সাম্প্রতিক

আন্দোলনের সুবিধাভোগী স্মার্ট পুলিশ

মেজর অব. মো. আখতারুজ্জামান
এক মাসের বেশি সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু সরকার এখনো বিএনপির আন্দোলন ঠেকাতে পারছে না। জনজীবনের ভোগান্তি প্রতিদিনই বাড়ছে। আন্দোলনের মুখে দেশে সরকার আছে কি না তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। সরকার ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রকে আন্দোলনের ভয়ে পুলিশি রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছে। সারা দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠায়।
দিনের বেলায় মানুষ পেট্রল বোমার ভয়ে রাস্তায় বেরোতে সাহস পায় না। আবার রাতে পুলিশের ভয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজ ঘরে ঘুমাতে পারে না। সারা দেশে দিনে-রাতে কোনো নিরাপত্তা নেই। সরকার বিএনপির আন্দোলন ঠেকানোর নামে সারা দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। সরকার বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল বানিয়ে রাজনীতি থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করে দেওয়ার ভ্রান্ত রাজনৈতিক কৌশল নিতে গিয়ে নিজেই অস্তিত্বের ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। সারা দেশে সন্ত্রাস ছড়িয়ে বিএনপিকে ঘায়েল করতে গিয়ে সরকার নিজেই এখন পুলিশের জালে আটকে গেছে।
আন্দোলনের সুবিধাভোগী স্মার্ট পুলিশ

