সাম্প্রতিক

দিন যায় দিন আসে ( ধারাবাহিক -৭)

দিন যায় দিন আসে ( ধারাবাহিক -৭)

দিন যায় দিন আসে ( ধারাবাহিক -৭)

শুভ্র বেশ সকাল সকাল আজ অফিসে ঢুকলো। সময় নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। কী ভেবে গুণ গুণ করতে করতে রিং দিলেন সুদুর সিঙ্গাপুরে লালিমাকে। লালিমা অপর পাড়ে রিং রিসিভ করতেই শুভ্র মৃদু স্বরে গাইতে শুরু করলেন –

“ বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে এসেছি তোমারি এ দ্বারে/পথিকেরে লহো ডাকি তব মন্দিরের এক ধারে।।/বনপথ হতে, সুন্দরী, এনেছি মল্লিকামঞ্জলী/তুমি লবে নিজ বেণীবন্ধে মনে রেখেছি এ দুরাশারে।।/ কোনো কথা নাহি ব’লে ধীরে ধীরে ফিরে যাব চলে।/ ঝিল্লিঝঙ্কৃত নিশীথে পথে যেতে বাঁশরিতে/শেষ গান পাঠাব তোমা-পানে শেষ উপহারে।।“

লালিমাঃ বাববা, বহুদিন পর তোমার দুর্লভ কন্ঠের সঙ্গীত সুধা আকন্ঠ পান করলাম। তাও আবার রবীন্দ্র সঙ্গীত।

শুভ্রঃ ধন্য হলুম। “ আমার মনে হচ্ছে আরেকটা গান গেয়ে ফেলি।

লালিমাঃ যেমন?

শুভ্রঃ “ মনে বড় আশা ছিল তোমাকে শুনাব গান/ এতদিনে আশা হল পুর্ণ।“

লালিমাঃ তাইতো পাক্কা ৪৯ দিন পরে রিং দিয়েছো।

শুভ্রঃ সে তো তোমার ভাল ভেবে। মাথায় রাখতে হয় যে তুমি আমার পরকীয়া। তমার আবার দাপুটে এঞ্জিনিয়ার       স্বামীধন আছেন।

লালিমাঃ পরমকীয়া তো আর হতে পারলাম না!

শুভ্রঃ তুমিই পরম, তুমিই ধরম! হল তো? যেন কবুল বলিয়ে ছাড়বে।

লালিমাঃ ছি ছি! পাপের কথা।

শুভ্রঃ কী পাপের কথা! ভারতের সুপ্রীম কোর্ট পরকীয়াকে অনুমতি দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি দীপক মিশ্র এ রায় প্রদান করেন। আদালত জানিয়ে দিয়েছে যে, পরকীয়া আর ফৌজদারি অপরাধ কিংবা শাস্তিযোগ্য অপরাধ না। তিনি রায়ে উল্লেখ করেছেন, স্ত্রী কখনও স্বামীর সম্পত্তি হতে পারে না। কোন ব্যক্তি যদি কোন বিবাহিত নারীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন, তবে সেটা কোন অপরাধ না।

লালিমাঃ বাদ দাও ভারতের সুপ্রীম কোর্ট। কিছুদিন আগে তো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সমকামীতাকেও আইনসিদ্ধ করেছে। এবার থাম ,বাজে বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছে না।

শুভ্রঃ থামতে পারি যদি গান শোনাও।

লালিমাঃ আচ্ছা নাছোড়বান্দা তুমি। কী গান গাইবো?

শুভ্রঃ তোমার ইচ্ছে মহারানী। যেহেতু তোমাতে সঁপেছি প্রাণ!

