সাম্প্রতিক

রমজানে চোখের যত্ন

রোজা মুসলমানের জন্য একটি ফরজ কাজ। রোজা মানে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিয়ত করে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকা। এটির ব্যতিক্রম হলে রোজা ভঙ্গ হবে। তবে বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রোজা ভঙ্গ করার বিধান আছে, যা পরবর্তী সময় করে নিতে হয়। তাই পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তিÑ এ দুটি বিষয় গুরুত্বের বিবেচনায় রাখতে হয়। রোজাদার যখন অসুস্থ থাকেন, তখন ভিন্ন এক বাস্তবতার সম্মুখীন হন। যেমনÑ তাকে ওষুধ সেবন করতে হবে। জরুরি অপারেশনে যেতে হচ্ছে অথবা নিতে হচ্ছে কোনো ইনজেকশন। কি করবেন একজন রোজাদার? অবশ্যই তাকে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে। যেমনÑ রোজা আদৌ ভাঙে কিনা এবং ভঙ্গ হলে অত্যাবশ্যকীয় কিনা, অর্থাৎ পরবর্তী সময় একটার বদলে একটা রোজা করে নেওয়া যাবে কিনা। আরেকটি বিষয় হলোÑ রোজা ভঙ্গ না হলেও ত্রুটিযুক্ত হবে কিনা?

ওষুধ ব্যবহার : প্রথমেই উল্লেখ করা যায়, রোজার দিনে চোখে ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা বা রোজা ক্ষতিগ্রস্ত বা মাকরু হবে কিনা? কারণ চোখে ড্রপ দিলে গলায় যায়। অনেকেই মনে করতে পারেন, এতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। চোখের ড্রপে যেহেতু খাদ্য উপাদান নেই, তাই বিষয়টি পানাহারের মধ্যে পড়বে না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এতে রোজা ভঙ্গ না হলেও ত্রুটিপূর্ণ বা মাকরু হবে কিনা?

এখানে কয়েকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবেÑ চোখে ড্রপ ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয় কিনা? রোজা থাকা অবস্থায় ড্রপ দেওয়া পরিহার করা যায় কিনা? কারণ অনেক ড্রপ আছে, দিনে একবেলা বা দুবেলা দিলেই হয়। যদি সুযোগ থাকে, রোজা থাকা অবস্থায় ড্রপ পরিহার করা উত্তম। তবে চেষ্টার কমতি রাখা যাবে না।

ইনজেকশন : খাদ্যোপাদান হলে সে ইনজেকশন নেওয়া যাবে না। যদি খাদ্যোপাদান না থাকে, যেমনÑ অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যাভাস্টিন জাতীয় ইনজেকশন দিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। এ ক্ষেত্রেও খেয়াল করতে হবে, দিনে অর্থাৎ রোজা অবস্থায় পরিহার করা। যদি এমন হয়, তাৎক্ষণিকভাবে ইনজেকশন না দিলে চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তবে এমনভাবে দিতে হবে, যেন রক্তক্ষরণ না হয় অথবা রোজা ভেঙে পরবর্তীকালে রোজাটি করে নিতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনে ইনজেকশন দিতে হলে, যেমনÑ চোখের ফান্ডাস ফ্লোরেসেন্স এনজিওগ্রাম করতে হলে এক ধরনের ডাই রক্তনালিতে পুশ করতে হয়। যদিও এতে কোনো খাদ্যোপাদান নেই, তবু দিনের বেলা না করাই উত্তম। শিরায় ইনজেকশন পুশ করার সময় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া অনেক সময় উক্ত ডাইয়ের হাইপার সেনসিটিভিটি রিয়েকশন প্রতিরোধে আরও একাধিক ইনজেকশন এমনকি খাদ্যোপাদান সংবলিত স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোজা ভঙ্গ হবে।

অপারেশনের প্রয়োজনে করণীয় : চোখের অনেক অপারেশন আছে, যেখানে রক্তপাত হওয়ার আশঙ্কা নেই। যেমনÑ আরগন লেসার ট্রেবিকুলোপ্লাষ্টি, লাসিক, ইযাগ লেসার ক্যাপসুলোটমি ইত্যাদি। এতে রোজা নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। রুটিন অপারেশন, যেমনÑ ছানি বা ডিসিআর বা গ্লুকোমা সার্জারি পরিহার করতে হবে। তবে আধুনিক পদ্ধতিতে রক্তপাতহীন ছানি অপারেশন সম্ভব। তবে যেহেতু শরীরের ভেতরের জলীয় অংশ এবং অন্যান্য টিস্যু শরীর থেকে বের হয়ে আসে, তাই এতে রোজা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জরুরি অপারেশন, যেমনÑ ফেকোলাইটিক গ্লুকোমা বা কোনো ইনজুরির ঘটনা হলে রোজা ভেঙে পরবর্তীকালে রোজাটি করে নিতে হবে। কর্নিয়া সংযোজন একটি বিশেষ ধরনের অপারেশন। অনেক সময় কর্নিয়াপ্রাপ্তির ৬ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন করতে হয়। নইলে কর্নিয়ার গুণ নষ্ট হয়ে যায়। এ অপারেশনটি জরুরি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন

প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল