সাম্প্রতিক

ইসলামের দৃষ্টিতে শবে মিরাজ

শরিয়তের পরিভাষায় মক্কার মসজিদে হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রে ভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলা হয়। আবার সেখান থেকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ ও আরশ পর্যন্ত ভ্রমণকে বলা হয় মিরাজ। মহান আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) সশরীরে এই অলৌকিক ভ্রমণ করেন।

মিরাজের ঘটনা কখন সংঘটিত হয়েছিলো এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে শুধু এতটুকুই পাওয়া যায় যে, মিরাজের ঘটনা হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু মাস, দিন ও তারিখের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল নেই। যদিও সাধারণ জনগণের মাঝে প্রসিদ্ধ হলো, রজব মাসের ২৭ তম তারিখে সংঘটিত হয়েছে।

ওয়াকেদি লেখেন, মিরাজের ঘটনা রবিউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখ রাতে হয়েছে। হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) লেখেন, ‘ইমাম যুহরি ও উরওয়ার বক্তব্য (মিরাজের ঘটনা হিজরতের এক বছর পূর্বে হয়েছে) অনুযায়ী মিরাজের ঘটনার মাস হয় রবিউল আউয়াল।’ ইমাম ইবনে আসিরসহ একদল আলেম এ মতকেই অকাট্য বলেছেন।

আল্লামা ইবনু আবদিল বার (রহ.) আবু ইসহাক থেকে বর্ণনা করেন, রবিউল আউয়াল মাসের সাতাশতম রাতে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) সাহাবি হজরত জাবের ও ইবনে আব্বাস (রা.) এর এ বক্তব্য উল্লেখ করেন যে— ‘রাসুল (সা.) হাতির বছর রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। এদিন তিনি নবুওয়তপ্রাপ্ত হন আর এদিনই মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়। একই দিন তিনি হিজরত করেন আর এদিনেই তার ইন্তেকাল হয়।’

আরেকটি প্রসিদ্ধ মত হলো, রজবের সাতাশতম রাতে মিরাজ হয়েছে। হাফেয আবদুল গনি মাকদিসি তার সিরাত গ্রন্থে এ মত অবলম্বন করেছেন। তিনি এর সপক্ষে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, তবে এর সনদ সঠিক নয়।

ইবনে দিহয়া বলেন, ‘কিছু বক্তা ও গল্পকার বলে থাকেন যে, মিরাজের ঘটনা রজবের সাতাশ তারিখ হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ভুল।’ 

শায়খ তারহুনি মিরাজের সময় সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো গবেষণা করে এ ফলাফল বের করেছেন যে, মিরাজ হয়েছে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তম রাতে।

ড. আবু শাহবা লেখেন, ‘অধিকাংশ আলেম ও গবেষকের মতামত এটাই যে, মিরাজের ঘটনা রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছে।’ এরপর তিনি এ সংক্রান্ত আরো কিছু মতামত উল্লেখ করে বলেন, ‘গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণার পর আমার কাছে এ মতই সঠিক মনে হচ্ছে যে, মিরাজের ঘটনা রবিউল আউয়াল মাসের ১২ বা ১৭ তম রাতে হয়েছে।

রজবের সাতাশতম রাত বহু লোক মিরাজের রাত হিসেবে পালন করে থাকে। এ রাতে বিভিন্ন স্থানে চেরাগ জ্বালানো হয়, বিশেষ অনুষ্ঠান হয়, জিকিরের মাহফিল হয়, গুরুত্বের সঙ্গে অনেক ইবাদত করা হয়। সাতাশ রজব দিনের বেলা রোজা রাখা হয়, মিছিল বের হয়, ব্যাপক আতশবাজি হয় এবং এ ধরনের আরো অনেক মনগড়া ও ভিত্তিহীন আমল করা হয়ে থাকে। এ সকল কাজের ফজিলত বর্ণনা করতে কিছু জাল হাদিসের সাহায্য নেওয়া হয়।

রজবের সাতাশতম রাতকে মিরাজের রাত হিসেবে পালন করা কোনোমতেই জায়েজ নেই। প্রথমত এ কারণে যে, ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এ রাতে মিরাজ হয়েছিল কি না তাতে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত, রসম-রেওয়াজ হিসেবে মিরাজের রাত পালন করা এবং ইবাদতের জন্য এ রাতকে নির্দিষ্ট করা বিদআত।

শায়খ মুহাম্মাদ আমিন শানকিতি (রহ.) লেখেন, ‘জনসাধারণ রজবের সাতাশতম রাতে মিরাজের রাত হিসেবে যা কিছু করে থাকে, তা ভিত্তিহীন ও বিদআত। একে বিদআত বলার কারণ হলো, রাসুল (সা.) এমন কিছু করেননি এবং করতে আদেশও দেননি। খুলাফায়ে রাশেদিনও এমন কিছু করেননি। আর রাসুল (সা.) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের অনুসরণের মধ্যেই সমস্ত কল্যাণ ও হেদায়াত রয়েছে। তাছাড়া কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত নয় যে, রজব মাসেই মিরাজ সংঘটিত হয়েছে।

আরেকটি মনগড়া আমল হলো, কিছু লোক রজবের প্রথম শুক্রবারকে মিরাজের রাত সাব্যস্ত করেছে এবং সে রাতে একটি নামাজও আবিষ্কার করেছে। এর নাম দিয়েছে তারা ‘সালাতুর রাগায়েব’।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘সালাতুর রাগায়েবের কোনো ভিত্তি নেই, এটা বিদআত। এই মনগড়া নামাজ জামাতে পড়াও জায়েজ নেই, একা পড়াও নাজায়েজ।

বাস্তবতা হলো, রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাতের মিরাজের রাত হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। এমনিভাবে উল্লিখিত নামাজেরও কোনো ভিত্তি নেই। রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে উক্ত নামাজ প্রমাণিত নয়। এটা একটা বিদআত বৈ নয়, পরবর্তী যুগের লোকেরা যা আবিষ্কার করেছে।

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘এ নামাজ নিন্দনীয়, বর্জনীয় ও নিকৃষ্ট বিদআত।’

হাফেজ ইবনুল কাইয়িম (রহ.) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর সূত্রে লেখেন, ‘মিরাজের রাতের মাস-তারিখের ব্যাপারে কোনো দলিল পাওয়া যায় না। এ সংক্রান্ত সব বর্ণনা ভিত্তিহীন ও সনদবিচ্ছিন্ন। একটি বর্ণনাও এমন নেই, যাকে সহিহ বলা যায়। মিরাজের রাতকে বিশেষ কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা মুসলমানদের জন্য বৈধ নয়। অনেক খুঁজেও এমন কোনো বড় মানুষ পাওয়া যায়নি, যিনি মিরাজের রাতকে অন্যান্য রাত, যেমন- শবে কদর ইত্যাদির উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ শবে মিরাজকে কোনো আমলের জন্য খাস করতেন না। এর কোনো আলোচনাও করতেন না। এ কারণে সঠিকভাবে জানাও যায় না যে, শবে মিরাজ আসলে কোন রাত। মিরাজ যদিও রাসুল (সা.) এর অনেক বড় একটি মুজিজা ও মর্যাদা, তা সত্ত্বেও মিরাজের রাতকে নির্দিষ্ট ইবাদতের জন্য খাস করা জায়েয নয়।’ (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪র্থ খণ্ড)