সাম্প্রতিক

সন্ত্রাস মোকাবেলায় কয়েকটি মৌলিক প্রস্তাব

গত ১ জুলাই কয়েকজন বিপথগামী শিক্ষিত তরুণ ছেলে গুলশানের হোলে আর্টিজান রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা করে নিরপরাধ মানুষের যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেটি ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে বিভিন্ন পত্রিকায় বহু ধরনের বক্তব্য দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট আজ সমাজের প্রতিটি পরিবার, সর্বস্তরের গণমানুষ ও পেশাজীবীদের উদ্বিগ্ন করেছে। ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা স্পষ্ট যে, বাঙালি জাতীয়তাবোধ এবং ইসলামি মূল্যবোধের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য ব্যাহত হলে সমাজে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়, যা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। নৃশংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের কী শিক্ষা হলো এবং কী করণীয় তার ওপর সামাজিক দায়বদ্ধতার তাগিদে, নিরপেক্ষভাবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই লেখাতে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

নিরপেক্ষতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা : দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কয়েকটি প্রস্তাব রাখছি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে। সত্তর দশকের শেষ দিকে যখন জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলাম, তখন বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ অর্থমন্ত্রী হওয়ার একটা সুযোগ পেয়েও গ্রহণ করিনি। পরে আবার যখন জেদ্দায় ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) অর্থনৈতিক গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলাম, তখনো একটি সুযোগ এসেছিল। সে দিন মন্ত্রী হলে হয়তো আজকে পাঠকের কাছে এই প্রস্তাবগুলো এত খোলাখুলিভাবে (নিরপেক্ষভাবে) উপস্থাপন করতে পারতাম না অথবা উপস্থাপন করতে পারলেও সেটা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হতো।
সুদীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি কর্মবহুল জীবনের মধ্যে প্রথম দিকে একটানা ৩৩ বছর বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় শিক্ষকতা, মুদ্রা, ব্যাংকিং, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, অর্থ ও রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরেছি। আমারও ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের করের টাকায় বৃত্তি পেয়ে লেখাপড়া শিখেছি। আজকে সমাজে যারা শিক্ষিত, যারা বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত আছেন, তারা সবাই আমার মতো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের দেয়া পরোক্ষ করের টাকায় লেখাপড়া করেছেন। বাংলাদেশে মোট করের প্রায় ৮৮ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকেই। সেটা আসে মূলত খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকে। তুলনামূলকভাবে যারা ধনী, তারা কর দেন না। আমাদের অর্থ ও রাজস্ব ব্যবস্থা দরিদ্রবিরোধী ও পশ্চাৎমুখী। আমরা সবাই সামাজিকভাবে ঋণগ্রস্ত (Social Loan Defaulter)। ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে আমাদের সবার দায়বদ্ধতা রয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার তাগিদেই আজকের এই লেখা।

বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও ইসলামি মূল্যবোধ- দু’টি অভিন্ন সত্তা : বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তা এবং তার ইসলামি মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে আজ থেকে ১১০ বছর আগে ১৯০৬ সালে ঢাকায় নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যিনি পাকিস্তানের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত, তখন পর্যন্ত তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেসের একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব। তিনি হিন্দু-মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ১৯১৩ সালে অর্থাৎ মুসলিম লীগ জন্ম নেয়ার সাত বছর পর মুসলিম লীগে যোগদান করেন। পাক-ভারত উপমহাদেশের বহু ঘটনার প্রেক্ষাপটে মুসলিম লীগ ব্রিটিশ শাসককে ‘ Divide and Quit India’ স্লোগানে বাধ্য করতে সমর্থ হয়েছিল। কংগ্রেস এই স্লোগানের চরম বিরোধিতা করে। তারা চেয়েছিল শুধু ‘Quit India’। এই ‘Divide and Quit India’ স্লোগানের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বহু জ্ঞানী, গুণী, ইতিহাসবিদ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। যিনি যেভাবেই করুন না কেন, পাক-ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের (Two Nation Theory) ভিত্তিতেই। মুসলমানদের একটি আলাদা, স্বয়ংসম্পূর্ণ ধর্ম, ইতিহাস ও কৃষ্টি রয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৪০ সালে শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক লাহোর রেজুলেশনের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে আসেন এবং বহু ঘটনা ও সংগ্রামের ইতিহাস পেরিয়ে অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার।

মুসলিম লীগের পতন : ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবোধের ওপর আঘাত করেছিলেন, তখন বাঙালি জাতি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে শুরু করে। জিন্নাহ কিন্তু ইসলামি মূল্যবোধে আঘাত করেননি, আঘাত করেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবোধের ওপর। এই আঘাত করে পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী শাসনও টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

