সাম্প্রতিক

মানুষ খুন করে মাগুর মাছকে খাওয়ানো সেই মিরু গ্রেফতার

লোকটাকে দেখে প্রথমে যে কারোরই মায়া হবে। হুইল চেয়ারে বসে সময় কাটে সারাক্ষণ। চলতে ফিরতে অন্যের সহায়তা লাগে। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ বছর ধরেই তিনি চলাফেরা করছেন হুইল চেয়ারে। অথচ হুইল চেয়ারে বসে থাকা এ ব্যক্তিই নিয়ন্ত্রণ করছে শিল্পাঞ্চল ফতুল্লার অপরাধ জগত। সন্ত্রাসীদের সাথে গোলাগুলিতে নিজে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নিজেই পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যা তিনি। তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় ৪টি হত্যা মামলাসহ ১৯ টি মামলা রয়েছে।

সুস্থ থাকাকালীন সময়ে তিনি নিজেই মানুষ খুন করতেন। মানুষ খুনের পর টুকরো টুকরো করে ফতুল্লা পাগলার পাশেই ওয়াসার লেগুনে (পুকুরে) লাশের টুকরো মাগুর মাছের খাবার হিসেবে ফেলে দিতেন। ফতুল্লার মানুষের কাছে মূর্তিমান এ আতংকের নাম মীর হোসেন মিরু।

তিনি ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারন সম্পাদক। রোববার রাতে কুতুবপুরের শাহীবাজার নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। সোমবার আদালতে তোলা হলে ৭ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ ।

হুইল চেয়ারে চলাফেরা করা মীরুকে কেন গ্রেফতার করলো পুলিশ এমন খোঁজ খবর নিতে ফতুল্লার কুতুবপুর শাহীবাজার এলাকায় সরেজমিনে গেলে স্থানীয় লোকজনের মুখে বেরিয়ে এসেছি মীরুকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এলাকাবাসীর বক্তব্য মীরু হহুই চেয়ারে বসেই নিয়ন্ত্রণ করতো অপরাধ জগত। তার একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। যাদের হুইল চেয়ারে বসেই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।

পুলিশ বলছে, রোববার দুপুরের দিকে ঢাকার গেন্ডারিয়া রেল স্টেশন থেকে কোহিনুর বেগম তার পরিবারের ৫ সদস্যসহ নারায়ণগঞ্জে আসার পথে মীরু বাহিনীর কবলে পড়ে। কোহিনুর বেগমের ৪ মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়েকে ইভটিজিং করা হয়। এসময় তার মেয়ের স্বামী সোহাগ ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করে পাগলা রেলস্টেশনে আসার পর মীরু বাহিনী তাদের উপর হামলা করে টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়। থানায় অভিযোগের পর পুলিশ মীরুকে গ্রেফতার করে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর কুতুবপুর ইউনিয়নে মীরুর লোকজন ডিস ব্যবসা, নিরীহ মানুষের জমি জবর দখলসহ নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে উঠেছিল বেশ কয়েকদিন ধরে। থানা পুলিশের কারো কথায় মাথা ঘামাননি মীরু। চালিয়ে যাচ্ছিল নানা রকম অপকর্ম। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ সম্প্রতি মীরুকে তার কার্যালয়ে ডেকে সাবধান করে দেন। পুলিশ সুপার তাকে ধমক দিয়ে বলেন, তোর নামে এতো অভিযোগ শুনি কেন?

স্থানীয় লোকজন জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফাজ্জলের হাত ধরেই মুলত মীরুর সন্ত্রাসী জগতে আগমন। তাদের মূলত কাজ ছিল মানুষ খুন করা। এছাড়া চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ হেন কোন অপরাধ নেই যা তারা করেনি। ২০০৯ সালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে দল নেতা তোফাজ্জল খুন হওয়ার পর তার শুন্যস্থান দখলে নেয় মীরু।

ফতুল্লা পুলিশের তালিকায় সে ১০ নং আসামী। তবে চলাফেরায় সমস্যা হওয়ার কারণে পুলিশও তাকে প্রথমে গ্রেফতার করতে ইতস্ত করতো। কিন্তু মীরুর অপরাধ কর্মকান্ড থেমে থাকতো না। জেলা আওয়ামী লীগের একধিক শীর্ষ নেতার প্রভাবে সে আরো বেপোরোয়া হয়ে উঠে।

