সাম্প্রতিক

দিন যায় দিন আসে (ধারাবাহিক- ৬)

শুভ্রঃ হ্যা — লো, হ্যা —লো —।

লালিমাঃ কেমন ছিলে? বেশ কয়েক দিন তুমি ফোন দাও নি , খোঁজ নাও নি। জানো –  তোমার ফোন না পেলে “ মনে হয় যেন বিশ্ব ভূবনে কেহ নাই কিছু নাই।“

শুভ্রঃ তুমিও তো খোঁজ নাও নি। আমি ভাবছি এই অভাজনকে হয়তো সবার মত তুমিও—।

লালিমাঃ আসলে কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ্য। এখনও অসুস্থ্য।

শুভ্রঃ “ আজকে তোমার শরীর খারাপ/ কালকে তোমার শরীর খারাপ/ পরশু তোমার শরীর খারাপ থাকবে।/ সুস্থ্ শরীর পেতে দিয়ে একদিন কি আমায় কাছে ডাকবে।”

লালিমাঃ বাজে কবিতা আওড়ালে কিন্তু আমি ফোন রাখছি!

শুভ্রঃ আরে বাদ দাও একটু ইয়ার্কি করছি। তোমাকে একটা ভাল কবিতা শোনাচ্ছি। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তার বউকে নিয়ে রোমান্টিক একটা কবিতা লিখেছেন। সেটি শোনাচ্ছি।

লালিমাঃ আচ্ছা। শোনাও না গো!

রোসালিন

“যখন সে হাসতো, পাখিরা ভাবতো তাদের আর গান করার প্রয়োজন নেই।

অথবা সম্ভবত আমি ভুলে যেতাম

পাখিদের গান।

কখনো ভিড়ের ভেতর, মনে হত তার দৃষ্টি বুঝি

আমার ওপর। কিন্তু বুঝতাম, সে ছিল লজ্জাবতী, সে তাই

নিখুঁত নির্জনতা।

ছবি দেখতাম তার পেছনের আসনে বসে।

পর্দার চিত্রমালা ভুলে গিয়ে বিভোর দেখতাম তার বিম্বিত

চুলের কাঁপন।

আমি দীপ্তিময় হতাম, যখন তার গীতল নীচুস্বর

আমার এলোমেলো ভাবনার জট ছাড়াতো

অন্ধকার আকাশে ঝলসে ওঠা আলোকবিন্দুর মত।

তার নিবিড়তায়, অব্যক্ত পরিপূর্ণতায় শূণ্যতা ভরে গেল

হৃদয়ের, যখন সে একান্তে আমার কাছে এলো।

লজ্জা উবে গেল তার, সোহাগী ছোঁয়ায়

কেশদাম বিবর্ণতায় হল ধূসর।

পাখিদের গান গাওয়া ভুলিয়ে দ্যায় তার হাসি এখনও

এবং আমিও শুনি পাখিদের গান।

লালিমাঃ চমতকার! যাও তোমাকে মাফ করে দিলাম।

শুভ্রঃ এবার বল শরীর খারাপ কেন?

লালিমাঃ “আকুলিয়া ঘন কালো কেশ, দেহ ঘেরি নভো নীল বেশ, কাজল নয়নে, যূথীমালা গলে” নব ধারাজলে ভিজে এই অবস্থা।

শুভ্রঃ একা? নাকি স্বামী দেবতার সাথে? এই সেলফি তুলেছিলে?

লালিমাঃ  কেন হিংসে হচ্ছে ?  না একাই।

শুভ্রঃ তা কেমন আছো বল?

লালিমাঃ কি আর বলব। বিদেশে আছি স্বামীগৃহে শুয়ে-বসে, বেড়ানো আর শপিং নিয়ে।

“ আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী/ তোমার দিকে মুখ ফেরালাম

হে প্রভূ আমাদের ত্রাণ করো/ বিশ্রামে বিধ্বস্ত আমরা / কতিপয় আমলার স্ত্রী।

হে প্রভূ আমাদের স্বামীরা অগাধ নথিপত্রে ডুবুরি/ পরিবার পরিকল্পনায় আমরা নিঃস্ব/ সময় আমাদের পিষ্ট করে যায়।”

শুভ্রঃ তুমি তো ভাল আবৃত্তি কর। পুরোটাই না হয় শোনাতে।

লালিমাঃ এখন আর সমস্তটা মুখস্ত আওড়াতে পারব এমন আত্মবিশ্বাস নেই যে। তোমাকে অন্য একদিন গান শোনাব।

শুভ্রঃ সত্যি!