লালিমাঃ শোন তাহলে –

“ দিবস রজনী, আমি যেন কার    আশায় আশায় থাকি।/তাই    চমকিত মন, চকিত শ্রবণ,  তৃষিত আকুল আঁখি॥/  চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই,    সদা মনে হয় যদি দেখা পাই–/    ‘কে আসিছে’ বলে চমকিয়ে চাই    কাননে ডাকিলে পাখি॥/জাগরণে তারে না দেখিতে পাই,    থাকি স্বপনের আশে–/ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয়,    বাঁধিব স্বপনপাশে।/  এত ভালোবাসি, এত যারে চাই,    মনে হয় না তো সে যে কাছে নাই–/  যেন এ বাসনা ব্যাকুল আবেগে, তাহারে আনিবে ডাকি॥“

লালিমাঃ অনেক দিন গাই না তো। কন্ঠ বেয়াড়া হয়ে গেছে।

শুভ্রঃ মোটেও না। আগের মতই আছে শিল্প সুষমামন্ডিত কন্ঠ তোমার। আগেও তোমার গান শুনে যে অনুভুতি হত, এখনও সেই একই অনুভুতি হয়। যেন “এই লোভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর।“

লালিমাঃ ছাড়ো। আলমডাঙ্গার খবরাখবর বল।

শুভ্রঃ তথৈবচ।

লালিমাঃ কেন? আমি তো শুনেছি পুলিশ পাইকারি হারে বিএনপি-জামায়াত ধরে ধরে মিথ্যা নাশকতা্‌ বিষ্ফরক মামলা দিচ্ছে। উপজেলার অনেক গ্রামে সাধারণ কৃষকরাও গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরে ঘুমুতে পারছেন না। এ সম্পর্কে কোন রিপোর্ট তো দেখি না। এই জন্য বাংলাদেশে সাংবাদিকের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা তলানিতে ঠেকেছে। থাক এসব কথা, তুমি কী জানো বল।

শুভ্রঃ আমার চে’ তুমি তো কম জান বলে মনে হচ্ছে না। বরং তুমি যা জান সেগুলি আগে বললে আমার সুবিধে হয়।

লালিমাঃ আমি শুনেছি যে,আলমডাঙ্গা থানার পুলিশ বিভিন্ন উঠতি নেতা-নব্য নেতাদের নিকট থেকে জামায়াত বিএনপির নেতাকর্মিদের নাম ঠিকানা নাকি সংগ্রহ করছেন। রাতে বিশেষ টিম গিয়ে তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর মামলা দেওয়া হচ্ছে বিষ্ফোরক ও নাশকতার। যা অজামিনযোগ্য। আলমডাঙ্গার দুই দুই বারের মেয়র বিএনপি নেতা মীর মহি উদ্দীনকেও নাশকতা ও বিষ্ফোরক আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। দুই দুই বারের নির্বাচিত মেয়র নাকি বি টিম মাঠে নাশকতা সৃষ্টির জন্য রাতে অনেকের সাথে বোমা নিয়ে মিটিং করছিলেন। তোমার কী মনে হয় – জনগণ এ কাহিনি গিলবে?

শুভ্রঃ গিলুক না গিলুক বিএনপি তো শায়েস্তা হবে।

লালিমাঃ একই নাশকতার মামলার আসামি করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির সবচে জনপ্রিয় নেতা টিলুকে ও তার ছেলেকে। বাপ বেটা নাশকতা সৃষ্টির জন্য বোমা নিয়ে মিটিং করছিল। সেকুলাস কী বিচিত্র এই পুলিশের কান্ড!

শুভ্রঃ শুধু নেতাদের কথা বলছো কেন? একেবারে তৃণমুল কর্মিরাও আসামি। এমনকি কর্মিও না, শুধুমাত্র বিএনপিকে ভোট দেয়, তাদেরকেও আটক করে নাশকতা  মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

লালিমাঃ সবচে বিপদের মুখে আছে যে ইউনিয়ন বা এলাকায় আওয়ামীলীগের ভেতর গ্রুপিং আছে। যেমন ডামোশ, ফরিদপুর, হাটবোয়ালিয়া,  জামজামি ইউনিয়ন। ডামোশ গ্রামে তো আওয়ামীলীগের বিবাদমান দুটি গ্রুপের লিস্ট অনুযায়ি দুপক্ষের সমর্থক যারা বিএনপি করেন, তাদের আটক করে নাশকতা মামলা দেওয়া হয়েছে। পরে দুপক্ষের নেতারা তাদের স্বপক্ষের আটক সমর্থকদের ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে থানার ভেতরেই পরষ্পর মারামারি করে ন্যাক্কারজনক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। জামজামি ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের প্রাণ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি আয়ুব চেয়ারম্যান। তার ছেলে নজরুল এখন চেয়ারম্যান। অথচ নজরুলের প্রতিপক্ষরা নজরুলের যে সকল সমর্থক বিএনপি জামায়াত করে তাদের গ্রেফতার করে নাশকতা মামলা দিয়ে জেল হাজতে পাঠাচ্ছে। এর ভেতর পুলিশি বাণিজ্য হচ্ছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে। আলমডাঙ্গা আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক বেগুয়ারখালী গ্রামের রবিউল ইসলামকে বাড়ি থেকে আটক করলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

শুভ্রঃ চরপাড়া গ্রামের এক জামায়াত (? ) নেতাকে সম্প্রতি আটক করলে জামজামি ফাঁড়ি থেকে জেলা আওয়ামীলীগ নেতা লিটু বিশ্বাস ধর্মীয় ভাই দাবি করে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।

লালিমাঃ আমার চাচাতো ভাই প্রাইমারি টিচার। আমি কিছু কিছু শিক্ষকের অপকর্মের কাহিনি জানি। ওই গুণধরের নাম পূর্বেও একবার আলোচিত হয়েছিল পল্লী বিদ্যূতের অফিসে দালালি করার কারণে। বিদ্যুত সংযোগ দেওয়ার কথা  বলে বহু মানুষের নিকট থেকে সে টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। পরে প্রতারিতদের কেউ কেউ তাকে মোটর সাইকেল থেকে নামিয়ে নিয়ে বেদম মারধর করেছিল। এখনও নাকি সে কয়েক মাস স্কুলে যায় না। একজন মেয়ে তার পরিবর্তে ক্লাস নেয়। আর সে বিশেষ মাধ্যমের সাথে যোগসাজশে বিএনপি জামায়াত কর্মি এমনকি সমর্থকদের নিকট থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে তাদেরকে পুলিশ আটক করবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে। প্রশাসনের উচিত এ গুলি তদন্ত করে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

শুভ্রঃ সর্ব অঙ্গে ব্যাথ্যা ঔষধ লাগাবো কোথা অবস্থা। তবে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ অনেক মানবিক সেটাই আশার কথা।

লালিমাঃ আমিও শুনেছি। তিনি তো মাদকমুক্ত আলমডাঙ্গার স্থপতিও। শুধুমাত্র এই একটি কারণে হলেও আলমডাঙ্গার মানুষের উচিত হবে তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকার। তবে ওই মাস্টারের সাথে দালালিতে তোমাদের কেউ কেউ জড়িত বলেও দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দেখ , সাবধানে এসব এড়িয়ে চলো কিন্তু। স্বাধীনতার পরে রক্ষীবাহিনির জন্য আওয়ামীগকে যে খেসারত দিতে হয়েছে, এবার পুলিশের মিথ্যা মামলার জন্য ভবিষ্যতে একই রকম অনীহা কুড়াবে আওয়ামীলীগ। আমি রাজনীতি বুঝি না, তথাপি দেশের বাইরে থাকি। কিন্তু আমার এই কথা কতখানি সত্য হবে তা দেখতে ৫/১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এ সব করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনির পেশাদারিত্বে স্থায়ি কোন দাগ পড়বে না তো? সচেতনভাবে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

শুভ্রঃ সব কিছু থেকে কি রক্ষা পাওয়া যায়? রাজনীতি বড় জটিল। আমিও ভাল বুঝি না। এ জ্ঞানও আমার অতটা টনটনে না সে তো তুমি জানো। সে কারণে রাজনীতি বিষয়ে আমি “ তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুব তারা।”

