সাম্প্রতিক

পয়সা, প্রথা এবং প্রতিষ্ঠানকে তোয়াক্কা করতেন না সক্রেটিস

লালন ফকির প্রাচ্যের সক্রেটিস। পয়সা, প্রথা এবং প্রতিষ্ঠানকে তোয়াক্কা করতেন না সক্রেটিস। সক্রেটিসের অপরাধ, তিনি বলতেন, আমি শুধু এইটুকু জানি যে, আমি কিছুই জানি না। তাঁর এই বিনয়োক্তিকে দম্ভোক্তি ভেবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। শায়েস্তা করতে এথেন্সের জুরিবোর্ড হেমলক পান করতে বাধ্য করেছিলেন তাঁকে। লালন ফকিরের হেনস্তা হওয়ার দশা সক্রেটিসের মতোই। সমকালীন প্রতিষ্ঠানবাদীরা কতভাবেই না হেনস্তা করেছে তাঁকে। বিষোদ্গার করেছে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত হয়েছেন। কে তিনি? উত্তরে লালন বলেছেন, তিনি মানুষ। উত্তর মনঃপুত হয়নি প্রতিষ্ঠানবাদীদের। প্রতিষ্ঠানবাদীদের দাবি, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, পার্সি, সুফি, শৈব, নাথ, যোগী, বামাচারী… এর একটা কিছু তাঁকে হতেই হবে। প্রশ্নাঘাতে বিরক্ত লালন স্বগতোক্তির মতো উচ্চারণ করলেন, লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে। সম্ভবত জাত বিষয়ক প্রশ্নের এটাই তাঁর উত্তর। একই সঙ্গে প্রতিবাদও। প্রতিবাদ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রতি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ জাতপাত ভেদাভেদের বিরুদ্ধে। শত বছরের বেশি সময় ধরে  এই বেবুঝ দুনিয়াকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন মানুষের পরিচয়, মানুষ। কিন্তু কানার হাট বাজারের কানা এবং প্রতিষ্ঠানবাদীরা তা মানবে কেন? পুরোহিত, মোল্ল­া, শাস্ত্রকার, তন্ত্র, মন্ত্র, যপ, তপ, ব্রত, উপবাস, তীর্থ ভ্রমণ, টিকি, পৈতা, তিলক, পালক, গঙ্গাজল, রুদ্রাক্ষ, সবকিছু থেকে লালন নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন সচেতনভাবে। যেকারণে এসবের ইজারাদাররা জীবিতকালে তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। রেহাই পাননি মৃত্যুর পরও। জাতপাত, ধর্ম, জন্ম উত্স নিয়ে জীবদ্দশায় বিব্রত হয়েছেন। মুক্তি মেলেনি মৃত্যুতেও। প্রতিষ্ঠান এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধীদের জন্য পৃথিবীর পুরস্কার এমনি হয়। লালন লিখেছেন, ‘জাতের ফাত্না ডুবিয়েছি সাত বাজারে’। জাতপাত বিরোধী এর চেয়ে পরিষ্কার বিবৃতি এর আগে পরে আর কেউ দেননি। না প্রাচ্যে, না পাশ্চাত্যে। গরিব, অবহেলিত, সহজিয়া বৈষ্ণব বাউল ফকিরদের কণ্ঠস্বর ছিলেন লালন। কারণ তাদের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। সমাজের উঁচু মহলে তাদের কণ্ঠস্বর পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল না। ছিল অন্ত্যজ শ্রেণির প্রতি অন্যায় অবিচার আর মানুষে মানুষে ভেদাভেদ। লালন ঘৃণা করেছিলেন এই ভেদ জ্ঞান।

 

লালনের এই অভেদ জ্ঞান সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ শ্রেণি এতোই অপছন্দ করতো যে তাঁর দলে তারা কেউ যোগ দেননি। লালনও তা চাননি। আমৃত্যু অন্ত্যজ শ্রেণির পক্ষে কথা বলেছেন। তারাই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। হালফিল অবশ্য লালন হয়ে উঠেছেন রপ্তানিযোগ্য পণ্য। সুবিধাবাদী তথাকথিত বহু শিল্পী রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার জন্য লালনকে ব্যবহার করছেন শর্টকাট সিঁড়ি হিসেবে। বাজারে এমপিফোর প্লে­য়ার, ই-সি­পস আর ইউটিউবে লালনের গান যতরকম বিকৃত করেছে চামবাজ শিল্পীরা আর কারো ক্ষেত্রে এমন ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ সুরক্ষিত আছেন মুদ্রিত স্বরলিপির মাধ্যমে। বহুদিন পর্যন্ত সুরক্ষিত ছিলেন বিশ্বভারতীর মাধ্যমে। নজরুল একই গানের ভিন্ন ভিন্ন সুর করার অনুমোদন দিতেন বিভিন্ন সুরকারকে। তারপরও নজরুলের অনেক গানের আদি স্বরলিপি অনেকখানি বিকৃতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে নজরুল ইন্সটিটিউটসহ নজরুল কেন্দ্রিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। লালনের হয়ে কে কাজ করবে? লালন তো চিরদিনই গরিব মানুষের। গরিব মানুষদের কোনোদিনই ক্ষমতা ছিল না, এখনো নেই। তারপরও লালনের গানই মানুষের প্রাণের সবচেয়ে কাছের গান হয়ে আছে।

 

দশম থেকে অষ্টাদশ শতক এই আটশ’ বছর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জয়দেব, চন্ডিদাস, বিদ্যাপতি, কীর্তিবাস, কাশীরাম, মুকুন্দরাম, আলাওল, রামপ্রসাদ, ভারতচন্দ্র এবং আরো অনেকে মিলে মানুষের পক্ষে যতটুকু বলেছেন, লালন একাই বলেছেন তার চেয়ে বেশি। হয়তো জীবদ্দশায় লালন রামপ্রসাদ সেন অথবা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু মৃত্যুর পর দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। কোথায় রামপ্রসাদ সেন, কোথায় কমলাকান্ত ভট্টাচার্য? বইয়ের পাতা ছাড়া তাঁদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু লালন আছেন। বইয়ের পাতায় যতখানি আছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি আছেন মানুষের মনে, মানুষের প্রাণে। লালনেরও ঠিক এই একই দর্শনের একাধিক গান আছে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে গীতিচর্চা না জায়েজ ফতোয়া দেওয়া হলে এই মানুষদের একজন লালনশিষ্য দুদ্দুশাহ লেখেন, গান করিলে যদি অপরাধ হয়/কোরআন মজিদ কেন ভিন্ন এলহানে গায়/ রাগ রাগিনী সুর/ রাগিনী বলিয়া মশহুর/ আরবী ফার্সি সকল ভাষায় গজল, মর্সিয়া সিদ্ধ হয়/ নবীজি যখন মদিনা যায়/ দফ বাজায়ে মদিনায় নেয়/ বেহেশতে তো সুর না জায়েজ নয়/ দুনিয়ায় কেন সুর হারাম হয়। সব ধর্মের বিশ্বাসীদের প্রতি সংশয়বাদী লালন, সব ধর্মমত সম্পর্কে যেসব গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে একেবারে একিলিসের গোড়া বিদ্ধ করেছিলেন। আর সেসব প্রশ্নের উত্তর কারো জানা ছিল না বলেই লালনের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিলেন ক্ষমতাবান শ্রেণি। দুর্ভাগ্য, একইভাবে প্রশ্ন উত্থাপনকারী লালনের শিষ্যদেরও, সেই পরম্পরায় কোনো না কোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর হাতে হেনস্তা হতে হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না