ললিতাঃ “ যদি ভালবাসা দাও , আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষ পান করে মরে যাব।

বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ

নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ

প্রান্তরে দিগন্তে নির্নিমেষ –

এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি

যদি নির্বাসন দাও , আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষ পান করে মরে যাব।

ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত

এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম

এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম

এই নদীর বুকে

মোচার খোলায় ঘোরে

লুটেরা ফেরারি।

শহরে বন্দরে এত রক্ত-বৃষ্টি

বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর,

বাজারে ক্রূরতা , গ্রামে রণহিংসা

বাতাবি লেবুর গায়ে জোনাকির ঝিকমিক খেলা

বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা।

কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে

নিথর দীঘির পারে বসে আছে বক

আমি কি ভুলেছি সব

স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক?

আমি কি দেখিনি কোন মন্থর বিকেলে

শিমুল তুলোর ওড়াওড়ি?

মোষের ঘাড়ের মত পরিশ্রমী মানুষের পাশে

শিউলি ফুলের মত বালিকার হাসি

নিই নি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ

শুনি নি কি দুপুরের চিলের

তীক্ষ্ম স্বর?

বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ –

যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষ পান করে মরে যাব।।”

শুভ্রঃ গুড! আগের মতই মায়াবি রেখেছো কন্ঠকে দেখছি।

ললিতাঃ তাই? শুধু তোমার জন্য।

শুভ্রঃ মিথ্যুক!

ললিতাঃ মোটেও না। জানতো আমার পতিদেবতা বড্ড কাঠখোট্টা। থাক এসব। এখন বল আলমডাঙ্গার খবর কী?

শুভ্রঃ তথৈবচ।

ললিতাঃ তা তোমাদের উপজেলা নির্বাহি অফিসারের বিরুদ্ধে হতদরিদ্রদের জন্য প্রধানমন্ত্রির প্রাধিকারের  “ জমি আছে ঘর নাই” প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়টি তো টক অব দ্য টাউন। কিন্তু তোমাদের পত্রিকায় তো টু-শব্দ নেই। তুমি কি এ ব্যাপারে খোঁজ খবর কিছু নিয়েছো?

শুভ্রঃ তুমি কি জানো সেটাই বল না।

ললিতাঃ আমি জেনেছি – সাবেক উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা আজাদ জাহান যখন আলমডাঙ্গায় ছিলেন, সে সময় তিনি ১০০ ঘর নির্মাণ করে দেন। সেই ঘর নির্মাণের মান বেশ ভাল ছিল। বিভাগীয় কমিশনার ঘরের মান দেখে খুশি হয়ে খুলনা বিভাগে আলমডাঙ্গার জন্য সবচে বেশি বরাদ্ধের ব্যবস্থা করেছিলেন। বর্তমানে আরও ৮০০ ঘর নির্মাণের বরাদ্ধ পেয়েছে আলমডাঙ্গা উপজেলা। এই ৮ শ ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বর্তমান উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার অর্থাৎ ঘরের খুটি নির্মাণে আমা ইটের ব্যবহার, নিম্নমানের ঢেউটিন। এমনকি ঘরের মেঝে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে অনেক ঘরের। এমনকি ওই ঘরগুলি উপজেলা নির্বাহি অফিসার নিজের তত্বাবধানে তৈরি করছেন দাবি করলেও আসলে ঘর তৈরির ঠিকাদারিত্ব দিয়েছেন তিনি ডামশ গ্রামের মাছব্যবসায়ি হিমেলকে। হিমেলই ঘরগুলি তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।  এ বিষয়ে যমুনা টিভি একটা নিউজ সম্প্রচার করেছে। সেটি ইউটিউবে দেখেছি। তুমিও দেখে নিও। এই নিউজ সম্প্রচারের পর তটস্থ হয়ে পড়েন উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা রাহাত মান্নান। তিনি মাছব্যবসায়ি হিমেলের মোটর সাইকেলে ঘুরে ঘুরে ১ সপ্তার বেশি নির্মিত ঘরের ছেড়াফাটা ঠিক করে দিয়েছেন। কিছু কিছু ঘরের টিন খুলে নতুন করে টিনের ছাউনি নির্মাণ করে দিয়ে ঘরমালিকদের মুখ বন্ধ করেছেন। এ সব দেখেও দেখনা সাংঘাতিক সাহেব।

শুভ্রঃ সে কারণেই তো বলি তুমি আমার সাথে থাকলে আমিই হতাম নন্দিত সাংবাদিক।

ললিতাঃ তাই?

