সাম্প্রতিক

আমরা সবাই মুক্তমনা

 মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত রায়কে হত্যার পর আজ আমরা ঘোষণা করতে চাই যে, স্বভাব, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় দিক থেকে আমরা সকল বাংলাদেশিরাই মুক্তমনা বা স্বাধীন চিন্তক।

হত্যাকাণ্ড মাত্রই খারাপ এবং তীব্রভাবে নিন্দনীয়। কিন্তু চিন্তা, মূল্যবোধ এবং ধারণাগত ভিন্নতার কারণে হত্যাকাণ্ড আরো জঘন্য কুকর্ম। আমাদের সভ্যতার সকল অর্জন, সকল মানবিক মূল্যবোধ, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষার সকল অর্জন, আধুনিক সংস্কৃতি যা লালন করে তার সব কিছুর বিরুদ্ধেই এই হত্যাকাণ্ড। এমনকি ইসলামের সার্বিক মানবিকতা এবং সহনশীলতা আমাদের যা কিছু শিক্ষা দেয় তার সব কিছুর বিরুদ্ধেও এই হত্যাকাণ্ড।

আর বিশেষত আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যেসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধ করেছেন ও জীবন দিয়েছেন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সামষ্টিকভাবে যা কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে তার সব কিছুর বিরুদ্ধেই এই হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মন, মানবিক সম্ভাবনাগুলোর বিকাশ, ভালোবাসতে পারার এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও আবিষ্কারের সহজাত সক্ষমতার বিরুদ্ধে। এই হত্যাকাণ্ড সৃষ্টিশীলতা নামক মানবিক গুনের বিরুদ্ধে।

আমাদের উচিৎ ঐক্যবদ্ধভাবে অভিজিতের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানো এবং সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে সমাজের সর্বব্যাপী এর বিরুদ্ধে গভীর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

অভিজিৎ একজন বিদ্বান মানুষ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তিনি ছিলেন এমন একজন স্বাধীন চিন্তক যিনি আমরা বাংলাদেশিরাসহ সমগ্র মানবতা দৈনন্দিন যেসব মৌলিক দার্শনিক, সামাজিক ও অস্তিত্ব সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহের মুখোমুখি হই সেসব নিয়ে বিতর্ক করতেন।

তিনি ধর্মীয় গোঁড়া মতবাদসমূহে বিশ্বাস করতেন না। এ কারণে সব জায়গায় এবং সবকিছুতেই তিনি সেসবের বিরুদ্ধে বিতর্ক করতেন। তার ব্লগের লেখালেখি থেকেও এটা স্পষ্ট যে, সব ধরণের পূর্বানুমান, ঘৃণা, কালিমালেপন এবং এমনকি ধর্মীয় চরমপন্থাসহ সকল ধরণের মানবিক চেতনাকেই একঘরে করে রাখার বিরুদ্ধে তার একটি দার্শণিক অবস্থান ছিল। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল এসবের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা করা। তিনি সবসময় মানব মন ও চেতনার সর্বোৎকৃষ্ট গুনাবলী অর্জনের চেষ্টায় রত ছিলেন।

সূতরাং এমন একজন ব্যক্তিকে যখন হত্যা করা হয় তখন মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের উচিৎ এই ঘটনাকে আমাদের জাতীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা।

এ ক্ষেত্রে দুটি ইস্যুতে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে আমাদের সংবিধানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আর দ্বিতীয়ত, হত্যাকাণ্ডের নায্যতা প্রমাণের জন্য পবিত্র কোরআন ও আমাদের নবী করিম (সা.) এর দীক্ষার বিকৃতি প্রতিরোধ করা। কারণ এ ধরণের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। অভিজিতের হত্যাকাণ্ড থেকেই প্রমাণিত হয়, আমাদের দেশের ধর্মীয় চরমপন্থীরা নিখাঁদ বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়েও নূন্যতম সংলাপ বা তর্ক-বিতর্কের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।

যে শান্তি ও সহনশীলতা ইসলামের অন্তর্গত মূল্যবোধ হিসেবে বিরাজমান তারও বিকৃতি ঘটাচ্ছে এই চরমপন্থীরা। সত্যিকার ইসলাম বিশ্বাসীদের উচিৎ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ও কঠোর লড়াই করা। মুসলিম হিসেবে আমাদের সকলের পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদেরও উচিৎ এই প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

আমি এবং আমার পত্রিকা বর্তমান সরকারের চরমপন্থাবিরোধী অবস্থানকে সবসময়ই সমর্থন করে এসেছি। আমরা বিশ্বাস করি যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার চরমপন্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে সবচেয়ে কঠোর ও সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতিশীল।

চরমপন্থার বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থানের ক্ষেত্রেও সরকারের ভুমিকা স্পষ্ট ও দ্ব্যার্থহীন। তবে দোষীদের ধরা ও শাস্তি দিয়ে ওই নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের রেকর্ড খুবই দুর্বল। এর ফলে এক ধরণের দায়মুক্তির মানসিকতার জন্ম হয়েছে যার দায়ভার কর্তৃপক্ষের উপরই বর্তায়।

তবে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে, এই ঘটনায় দায়ীদের ধরে অবশ্যই ন্যায়বিচারের আওতায় আনা হবে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হল অভিজিতের খুনী ও ধর্মীয় চরমপন্থীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করা এবং তর্কবিতর্কের ব্যাপারে যে অসহনশীলতা লালন করে তার মোকাবেলা করা। অভিজিতের হত্যাকারীরা সাংগঠনিকভাবে যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তারা বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর চিন্তা ভাবনাই লালন করে। এরা ভিন্ন মতের মানুষকে হত্যা করা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না।

আর এখানেই আমাদের আসল লড়াই। এই লড়াইয়ে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে শামিল হতে হবে। এই গোষ্ঠীগুলোকে একঘরে করে রাখা এবং ধ্বংস করার পাশাপাশি এদের বিরুদ্ধে কঠোর আদর্শিক সংগ্রামও জারি রাখতে হবে।

আমরা মনে করি জনগনের সঙ্গে সরাসরি চিন্তার সংযোগ স্থাপন এবং দ্বারে দ্বারে গিয়ে সহজবোধ্য ও সুচিন্তিত প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষদেরকে এসব চরমপন্থীদের খপ্পরে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। জনগনকে বুঝাতে হবে যে, তারা ইসলাম ও নবীর বানীর ভুল ব্যাখ্যা করছে।

তবে এটাও সত্য যে, ধর্মীয় চরমপন্থীরা আমাদের শিক্ষিত যুব সমাজের একটি অংশের মাঝেও ঢুকে পড়ছে। এই তরুণ পুরুষ ও নারীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং এর মাধ্যমে সরাসরি বৈশ্বিক চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়। স্পষ্টতই আমরা চাইলেই এদের নজরদারিতে রাখতে পারি এবং অবশ্যই তা করা উচিৎ। কতটা কার্যকারীতা, বিরামহীনতা এবং কতটা ব্যাপক পরিসরে এই নজরদারি করা সম্ভব তা একমাত্র কর্তৃপক্ষই ভালো জানে।

কিন্তু এর পাশাপাশি চরমপন্থার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে উপরে প্রস্তাবিত দেশের জনগোষ্ঠীর তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সর্বব্যাপী প্রচারণা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যাপারেও আমরা জোর আহবান জানাই। আমার জানা মতে এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে এমন কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

x

Check Also

নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আ. লীগ লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে : ভারতীয় কূটনীতিক

মোঃ মিজানুর রহমান (সহঃ বার্তা সম্পাদক): বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী দক্ষিণ এশিয়া ...