সাম্প্রতিক

নগ্ন ক্ষমতার বিরুদ্ধে নগ্ন প্রতিবাদ

৭ জানুয়ারি সকালে দিল্লির হাড়কাঁপানো শীতে নগ্ন হয়ে একদল তরুণ ছুটেছিল পার্লামেন্টের দিকে। উদ্দেশ্য নাগরিকত্ব বিলের সংশোধনী রুখে দেওয়া। খবর বলছে, সংশোধিত নাগরিকত্ব বিলের বিরোধিতা করে ওই দিন নয়াদিল্লির সংসদ ভবনের লাগোয়া বিনয় চকের কাছে নগ্ন প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন অসম কৃষক মুক্তিসংগ্রাম সমিতির জনা দশেক সদস্য। পুলিশ অবশ্য তাঁদের বেশি দূর এগোতে দেয়নি। চটজলদি তাঁদের সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে সরিয়ে নিয়ে যায় আর কাপড় পরতে বাধ্য করে।

বলা দরকার, এই প্রতিবাদীদের আপত্তি এখানেই যে তাঁরা হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) তালিকায় বাদ পড়া সবার নাগরিকত্ব বাতিল হোক, তা চান। কিন্তু বিজেপি চায়, কেবল মুসলমানরাই বাদ পড়ুক।

প্রায় একই সময় উত্তর আসামের শিল্পশহর তিনশুখিয়ায় অসম যুব ছাত্র পরিষদ নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে নগ্ন মিছিল করে। পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে, গত নভেম্বরে এই শহরের কাছেই আসামের বাংলাভাষী পাঁচজন হিন্দু কৃষককে সন্ধ্যা রাতে গুলি করে মারে কথিত দুষ্কৃতকারীরা। আসামের দ্বিতীয় প্রধান ভাষা বাংলা হলেও বাংলায় কথা বলা সব মানুষকে আসামের উগ্রবাদীরা বাংলাদেশের অভিবাসী বলে মনে করে এবং তাদের সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে আসাম ছাড়তে বাধ্য করতে চায়। এদের বেশির ভাগ সনাতন ধর্মের অনুসারী হলেও মুসলমান বাংলাভাষী অসমিয়ার সংখ্যা একেবারে কম না। দুই ধর্মের মানুষদের আলাদা করার জন্য তাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে ফায়দা লোটার জন্য এই নতুন সংশোধনীর আয়োজন বলে অনেকের ধারণা। সংশোধনীতে আফগানিস্তানসহ ভারতের প্রতিবেশী মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে ভারতে স্বাগত জানানো হয়েছে। ইসরায়েল যেমন স্বাগত জানায় পৃথিবীর তাবৎ ইহুদিকে সে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য আর প্রকৃত ভূমিসন্তানদের উচ্ছেদের বাহানা তৈরির জন্য।

নতুন আইনে ভারতে প্রবেশের ছয় বছর পর তারা, মানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আগত অমুসলিমরা ভারতীয় নাগরিকত্বের হকদার হবে। নগ্ন প্রতিবাদের কারণ সেটাই। আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের সব কটিতে এখন প্রতিবাদ চলছে নানাভাবে। নগ্ন প্রতিবাদ তার একটা অনুষঙ্গ হয়েছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের প্রতিবাদের এই ভাষা ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে। সম্প্রতি এ রকমই এক অভিনব প্রতিবাদের আয়োজন হয় স্পেনের রাস্তায়। শীতে কাতর রাজধানী মাদ্রিদের পুয়ের্তা দে আলকালার কাছে সারা গায়ে রক্ত মেখে নগ্ন হয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়েন একদল প্রাণীপ্রেমিক নরনারী। ‘অ্যানিমেল ন্যাচরালিস’ নামের প্রাণী সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকেরা একের পর এক ‘রক্তাক্ত লাশ’-এর প্রতীক হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন শীত উপেক্ষা করে। তাঁদের ধারণা, এই প্রতীকী দৃশ্য বাকি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করবে। প্রশ্ন করবে নিজের কাছে ‘কেবল একটি কোট বানাতে আর কত প্রাণীর প্রাণ আমরা কেড়ে নেব?’ শুধু মানুষের শরীরে একটু বাড়তি উত্তাপ জোগানর জন্য কত নিরীহ প্রাণীর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কতশত প্রাণী নির্মম হত্যার শিকার হচ্ছে খামাখা। সে খবর রাখে কয়জন? এই অভিনব প্রতিবাদ প্রাণী সুরক্ষার বিষয়ে আবার গোটা দুনিয়াকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করবে বলে অনেকের ধারণা। এই শীতে একই ধরনের প্রতিবাদের আয়োজন চলছে মুক্ত ইউরোপের শহরে নগরে।