৬ দফা আন্দোলন : ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ছিল বাঙালিদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জনের সংগ্রাম। এ সূত্র থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই ৬ দফার কোনো দফাতেই ইসলামবিরোধী কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো কথা ছিল না। পাঠকের সুবিধার জন্য অতি সংক্ষেপে দফাগুলো তুলে ধরা হলো- প্রথম দফা : ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারের বৈশিষ্ট্য হবে Federal বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; দ্বিতীয় দফা : কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে শুধু প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ। অবশিষ্ট সব বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে; তৃতীয় দফা : পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দু’টি পৃথক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময়যোগ্য; চতুর্থ দফা : সর্বপ্রকার রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। কেন্দ্রীয় তথা প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের জোগান আঞ্চলিক তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে; পঞ্চম দফা : বৈদেশিক বাণিজ্যের বিষয়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক বিধানের সুপারিশ করা হয়; ষষ্ঠ দফা : সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধাসামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।
বাম রাজনীতিতে ঢাকা পড়ে ১৯৭১ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত কী ঘটনা ঘটেছিল তা নতুন করে বলতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে চাই, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একজন প্রগতিশীল, পশ্চিমা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি কখনোই ইসলামকে হেয় করেননি। তিনিই প্রথম ঢাকার রেসকোর্সে ঘোড়দৌড় বন্ধ করেন। কোনো অফিসিয়াল অনুষ্ঠানে মদপান নিষিদ্ধ করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা রাখেন। Organization of Islamic Conference (OIC)-তে যোগ দেন। তাকে ইসলামবিরোধী বললে শুধু ভুল নয়, বরং অন্যায় হবে।
যিনি গণতন্ত্র ও ইসলামি মূল্যবোধের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, যার প্রতিটি কথার শেষে থাকত ‘ইনশাআল্লাহ’, তিনিই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন, যা একটা ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের জনগণ এ ব্যবস্থাকে মেনে নেয়নি। এর পর প্রায় একটানা ২০ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে ছিল।

পঞ্চদশ সংশোধনী, গণতন্ত্র ও ইসলামি মূল্যবোধ : ৩০ জুন ২০১১ ইং তারিখে সংবিধানে আনীত সংশোধনীতে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ইসলাম ধর্মকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ১৫তম সংশোধনীতে গণভোটের বিধানকে বাতিল করায় জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আঘাত এসেছে। এ রকম একটি সংশোধনী দেশের মানুষকে ভুল বার্তা দিচ্ছে, বিভ্রান্ত করছে। বাকশাল হবে কি না, একনায়কতন্ত্র হবে কি না এ রকম বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় আলোচনা চলছে। যা হোক, ওই সংশোধনীতে সরকারি দলের প্রয়োজনমতো আংশিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায় গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশকে একটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে।
ইসলাম একটি জীবন দর্শন (A Complete Code of Life) যা সব ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়ন বিলোপ করেছে। ইসলাম শুধু বাংলাদেশের নয়; বরং বিশ্বের ১.৬ বিলিয়ন মানুষের। তাই ইসলাম সম্পর্কে যেকোনো ব্যাখ্যা মুসলিম উম্মাহর Sharia Scholar-দের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া একান্তই কাম্য। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে [বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে)/পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে]। সংবিধানে এর আগে বাংলা অনুবাদ ছিল- ‘দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। তবে, এ ক্ষেত্রে ‘পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে কথাটিও যুক্ত করা হয়েছে। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আরবি বাক্যটির বাংলা কী হতে পারে তা নির্ধারণে মুসলিম উম্মাহর Sharia Scholar-দের সাহায্য গ্রহণ করলে ভালো হতো। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখে ১২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’। এখন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ কী করে হয়! বিষয়টি পরস্পর সাংঘর্ষিক। পঞ্চম সংশোধনীর আলোকে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ৮(১ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি।’ পঞ্চদশ সংশোধনীতে এ বিধানগুলো সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে ইতিহাসের ব্যর্থ মতবাদ ‘সমাজতন্ত্র’কে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আরবি বাক্যটিও অর্থহীন হয়ে পড়েছে। পঞ্চম সংশোধনীতে (২৫)(২) অনুচ্ছেদের আলোকে ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।’ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে এই অনুচ্ছেদ বাদ দেয়া হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রকে একটা বিরূপ বার্তা দিচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিষয়টি মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কাজ করবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। রেমিট্যান্সের বেশির ভাগ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আসছে। সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে সংবিধান সংশোধন করে সমস্যা ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এতে আমাদের উন্নয়নের জোয়ার ব্যাহত হচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল : সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের রায়ে বলা হয়েছে, ১০ম এবং ১১তম সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা সম্ভব। এ দুই মেয়াদের পর কিভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হবে, তা আলোচনা করে ঠিক করা যেতে পারে এবং ১০ বছর পর দেশের অবস্থা আরো পরিবর্তিত হতে পারে। সেখানে পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজতর হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল এখন মুখোমুখি অবস্থান করছে। এ সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি, অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে আস্থার সঙ্কট, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো অপরের ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। আমাদের মনে হচ্ছে, এখানে সেটার চরম ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প নেই। সঙ্ঘাত সঙ্ঘাতেরই সৃষ্টি করে। সুতরাং, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক চাষি- এদের শান্তির কথা মাথায় রাখলে নেতা যত বড়ই হোন, দেশের কল্যাণের তুলনায় তিনি অনেক ছোট। আওয়ামী লীগকে অহংবোধ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। হত্যা, গুম, নির্যাতন, হরতালের যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা অচিরেই শেষ হওয়া দরকার। দেশে যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে, মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তার খাতিরে তা নিরসন হওয়াও সময়ের দাবি।

৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও ইউপি নির্বাচন ২০১৬ : ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এ দেশের জনগণের জাতীয়তাবোধের ওপর আঘাত করেছে। ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নির্বাচন। এতে করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে এবং এটা দেশে গণ-অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে।

মহাসংলাপ ও সামাজিক চুক্তির উপাদান : আজ সংবিধানের ভারসাম্য ও পুনর্বিন্যাস, টেকসই নির্বাচনপদ্ধতি, রাজনৈতিক অধিকার ও কর্তব্য, জনগণের ক্ষমতায়নে গণভোটের পুনঃস্থাপন, পুলিশবাহিনীর ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, গণমাধ্যমের ক্ষমতার সীমারেখা, এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ তথা মুসলমানের অনুভূতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নীতিমালা প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জাতীয় একটা মহাসংলাপ এবং এগুলো নতুন সামাজিক চুক্তির উপাদানরূপে গণ্য হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারকেই আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। গণতন্ত্রে পরাজয় নেই; পরাজয় থেকে নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।

সংবিধানে ভারসাম্য : যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সংবিধানে ভারসাম্য দেখা যায়, সেখানে আমাদের সংবিধানে কোনো ভারসাম্য নেই। সংবিধানে ভারসাম্য না থাকায় কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার সৃষ্টি হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে জনগণের আকাক্সক্ষার সাথে মিল রেখে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়। আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী যেমন তার দলের প্রধান, সংসদীয় দলীয় প্রধানও বটে, তেমনি সরকারের নির্বাহী বিভাগেরও প্রধান। তিনি যেকোনো সময় যেকোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারেন। অপর দিকে রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতা নেই বললেই চলে। রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দিয়ে থাকেন, সেটিও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনেই তৈরি হয়। এ জন্য বর্তমান সংবিধানের কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা হ্রাস করার ভারসাম্য আনা জরুরি। বংলাদেশেও সংসদ ও সংবিধানের ক্ষমতা রক্ষায় দ্বিকক্ষীয় আইনসভা বা পার্লামেন্টের চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে, যেখানে একজন দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। আইনসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হতে হবে। ঢাকাকে ফেডারেল রাজধানী করে প্রয়োজনে চারটি বৃহত্তর বিভাগকে চারটি প্রদেশ বা প্রভিন্স করা যেতে পারে। এতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে; ঢাকার ওপর চাপ কমে যাবে; যোগাযোগ উন্নত হবে; অভ্যন্তরীণ অভিবাসন কমে যাবে; এটা পরিবেশবান্ধব হবে। ঢাকা ১৭২টি দেশের জরিপে বসবাসের দিক থেকে সবচেয়ে অযোগ্য শহর হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে। ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সংবিধান প্রণয়ন আমাদের দেশের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের ফসল। পরে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়। এ দিকে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক অধিকার ও দায়িত্বের বিষয় সুস্পষ্টভাবে আলোচিত হওয়া দরকার। সংবিধানে গণভোটকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি দেশের জনগণের স্বাধিকার আদায়ের কার্যকর হাতিয়ার হলো গণভোট। একমাত্র গণভোটের মাধ্যমেই একটি দেশের জনগণ জাতীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অভিমত প্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তাই জনগণের ক্ষমতায়নে গণভোটের পুনঃস্থাপন বিশেষ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পুলিশ কেন জনগণের বন্ধু হতে পারছে না : যৌথবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কার্যকলাপ নাগরিকদের চিন্তিত করে তুলছে। আজকে যারা সন্ত্রাসী, তারা তো আমাদেরই সন্তান। দায়ী কে? আমাদের সবাইকে এর দায়ভার নিতে হবে। এর মূলে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। এ জন্য পুলিশবাহিনীকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ধর্মীয় মৌলিক জ্ঞানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গণমাধ্যমকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের জোর প্রচেষ্টা চলছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সীমারেখা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ মুসলমান বা অন্য কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কোনো কাজ করা বা কথা বলা যাবে না। যেখানে ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে, সেখানে ইসলামি জীবন দর্শনের সাথে সঙ্গতি রেখে কেউ ইসলামি রাজনীতি করলে তাকে সাম্প্রদায়িকতা বলা যায় না। দুই নেত্রীই কথার সাথে সম্মানের সাথে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলেন। সংবিধানের মাধ্যমে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস হবে যাবতীয় কার্যাবলির ভিত্তি’ এই মূলনীতি দেশের ৯০ শতাংশ মুসলমানের ইসলামি জীবনদর্শনের সাথে জড়িত। এই মূলনীতি পুনরায় সংযোজন জাতীয় সংহতিকে আরো দৃঢ়তর করবে বলে মনে করি।