লালিমাঃ থাক আর ফোলাতে হবে না। এমনিতেই মোটা হয়ে যাচ্ছি।

শুভ্রঃ একটা কবিতা শুনতে ইচ্ছে করছে। আবৃত্তি কর না।

লালিমাঃ তাহলে তোমাকেও শোনাতে হবে কিন্তু।

শুভ্রঃ তথাস্তু।

লালিমাঃ “বেনীমাধব বেনীমাধব তোমার বাড়ী যাব/বেনীমাধব তুমি কি আর আমার কথা ভাব?/বেনীমাধব মোহনবাঁশিঁ তমাল তরুমূলে/বাজিয়েছিলে আমি তখন মালতি স্কুলে।/ডেস্কে বসে অঙ্ক করি ছোট ক্লাশ ঘর/বাইরে দিদিমনির পাশে দিদিমনির বর।/আমি তখন নবম শ্রেণী আমি তখন শাড়ী/আলাপ হলো বেনীমাধব সুলেখাদের বাড়ী।/বেনীমাধব বেনীমাধব লেখাপড়ায় ভাল/ শহর থেকে বেড়াতে এলে আমার রং কালো।/তোমায় দেখে একদৌড়ে পালিয়ে গেলাম ঘরে/বেনীমাধব আমার বাবা দোকানে কাজ করে।/কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু ফুটেছে মঞ্জুরী/সন্ধে বেলা পড়তে বসে অংকে ভুল করি।/আমি তখন নবম শ্রেণী আমি তখন ষোল/ব্রীজের ধারে বেনীমাধব লুকিয়ে দেখা হলো।/বেনীমাধব বেনীমাধব এতদিন পরে/সত্যি বল সেসব কথা এখনও মনে পড়ে?/সে সব কথা বলেছ তুমি তোমার প্রেমিকাকে?/আমি শুধু একটি দিন তোমার পাশে তাকে/দেখেছিলাম আলোর নীচে অপূর্ব সে আলো/স্বীকার করি দুজনকেই মানিয়ে ছিল ভালো।/জুড়িয়ে দিল চোখ আমার পুড়িয়ে দিল চোখ/বাড়ীতে এসে বলেছিলাম ওদের ভাল হোক।/রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলা ঘরে/মেঝের উপর বিছানাপাতা জোসনা এসে পড়ে।/আমার পরে যে বোন ছিল চোরা পথের বাঁকে/মিলিয়ে গেছে জানিনা আজ কার সাথে থাকে।/আজ জুটেছে কাল কী হবে কালের ঘরে পানি/আমি এখন এপাড়ার সেলাই দিদিমনি।/তবুও আগুন বেনীমাধব আগুন জ্বলে কই;/কেমন হবে আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?”

লালিমাঃ এবার তুমি শুরু কর।

শুভ্রঃ আবুল হাসানের নিঃসঙ্গতা কবিতাটি আবৃত্তি করছি। ঠিক আবৃত্তি না, শোনাচ্ছিঃ –

“ অতোটুকু চায় নি বালিকা!/অতো শোভা, অতো স্বাধীনতা!/চেয়েছিলো আরো কিছু কম,/আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে/বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিলো/মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!/অতোটুকু চায় নি বালিকা!/অতো হৈ রৈ লোক, অতো ভিড়, অতো সমাগম!/চেয়েছিলো আরো কিছু কম!/একটি জলের খনি/তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি,/চেয়েছিলো/ একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!”

লালিমাঃ চমৎকার! তুমি বরাবরই ভাল আবৃত্তি কর। আজ রাখি। কাল উইক এন্ড ডে। ট্যুরে যেতে হবে। একটু গোছগাছের ঝামেলা আছে।

শুভ্রঃ আল্লাহ হাফিজ তাহলে।

লালিমাঃ ফি আমানিল্লাহ।

 

 

তারিখ- ২৯/৯/২০১৮ ইং।

 

১ টি মন্তব্য

  1. অনেক সুন্দর। পরবর্তি অংশ দ্রুত আশা করছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না