সাম্প্রতিক

বিএনপি প্রস্তুত আ.লীগের দুর্গে আঘাত হানতে

বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে উঠেছে। পাশাপাশি মনোনয়ন লাভের আশায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেন্দ্রে লবিং অব্যাহত রেখেছেন। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার ক্ষমতাসীন দলের ৬ এবং বিএনপি, জাপা ও সিপিবির ১ জন করে প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

বটিয়াঘাটার ৭টি এবং দাকোপ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে খুলনা-১ আসন গঠিত। এ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য একাধিক তরুণ প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের এ দুর্গে বিএনপির একক প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত হলেও আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হচ্ছে হাফ ডজন নেতার নাম। দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ চাপা কোন্দল। আর এই কোন্দলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের দুর্গে আঘাত হানতে চায় বিএনপি। অভিজ্ঞজনের অভিমত, আওয়ামী লীগ উপযুক্ত প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হলে বিএনপি প্রার্থীর ভোটে বিজয়ী হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

এক সময়ে হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এটি আওয়ামী লীগের ‘রিজার্ভ’ আসন নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে সে চিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রধান দলগুলো ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করায় স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আবুল হোসেন নির্বচিত হন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রফুল্ল কুমার শীল, ১৯৮৬ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে নিজেদের কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এ আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে মনোনয়ন পান শেখ হারুনুর রশীদ। দলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে পঞ্চানন বিশ্বাস ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় দল তাকে বহিষ্কার করে। পরে বিজয়ী হলে আবার তাকে দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পঞ্চানন বিশ্বাস নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মন্ডল ৫২ হাজার ৩৮১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার ৮০১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আমীর এজাজ খান পেয়েছিলেন ৬৮ হাজার ৪২০ ভোট। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পঞ্চানন বিশ্বাস বিজয়ী হন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে সেই হিসাব এখন বদলে গেছে। সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী দুই উপজেলা মিলে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭২ হাজার ৫৩৯ জন। ভোটারের মধ্যে দাকোপে মোট ১ লাখ ২৮ হাজর ৮০৮ জনের মধ্যে ৬০ হাজার ৩শ’ ভোট হিন্দু, ৫০ হাজার ১শ’ মুসলিম এবং অবশিষ্ট ২৫ হাজর খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মানুসারী। বটিয়াঘাটায় মোট ভোটার ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫ জন। তার মধ্যে ৯২ হাজার মুসলিম ও ৪১ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছেন। অন্যান্য ধর্মের ভোটার রয়েছেন চার হাজার। সব মিলিয়ে বটিয়াঘাটায় ৪০ হাজার ৮শ’ মুসলিম ভোটার বেশি।

আওয়ামী লীগের ৬ সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন, বর্তমান সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পঞ্চানন বিশ্বাস, দুই বারের সাবেক এমপি বর্তমান খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ, বটিয়াঘাটার উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আশরাফুল আলম খান, দাকোপের দুবারের উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ শেখ আবুল হোসেন, সাবেক এমপি বিগত নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ননী গোপাল মন্ডল এবং বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা খুলনা সদর থানার উপদেষ্টা শ্রীমন্ত অধিকারী রাহুল।

অপরদিকে গত দুবারের বিএনপি দলীয় প্রার্থী খুলনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমির এজাজ খান এবার দলের একক প্রার্থী হতে যাচ্ছেন বলে দলটির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া আলোচনায় আছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দলীয় চেয়ারম্যানের প্রেস এন্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি সুনীল শুভ রায় এবং সিপিবির অ্যাডভোকেট রুহুল আমীন।

বিগত নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক এমপি ননী গোপাল মন্ডল দলে ফিরে এলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ তাকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে তিনি বর্তমান কমিটির বাইরে থাকা দলের নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে আছেন। নৌকার সঠিক প্রার্থী নির্ধারণ এবং বিভক্ত দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজে লাগাতে পারলে অনায়াসে বিজয় সম্ভব হবে এমন ধারণা সাধারণ ভোটারদের। অন্যদিকে বিগত দুটি নির্বাচনে বিএনপি ধারাবাহিক ভোট বৃদ্ধির মাধ্যমে নৌকার সঙ্গে ধানের শীষের ভোটের ব্যবধান কমিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। ২০০১ সালে আমির এজাজ খান ৪৮ হাজার এবং ২০০৮ সালে ৬৮ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। এবার নৌকার সঙ্গে ধানের শীষের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে বর্তমান সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস জানান, তিনি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৪ সালে এই আসনে নির্বাচিত হন। তাকে আবারো মনোনয়ন দেয়া হবে বলে তিনি আশাবাদী। কারণ, তার বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মী বা এলাকাবাসীর কোনো অভিযোগ নেই।

তিনি বলেন, এবার অনেকেই মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তদবির করছেন। দলীয় সভানেত্রী যাকে যোগ্য মনে করবেন, তাকেই মনোনয়ন দেবেন। তার সিদ্ধান্তের প্রতি তিনি আস্থাশীল।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ বলেন, দলের দুঃসময়ে অন্য নেতারা যখন এলাকায় অনুপস্থিত ছিলেন তখন তিনি নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখনো নেতাকর্মীদের পাশেই আছেন। দলের নেতাকর্মীসহ দাকোপ-বটিয়াঘাটা এলাকার সাধারণ মানুষ তাকে খুলনা-১ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। এ ছাড়া জেলার অন্য ৩টি আসনের নেতাকর্মীরাও তাকে প্রার্থী হতে বলছেন। দলীয় সভানেত্রী তাকে যে আসনে মনোনয়ন দেবেন তিনি সেখানেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। আর যদি তাকে মনোনয়ন না দিয়ে অন্য কাউকে দেয়া হয় তাহলে তার পক্ষেই তিনি কাজ করবেন বলে জানান।

বটিয়াঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম খান বলেন, অনেকেই আছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই তারাও সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করতে চান। এজন্য এ আসনে সঠিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে হবে।

সাবেক এমপি ননী গোপাল মন্ডল বলেন, বিগত নির্বাচনে আমি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যে কারণে ওই সময়ে যে সব কমিটি হয়েছে তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এ অঞ্চলের অনেক কাজ বাকি আছে সেগুলো আমি করতে পারব।

বিএনপির আমীর এজাজ খান বলেন, নির্বাচনী এলাকায় সভা-সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বাধা দেন। সে কারণে এলাকায় ঠিকমতো ঢুকতে পারেন না। তবে তার কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এই আসনটিতে আগে হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি ছিল। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশ বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যা অতীতের রেকর্ড ভেঙ্গে গেছে। যার প্রমাণ বিগত দু’টি নির্বাচলে ধানের শীষের ভোট বেড়েছে।

জাতীয় পার্টির সুনীল শুভ রায় জানান, দলের পক্ষ থেকে এই আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে জোট হলে আমিই এ আসনে প্রার্থী হবো বলে আশা করছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না