দুই নেত্রী : যদ্দুর জানি, দুই নেত্রীই দেশ ও জনগণের উন্নতি চান। তারা এমন একটি অবস্থানে আছেন, যেখানে দুই নেত্রীই জনগণের কল্যাণে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকতে পারেন। দুই নেত্রীর সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় ২৫ বছর। বিভিন্ন সময় দেশে আসার পর তাদের সাথে দেখাও হয়েছে। বাংলাদেশ আজ সার্বিকভাবে কঠিন সঙ্কটে নিমজ্জিত। তাই জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ব্যক্তিগত ইগো পরিত্যাগ করে নতুন প্রজন্মের জন্য রাজনীতি করতে দুই নেত্রীকে আহ্বান জানাই। দুই নেত্রী ব্যক্তিগত ইগো এবং ‘day to day’ রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে এই মর্মে দু’জনকে ঘোষণা দিতে হবে যে, তাদের কেউই আর নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হবেন না, তবে নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব দেবেন। তারা হবেন নতুন প্রজন্মের অভিভাবক। তাদের কথা ও পরামর্শ হবে নতুন প্রজন্মের দিকনির্দেশনা।

নৈতিকতার শিক্ষা : আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার প্রশিক্ষণের চরম ঘাটতি রয়েছে। মায়ের কোলই সন্তানের প্রথম স্কুল। এটাকে জোরদার করতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী পিতা-মাতাকে সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই আহ্বানকে অভিনন্দন জানাই। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কুশিক্ষা ও দুর্নীতির কারণ হয়ে পড়েছে। যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামি মূল্যবোধের প্রাধান্য থাকে না, সে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হওয়া যায় বটে, ভালো মানুষ হওয়া যায় না। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মানুষ বাধ্যবাধকতা নিয়ে জন্মায়, তাই তার দায়িত্বই নির্ধারণ করবে তার অধিকার। নতুন করে সামাজিক চুক্তির পুনর্লিখন করতে হবে। অর্থনৈতিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে উন্নয়নকে সামনে রেখে গণতন্ত্র নির্ধারণ করা ঠিক হবে না, তাতে জবাবদিহিতার ঘাটতি হয়, দুর্নীতি বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। বরং উন্নয়নকে টেকসই করতে প্রথমেই গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হবে। তাই জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।
১ জুলাই ২০১৬ গুলশানের হোলে আর্টিজানে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নিরাপত্তাবিষয়ক সেমিনারে ব্রিটিশ এমপিরা বলেছেন, ‘দেশে দীর্ঘদিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচনহীন শূন্যতার কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে।’ গত ১০ জুলাই ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট’ করার প্রতিবাদে এক আলোচনা সভায় জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ‘পঁচাত্তরের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে’- এ কথা বলে জনগণ ও সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তার এই বক্তব্য বর্তমান উদ্বিগ্ন সমাজের প্রেক্ষাপটে গভীর তাৎপর্য বহন করে। আজ দেশের গণমানুষের ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামি মূল্যবোধ- এ দুটোর মধ্যকার সমন্বয় প্রশ্নবিদ্ধ। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত এখনই মহাসংলাপের মাধ্যমে চলমান সঙ্কটের নিরসন করা। জনগণের এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : অর্থনীতির অধ্যাপক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল), ঢাকা, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), জেদ্দা

 

x

Check Also

মক্কায় আবারও নারী হজযাত্রীর মৃত্যু

পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে সৌদি আরবের মক্কায় ১৭ জুলাই কুলসুম বেগম (৬৯) নামে আরও ...