ে বিদায় করেন। তারপরও সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ইংরেজদের বদান্যতাই থাকতে চেয়েছিলেন। পরে বাৎসরিক মাত্র ২৪ লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি মীর কাশিমকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে ঘোষনা দেন। তিনি ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদ চুক্তিমতে বার্ষিক ২৬ লাখ টাকায় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের দেওয়ানি প্রদান করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। এই অবিবেচক সম্রাটের সাথে পুনরায় প্রতারণা করে ইংরেজ। ১৭৭১ সালে ওয়ারেন হেস্টন দেওয়ানি চুক্তি বাতিল করেন। রাজ্য বিক্রি করে খাওয়া এই নরাধম সম্রাট পরে হারানো মোঘল সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার অভিলাষে পুনরায় দিল্লী গমন করেন। দিল্লী তখন মারাঠা আর জাঠদের দখলে। তারা সম্রাট দ্বিতীয় আলমকে মসনদ ছেড়ে দিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের পরামর্শে তিনি তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে পুনরায় ইংরেজদের নিরাপত্তায় নিজেকে সমর্পন করেন। এ সুযোগে ইংরেজরা তাকে ৬ মাস গৃহবন্দি করে রাখে। ১৭৮৮ সালে আব্দুল কাদের নামের এক আফগান তার চোখ উৎপাটন করে অন্ধ করে দেয়। ১৮০৫ সালে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে দ্বিতীয় আকবর শাহ এবং তার মৃত্যুর পর তার পুত্র বাহাদুর শাহ জাফর দিল্লীর বাদশাহ হন। তিনিই শেষ মোঘল বাদশা। আধ্যাত্ম সাধক এই বাদশা খুব ভাল কবিতা লিখতেন। গজল ও মুশায়েরা নিয়েই তিনি বন্দি জীবন কাটাতেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ায় তিনি ভারতবর্ষের সার্বভৌমত্ব- বীরত্বের প্রতিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছেন। অবর্ণনীয়কষ্টে অতিবাহিত হয় তার নির্বাসিত জীবন। সিপাহী বিদ্রোহের অভিযোগে ইংরেজরা তাকে ৮৩ বছর বয়সে রেঙ্গুণে নির্বাসন দেয়। এ নির্বাসন নিয়েও তিনি গজল লিখেছেন ”কী দুর্ভাগ্য জাফরের!/ যে জমিন সে ভালবাসত/ সেই জমিনে তার সমাধির জন্য / ২ গজ জায়গা হলনা।“ রেঙ্গুণে ইংরেজ ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিডের গ্যারেজের ছোট ঘরের পাটের দড়ির খাটে তাকে শুতে দেওয়া হত। এখানে নির্বাসিত অবস্থায় ১৮৬২ সালে তিনি পৃথিবীর মায়া পরিত্যাগ করেন। ভারতবর্ষের মানুষের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় বাদশার মৃত্যুর সংবাদ ইংরেজ গোপন করেছিল। তার কবর বাশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল। বিদ্রোহের ভয়ে ইংরেজ এ কান্ড ঘটিয়েছিল। যাতে খুব সহজেই কবরের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু বিলীন হতে দেয়নি ভারতীয়রা। ১৯০৩ সালে তার সমাধি পুনরায় আবিস্কার করা হয়। এ শেষ মোঘল সম্রাটের একটি কবিতার ২ টি ছত্র উল্লেখের লোভ সংবরণ সম্ভব হল না- “চার দিনের আয়ু নিয়ে এসেছিলাম।/ দু’টি কাটল প্রত্যাশায় আর দু’টি অপেক্ষায়।” বাহাদুর শাহ’র মৃত্যুর পর ইতিহাস থেকে সত্যিকারের স্বর্ণোজ্জ্বল রাজসিক মোঘল শাসনের ও সাম্রাজের যবনিকাপাত ঘটে।
বলছিলাম – শেষ মোঘল বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরের দাদা সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কথা। তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ভারতবর্ষের অনারারি সম্রাট হিসেবেই বিবেচিত হতেন। সমস্ত রাজ্যের নবাব ও সুবেদাররা তার নামে মুদ্রাঙ্কন ও খুৎবা পাঠ করতেন।
মোঘল আমলে আলমডাঙ্গার এ কুমার নদেরও ছিল রাজকীয় সৌষ্ঠব। বড় বড় সওদাগরের বাণিজ্যতরীর তোড়ে কুল ভাঙ্গত তার ঢেউ। মোঘল সাম্রাজের শেষ মুহুর্তেও ছিল তার সে রাজসিক চেহারা। কুমার নদে জিকে ক্যানেল তৈরির সময় মাটি খুঁড়ে উদ্ধারকৃত সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মুদ্রাঙ্কিত পয়সাগুলিই তার প্রমাণ বহন করে। এ পুরাতন মুদ্রাগুলি উদ্ধার এখন দুরূহ হয়ে পড়েছে।