নিঃস্ব মানুষের নগ্ন প্রতিবাদের প্রথম দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরেন মহাশ্বেতা দেবী তাঁর কালজয়ী গল্প ‘ধ্রুপদী’তে। সে গল্পের পটভূমি ছিল বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে বলাৎকারের শিকার সাঁওতাল নারী পুলিশের হেফাজতে শরীরে কাপড় রাখতে অস্বীকার করেন। তাঁর মুখ দিয়ে আগুন বেরিয়ে আসে, ‘কাপড়ের কী। কাম কী হবে কাপড় দিয়ে, যে তুই মোর কাপড় খুলতে পারিস, সে হামাক কাপড় পরাও কেমনে? পরব না কাপড়।’

লিখে কিছু হবে না বলে যাঁরা কলম বন্ধ করে ভুল বয়ান পাঠ করছেন, তাঁরা নিশ্চয় জানেন, মহাশ্বেতা দেবীর এই গল্প শক্তি জুগিয়েছিল মণিপুরের মায়েদের। তাঁরা নগ্ন হয়ে আসাম রাইফেলসের সদর দপ্তরের সামনে মণিপুরি নারীদের ধর্ষণের প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই গল্পটা বলার জন্যই এত ভূমিকা। ২০০০ সালের জানুয়ারিতে নাট্যকার কানাইলাল মহাশ্বেতার এই গল্পের একটা নাট্যরূপ দেন মণিপুরি ভাষায়। ইম্ফলে মঞ্চস্থ হয় সেই নাটক। কানাইলালের সহধর্মিণী সাবিত্রী লাঞ্ছনার শিকার কিন্তু আগুনমুখী ওই সাঁওতাল নারীর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রচণ্ড আন্তরিকতার সঙ্গে।

নিজ রাজ্যে পরবাসী মণিপুরিরা নির্যাতনের শিকার সাঁওতাল নারীর মধ্যে নিজেদের দেখতে পায়। শিখে নেয় তার প্রতিবাদের ভাষা। ২০০৪ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের হাতে মণিপুরি কিশোরী মনোরমা নির্যাতিত আর খুন হলে মণিপুরের ১২ জন মা হয়ে যান বাংলার সেই সাঁওতাল ধ্রুপদি। ঘেরাও করেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঘাঁটি নগ্ন শরীরে। মহাশ্বেতার গল্পের এমন বাস্তব আর জীবন্ত চর্চা কেউ কখনো দেখেনি, কল্পনাও করেনি। ২০০৪ সালের ১৫ জুলাই এ ঘটনায় সারা ভারতের শুধু নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেরই অনেক নির্যাতিত নারী-পুরুষকে চমকিয়ে দেয়। চমকে যায় নিপীড়নের চালিকা প্রশাসন। নাট্যকার কানাইলাল হয়ে ওঠেন সেই রাজনৈতিক বংশীওয়ালা, যিনি দূরের জিনিস দেখতে পান। আন্দোলনের ভাষার ধারণা দিতে পারেন। কানাইলালকে মণিপুরের মানুষ সেই থেকে ডাকে চিংগু মানে বিজ্ঞ। আহা, আমাদের চিঙ্গুরা যদি গর্ত থেকে বেরিয়ে আসত। আসবে না?

গওহার নঈম ওয়ারা: শিক্ষক ও গবেষক সুত্র: প্রথম আলো