সারা দেশে পুলিশি রাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে। পুলিশ কাউকে মানছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ  নেই পুলিশের ওপর। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পুলিশের ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সারা দেশে পুলিশ চলছে তার আপন খেয়ালখুশিতে। এ যেন একটি নতুন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন যে, তার নিজের স্রষ্টাকেই ধ্বংস করতে চাচ্ছে! সরকারের কাছে প্রিয় হতে গিয়ে পুলিশ সবাইকে রাষ্ট্রের কাছে দোষী বানাচ্ছে। অতি সম্প্রতি পুলিশের মনগড়া সন্ত্রাসীদের জামিনের ব্যাপারে বিচার বিভাগকেও আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
পুলিশের মতে, বিচার বিভাগ নাকি নির্বিচারে জামিন দিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে পুলিশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ (!) ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সরকার ইতিমধ্যেই পুলিশকে দায়মুক্তি দিয়ে দিয়েছে। এখন যদি চলমান ও ক্রমবৃদ্ধিমান সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করার মহান প্রচেষ্টায় বিচার করার দায়িত্বটিও করিৎকর্মা পুলিশ ভাইদের হাতে দিয়ে দেওয়া যায় তা হলে তো কেল্লা ফতে।
১৯৭৪ সালে দেশে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের শিকার কারা হয়েছিল তা নিশ্চয় এ দেশের রাজনীতিবিদদের ভুলে গেলে বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে না। এরশাদ সরকারকে রক্ষা করার জন্য সেদিন তারা জেলা পুলিশকে ডিসির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার ভুয়োদর্শন আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার কথা নয়।
বিএনপির আমলের সন্ত্রাস দমন আইন করে সন্ত্রাস কতটুকু দমন হয়েছিল সে চিত্রও আমাদের মানসপট থেকে এখনও বিলীন হয়ে যায়নি। তাই নতুন করে পুলিশ সুপারকে জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি এবং সর্বশেষে আন্দোলনের সহিংসতার সুযোগে বিচার করার ক্ষমতাটিও পেয়ে গেলে মন্দ হয় না! রাষ্ট্র তখন পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে নিজেদের সুবিধা মতো রাজনৈতিক শক্তি বা দল দিয়ে রাষ্ট্রটি চালানো যাবে!
রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার জন্য সবসময়ই অন্ধ থাকে। তাই কায়েমি স্বার্থবাদীরা রাজনীতিবিদদের সর্বদা ব্যবহার করে থাকে। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার এহেন কাজ নেই যা করতে পারে না। ক্ষমতায় যাওয়ার পরে টিকে থাকতে ও চিরস্থায়ী হতে তারা শয়তানের সঙ্গে দোস্তি করতেও পিছপা হয় না।
বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা ও দেশের চলমান সংকট পুলিশের তৈরি। পুলিশ সরকারকে কাল্পনিক চিত্র  ‘আরব বসন্ত’ স্টাইলে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার নামে সরকার পতনের ডাক দিয়ে লাগাতার অবস্থান করে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবে এই অজুহাতে ৫ জানুয়ারি ২০১৫ জনসভা করতে না দিয়ে বর্তমান আন্দোলনকে দানা বাঁধতে সুযোগ করে দিয়েছে।
তার পর আন্দোলনের শুরু থেকেই পুলিশের হম্বিতম্বি ও আস্ফালন আন্দোলনকে গতি যুগিয়েছে। বিএনপিকে যদি জনসভা করতে দেওয়া হতো তাহলে ‘আরব বসন্ত’ স্টাইলে আন্দোলন হলেও সে আন্দোলন তিন দিনের বেশি টিকতে পারত না। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলে জনসভায় আগত সাধারণ মানুষ কখনই উগ্র হয় না।
কারণ দলের কর্মীরা চরিত্রগতভাবে শান্তিপ্রিয় সাধারণ জনগণকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে আসে। এই ধরনের জনসভায় অন্য দলের এমনকি সরকারি দলের লোকজনও থাকে।  কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে জনসমাবেশ হয় তা সব সময়ই বিপজ্জনক, যাদেরকে বন্দুকের গুলি দিয়ে ঠেকানো যায় না। হয়ত ৫ তারিখের জনসভা নিয়ে বিএনপির আগ্রহ অনেক বেশি ছিল কিন্তু জনসভা থেকে সরকার পতনের মতো আন্দোলন গড়ে তোলার সাংগঠনিক অবস্থা বিএনপির ছিল না যা অনুধাবন করা তেমন কোনো বুদ্ধিমত্তার বিষয় নয়।
যদি থাকত তাহলে সরকারের পেটোয়া পুলিশবাহিনী যে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল তার সদ্ব্যবহার বিএনপি ইতিমধ্যেই করে ফেলতে পারত বলে অনেকের ধারণা।
বর্তমান আন্দোলন যতটা রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে পুলিশের এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। এবারের আন্দোলনটা শুরু হয়েছে গাজীপুরের পুলিশের এসপির ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে। যদি এসপি তার অবৈধ ক্ষমতাবলে ছাত্রলীগকে মাঠে নামিয়ে বিএনপির জনসভা ভন্ডুল না করাতো তাহলে রাজনৈতিক চিত্রপট অবশ্যই ভিন্ন হতো এবং এতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণহানি হতো না বলেই অনেকে বিশ্বাস করে।