এ প্রমত্ত কুমার নদের বুকে জলযানের বণিক, মাঝিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ, যারা দুর-দুরান্ত থেকে আসছেন; যাচ্ছেন। বেশ কিছু দিন নদের বুকে অতিবাহিত করেছেন। সে অবসন্নরা নৌকা তীরে ভিড়াতেন। উঠতেন নদের তীরে অবস্থিত এ আনন্দধামে। এখানকার আবহাওয়া তাদের খুব পছন্দের ছিল। তাদের অনেকে কয়েকদিন অতিবাহিত করতেন এখানে। অবসর নিতেন। আনন্দ-গীতে আবারও প্রাণবন্ত করে নিতেন নিজেদের।
তখন এ স্থানের নাম আনন্দধাম ছিল না। ছিল আনন্দগঞ্জ। ব্রিটিশ শাসনামলের একেবারে প্রথমদিকেও এ আনন্দগঞ্জ নামের অস্তিত্ব ছিল। এ অঞ্চলে জমির দলিলপত্রে স্থানটির নাম পরিচয় লেখা হত এভাবে- “পরগনে গোপিনাথপুর ওরফে ডাউকীর সামিন মৌজে ওরফে আনন্দগঞ্জ ওরফে আলমডাঙ্গা।” আলমডাঙ্গার আঞ্চলিক ইতিহাস সন্ধিৎসু প্রবীণ শিক্ষক আফিল উদ্দীন স্বয়ং আলমডাঙ্গা শহরের প্রয়াত সমাজসেবক জমজম মিয়ার জমির পুরাতন দলিল-দস্তাবেজ থেকী এমন তথ্য দেখেছেন বলে দাবি করেন।
প্রবীণ অনেকেই বলতেন- আনন্দধামের নদের পাশে এখন যে কালীমন্দির রয়েছে,কয়েক শ বছর অগে সেখানে তখনও কালীমন্দির ছিল। বর্তমানে জীবিত প্রবীণরাও সে কালীমন্দিরের ধংসাবশেষ দেখেছেন বলে জানা যায়। তবে সেই কালীমন্দিরে দিগম্বর কাপালিকদের বসবাস ছিল। তারা নরবলি দিত। এরা তান্ত্রিক সন্যাসি। নরবলি দিত বলে এদেরকে মানুষ ভয় পেত। তৎকালীন আনন্দগঞ্জে এ দিগম্বর কাপালিকদের আধিপত্য ছিল বিস্তর।
অন্যদিকে, কুমার নদের তীরে অবস্থিত এ আনন্দগঞ্জে যারা ক্ষণস্থায়ী অতিথি হয়ে কয়েকদিন অবস্থান করে প্রাণ-মন জুড়িয়ে নিতেন, সে সকল মাঝি-মাল্লারের বেশিরভাগই ছিল বৈষ্ণব। বৈষ্ণবরা বিশ্বাস করে-জ্ঞান, প্রেম ও কর্ম –এই তিনটি বৃত্তি নিয়ে মানবসত্ত্বা গঠিত। পরমসত্ত্বা স্বয়ং সম্পূর্ণ। তার কোন অভাব নেই। তা নেই বলেই কর্মমার্গে ভগবৎ সাধনা বৃথা। জ্ঞানের পথেও সব সাধারণ মানুষের পক্ষে পারমার্থিক সত্তার সন্ধান লাভ সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রেমভক্তির কার্যকারিতায় সবচে’ বেশি। প্রেমভক্তির মাধ্যমেই সমীম মানুষের পক্ষে পরম লাভ সম্ভব। তাদের মতে প্রেমভক্তিই সত্যি। দেহের মাঝে প্রেমরুপ পরমতত্ত্ব লুকিয়ে থাকে। তবে তা অপ্রাকৃত অবস্থায়। মানবমানবীর প্রেমে তার বহিঃপ্রকাশ। বৈষ্ণবরা একান্তই প্রেমিক। এরা নতুনের উপাসক। এমন উদার ধর্মমনা বৈষ্ণবদের সাথে কাপালিকদের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে সংখ্যাগুরু বৈষ্ণবরা দিগম্বর কাপালিকদের কালীমন্দির ও আশপাশ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে। শুরু হয় বৈষ্ণবপন্থীদের মিলন মেলা। এখানে বৈষ্ণবরা ধর্মীয় নাটক, সংকীর্তন ও রাশলীলা করতেন। এ বৈষ্ণবদের মনের রাধাভাব জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে বিস্তৃণ এলাকার মানুষের মনে রসের তরঙ্গ লহরী তুলেছিল। তৎকালে এখানকার কোন রসিক বৈষ্ণবই হয়তো বৈষ্ণবদের অন্যান্য তীর্থস্থান গয়াধাম, কাশীধামের মত আনন্দগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে আনন্দধাম নামকরণ করেছে বলে ধারণা করা হয়। আঞ্চলিক ইতিহাস সন্ধিৎসু শ্রদ্ধেয় আফিল উদ্দীন স্যারও এ ধারণাটাই অধিক যৌক্তিক বলে মনে করেন।
১) অধুনা জিকে ক্যানেলরুপে বয়ে চলা কুমারনদের ক্ষীণধারা।
২) আনন্দধামের পুরাতন কালীমন্দির স্থলে নতুন কালীমন্দির।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না

x

Check Also

গাংনীতে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-’১৯ অনুষ্ঠিত

গাংনী প্রতিনিধিঃ ‘মাছ চাষে গড়বো দেশ,বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’এই প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে,বর্ণাঢ্য সড়ক র‌্যালী, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান,আলোচনা সভা ...