স্থানীয় লোকজন জানান, মীরুর রয়েছে একটি প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে থেকে শুরু করে ভূমিদস্যুতা ও মাদক ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণকর্তা সে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা হিসেবেই পরিচিত মীর হোসেন মীরু। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। এরমধ্যে হত্যা, বিস্ফোরক, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক মামলা অন্যতম।

২০০৯ সালে সন্ত্রাসী তোফাজ্জলের মৃত্যুর পর এলাকার আধিপত্য বজায় রাখতে মুখোমুখি মীরু ও সজল বাবুর্চি বাহিনী। চলে তুমুল গোলাগুলি। এই গোলাগুলি চলাকালে একটা সময় বাবুর্চি বাহিনীর আক্রমণে পিছু হটতে শুরু করে মীরু বাহিনী। দলবল নিয়ে গুলি করতে করতে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিস্তলের গুলিতেই সে আহত হয়ে পরে পুঙ্গত্ববরণ করে নিতে হয় তাকে। সে ঘটনার পর থেকে সজল বাবুর্চির আর কোন খোঁজ মেলেনি।

রোববার গ্রেফতার হওয়ার আগে মীর হোসেন মীরুকে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গ্রেফতার করেছিলো ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। ঐ বছর ৭ অক্টোবর রাতে পাগলা রেলস্টেশন এলাকায় ৪ যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত ও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার ঘটনায় দায়ের করা মামলা তাকে গ্রেফতার করা হয়।

একই বছরের ৩ মার্চে মীরু বাহিনীর এক সদস্য হত্যা মামলার আসামীকে গ্রেফতার করে বিপাকে পড়েছিলো ফতুল্লা থানা পুলিশ। এদিন মীরু বাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে সেই সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

একই বছর ১০ ফেব্রুয়ারি শাহী বাজার এলাকায় ডিস ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ হলে ডিস ক্যাবল কর্মচারী শাজাহান নামে একজনকে প্রকাশ্যেই কুপিয়ে হত্যা করে মীরু বাহিনী। এ সংঘর্ষে আরও ৬ জনকে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহতও করে তারা। মীরুকে প্রধান আসামী করে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা হয়।

একই বছর ৫ জানুয়ারি মীরু বাহিনীর ৩ সন্ত্রাসীকে অস্ত্র, গুলি ও এক হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনা পুলিশ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানা অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি এবং সালাউদ্দিন হাওলাদার নামে এক ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনে আরও একটি মামলা করে।

২০১২ সালের ৩ নভেম্বর রাতে নিজ বাসা থেকে মীরু এবং তার সহযোগী ইকবালকে ৫ রাউন্ড গুলিভর্তি একটি পিস্তল ও ১৩ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব-১০। এঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় মীরুর বিরুদ্ধে দুইটি মামলা হয়।

২০১৩ সালের ১৪ অক্টোবর এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মীরু ও তার ক্যাডাররা ভাঙ্গাপুল এলাকায় গিয়ে জাকের পার্টি নেতা হোসেনের বাড়ির সামনে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

২০১৪ সালে মীরুর বিরুদ্ধে মিছিলে অংশ নেয়ার অপরাধে এই বছরের ২৮ এপ্রিল রাতে স্থানীয় দুই সহোদর আব্দুর রহমান ও সজলকে শাহী বাজার এলাকার একটি দোকান থেকে তুলে নিয়ে যায় মীরু বাহিনী। পরে তাদের এলোপাথাড়ি কুপিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সড়কের পাশে ফেলে রেখে যায়। এঘটনায় মামলা হলে মামলাটি তুলে নিতে মীরু তার শ্যালক আরিফ, শরিফ ও রিয়াজ, রাজিবসহ ১৫-২০ জনের একটি দল ওই বছরের ১২ মে রাত ১২টায় আব্দুর রহমান ও সজলদের বাড়িতে বোমা হামলা চালায় এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় আরও একটি মামলা দায়ের হয় মীরু ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে।

২০১৫ সালের ১০ জুন নূরুল হককে নামে এক ব্যবসায়ীকে তার মায়ের সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে এই সন্ত্রাসী বাহিনী। ফতুল্লা মডেল থানায় মীরুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়।  একই বছরের ১৯ মার্চ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোর অভিযোগে এক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী মীরুসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর দু’দিন আগে এক এএসসি পরীক্ষার্থীকে ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় এলাকাবাসীর উপর হামলা চালায় মীরু বাহিনী। এ হামলায় ২০ জন নিরীহ এলাকাবাসী আহত হয়।

ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) শাহ মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদের বলেন, সন্ত্রাসী যে দলের হোক, যত প্রভাবশালী হোক কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। মীরু গ্রেফতার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।