শুভ্রঃ হু।

ললিতাঃ আলমডাঙ্গা প্রকল্প অফিসের দুর্নীতি সম্পর্কে কী জানো?

শুভ্রঃ সিরিয়াস কিছু জানো নাকি তুমি?

ললিতাঃ জানি, তবে অন্যদিন বলব।

শুভ্রঃ তাহলে আজ কী হবে সখি?

ললিতাঃ তুমি তো এক সময় বর্ষাজুড়ে জয় গোস্বামী নিয়ে পড়ে থাকতে। আউড়াও না জয় গোস্বামী!

শুভ্রঃ তার আগে তুমি বর্ষার একটা রাগ প্রধান নজরুল গীতি শুনিয়ে দাও।

ললিতাঃ আচ্ছা বাবা। শোনো —

“মেঘের ডমরু ঘন বাজে।

বিজলি চমকায়

আমার বনছায়,

মনের ময়ূর যেন সাজে॥

সঘন শ্রাবণ গগণ-তলে

রিমি ঝিমি ঝিম্ নবধারা জলে,

চরণ-ধ্বনি বাজায় কে সে —

নয়ন লুটায় তারি লাজে॥

ওড়ে গগন-তলে গানের বলাকা,

শিহরণ জাগে উজ্জ্বল পাখা।

সুদূরের মেঘগুলি অলকার পানে

ভেসে চলে যায় শ্রাবণের গানে,

কাহার ঠিকানা খুঁজিয়া বেড়ায় —

হৃদয়ে কার স্মৃতি রাজে॥“

শুভ্রঃ হৃদয়ে কারো স্মৃতি কি সত্যিই রাজে?

ললিতাঃ না সকলে তোমার মত সাংঘাতিক। বাদ দাও প্যাঁচাল। এখন শুধু জয় গোস্বামী –

শুভ্রঃ জো হুকুম জাঁহাপনা, শোনো তাহলে —

“স্বপ্নে তোকে বাড়ির দিকে এগিয়ে দিতে যাই

স্বপ্নে এসে দাঁড়াই পাড়ার মোড়ে

কখন তুই ফিরবি ভেবে চারিদিকে তাকাই

টান লাগাই তোর বিনুনি ধরে।

 

স্বপ্নে আমি ভিক্টোরিয়ায় তোর পাশে দাঁড়াই

স্বপ্নে বসি ট্যাক্সিতে তোর পাশে

স্বপ্নে আমি তোর হাত থেকে বাদাম ভাজা খাই

কাঁধ থেকে তোর ওড়না লুটোয় ঘাসে।

 

তুলতে গেলি – কনুই ছুঁলো হাত

তুলতে গেলি – কাঁধে লাগলো কাঁধ

সরে বসব? আকাশভরা ছাতে

মেঘের পাশে সরে বসল চাঁদ।

 

ক’টা বাজলো? উঠে পড়লি তুই

সব ঘড়িকে বন্ধ করল কে?

রাগ করবি? হাতটা একটু ছুঁই?

বাড়ির দিকে এগিয়ে দিচ্ছি তোকে…

 

স্বপ্নে তোকে এগিয়ে দিই যদি

তোর বরের তাতে কি যায় আসে?

সত্যি বলছি, বিশ্বাস করবি না

স্বপ্নে আমার চোখেও জল আসে!”

ললিতাঃ ধন্যবাদ।  এই অনেক সময় গেল। রাখি হ্যাঁ।

শুভ্রঃ “ ছাড়িতে পরাণ নাহি চাই/ তবু যেতে হবে হায়।/ মালা মিনতি করে তবু কুসুম শুকায়।। তাহলে অনুমতি দাও আজকের মত রাখতে।

লালিমাঃ আচ্ছা, ভাল থেকো, শরীরের যত্ন নিও। ফি আমানিল্লাহ।

শুভ্রঃ আল্লাহ হাফিজ।

— রহমান মুকুল

২৯ আষাঢ়,১৩ মে ২০১৮ইং।

 

 

 

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না