জনগণ ইচ্ছায় হোক অথবা অনিচ্ছায় হোক বর্তমান সরকারকে পাঁচ বছরের জন্য মেনেই নিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিল বলে অনেকে মনে করে।
সরকার এখন সম্পূর্ণভাবে পুলিশের কব্জায়। সরকারের একশভাগ আস্থা বর্তমান সহিংসতা নির্মূলে পুলিশ সম্পূর্ণভাবে সক্ষম। তাই সরকার চলমান সন্ত্রাস দমনে নতুন কোনো আইন করার প্রয়োজনীয়তা মনে করছে না।
৫৫ জন নিরীহ মানুষের  মৃত্যুর পরেও চলমান সহিংসতা জরুরি আইন ঘোষণার জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। আন্দোলনের শুরুতেই পুলিশকে দায়মুক্তি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের বিচারিক ক্ষমতা ও জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বটুকু এসপি সাহেবকে দিয়ে দিলেই সকল আন্দোলনের পরিসমাপ্তি হয়ে যাবে বলে সরকার যেমন মনে করছে তেমনি আন্দোলনকারী ২০ দলের  ভেতরের পুলিশ বন্ধুরাও মনে করছে।
অনেকেই বলছেন, এর আলামত ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ এখন পেট্রল বোমা বানাতে ব্যস্ত ছাত্রলীগের ছেলেদের ধরতে শুরু করেছে।
পুলিশে নতুন আইজি এবং র‌্যাবে নতুন ডিজি দেওয়া হয়েছে। দুজনই চৌকস দায়িত্বশীল পেশাদার পুলিশ কর্মকতা এবং স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে শতভাগ সক্ষম। আমার মতো সবাই বিশ্বাস করে এবার পুলিশে পরিবর্তন আসবে। পুলিশের আর্থিক দীনতা দূর হবে। দুর্জনেরা বলে বেড়ায় থানায় গেলে নাকি টাকা লাগে। বিষয়টি সত্যি হলেও পুলিশের কি দোষ! সরকার থানায় কাগজ কলম দেয় না, গাড়ির তেল খরচ দেয় না, আসামি ধরে আনলে আদালতে চালান দিতে যাতায়াত খরচ দেয় না, আসামি পাঠানোর খরচ দেয় না, আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করার জন্য কোনো অর্থ দেওয়া হয় না, আদালতে সাক্ষী দিতে গেলে কোন টিএ/ডিএ পাওয়া যায় না, থানায় খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা থাকে না, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর মতো গ্রামগঞ্জের থানাগুলোতে ভালো কোনো স্কুল-কলেজ নেই, স্ত্রীদের আনন্দ বিলাশের কোনো সুযোগ নেই তাই ঢাকায় বাসা ভাড়া করে অথবা নিজেদের প্রাসাদে ঢাকার মান বজায় রেখে পরিবার-পরিজনকে রাখতে হয়, চাকরি ঠিক রাখার জন্য ছোট-বড় স্যারদের, তাদের বিবিদের, সরকারি দলের পাতি নেতাদেরও নিয়মিত সালাম ও সালামি দিতে হয়, নিলামে পদ, পদবী, থানা ইত্যাদি কিনতে হয়,  জনপ্রতিনিধি-মন্ত্রী-এমপিদের চলাচলে জনগণের কাছ থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য না খেয়ে নিজের তেলে গাড়ি বা মোটর সাইকেলে ওনাদের পিছনে কুত্তার মতো দৌড়াতে হয়, না হলে রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জনগণের সামনে নির্লজ্জের মতো মানুষের দ্বারে বসে থেকে আসার সময় ওই কাজের খাওয়া বা তেল খরচ আদায় করার জন্য তাদের চেয়ে কম অপরাধীদের ধরে থানায় নিয়ে যেতে হয় যা দেখে জনগণ পুলিশকে গালি দেয়, রাত- বিরাতে রাস্তায় টহলের নামে পুলিশি টোল আদায় করতে হয়, তাছাড়া পুলিশে ভর্তির সময় বিশাল সালামি না দিলে তো ভর্তিই হওয়া যায় না।
পুলিশ যা করে তা নিজেদের অর্থায়নেই করে। পুলিশ তো অর্থের জন্য সরকারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করে বা জনগণের টাকায়ও চলে না। পুলিশ নিজেদের খরচ নিজেরাই আয় করে নেয় যেমন সবাই করে।
এখন দেশে আন্দোলন চলছে। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার আন্দোলন। এই সফলতা নির্ভর করছে পুলিশের ওপর। পুলিশ যেদিকে যাবে আন্দোলনের সফলতা তো সেদিকেই যাবে। পুলিশকে তো রাজনীতিবিদরাই স্মার্ট বানিয়েছে। পুলিশকেই বোমা মারা শিখাতে হয় আবার বোমা মারাকারীদের পুলিশকেই ধরতে হয় যা রাজনীতির মারপ্যাঁচ।
একবার সালাম দিতে হয় আবার বালির বস্তা দিয়ে আটকাতে হয়, না হলে মরিচ মেরে ঘরে ঢুকাতে হয় কিন্তু পুলিশকে কিছু করার ক্ষমতা ওই রাজনীতিবিদদের থাকে না! তার পরও ক্ষমতালোভী দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের শিক্ষা হয় না।
লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য

– See more at: http://www.dhakatimes24.com/2015/02/10/53381/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A7%80-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9F-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6#sthash.XIxcgjrN.dpuf

x

Check Also

নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আ. লীগ লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে : ভারতীয় কূটনীতিক

মোঃ মিজানুর রহমান (সহঃ বার্তা সম্পাদক): বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী দক্ষিণ এশিয়া ...