সাম্প্রতিক

জলবায়ুর প্রকট পরিবর্তন দৃশ্যমানঃ অগ্রায়নে গাছে গাছে কদম ফুলের সমাহারে হতবাক মানুষ

সাম্প্রতিকী ডেস্কঃ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বর্ষার প্রারম্ভে ও শেষভাগে কদম ফুল ফোটে। বর্ষা শেষে শরতে ফোটে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য্যের প্রতিক শিউলি ফুল। অথচ ব্যত্যয় ঘটিয়ে বর্ষার অনুসঙ্গ কদম ফুল যদি হেমন্তের শেষভাগে স্নিন্ধ শুভ্র সুবাস ছড়ানো শিউলি ফুল জ্যেষ্ঠ মাসেও ফুটছে! হেমন্তের শেষ মাস অগ্রায়নে এখন সারা দেশে কদম গাছে গাছে খুশিতে বিগলিত শিশিরসিক্ত কদম ফুল শোভা পাচ্ছে। আবহাওয়াবীদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানিরা বলছেন, অবাক হওয়ার কিছু নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঋতু বৈচিত্রের স্বভাব এমন বিগড়েছে।

 

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ, ঋতু বৈচিত্রের অনন্য দেশ। । কিন্তু এখন সেই ঋতুবৈচিত্র্যও বদলে যাচ্ছে। ঋতুবৈচিত্র্যের এই বদলে যাওয়ার জন্য আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন জলবায়ু পরিবর্তনকে। ফলে এখন বৃষ্টি, বন্যা, শীত, গ্রীষ্মের জন্য ঋতুর অপেক্ষার দরকার হয় না। সময়ে দেখা না মিললেও অসময়ে বৃষ্টির বাড়াবাড়ি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। শীত, বর্ষার আগমন ও প্রস্থান তার প্রচলিত সময়ের নিয়ম মানছে না। তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি ও চাষাবাদেও। স্বভাব ভুলে বন্যা হানা দিচ্ছে অসময়ে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা দিনের পর দিন বাড়ছে আর প্রকৃতি শুরু করছে বৈরীতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত জলবায়ু পরিবর্তনে সবচে’ ক্ষতির শিকার যে দেশগুলি, তার অন্যতম বাংলাদেশ। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নতুন কিছু নয়। তবে তার মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। হাজার বছর ধরে বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ হিসেবে পরিচিত। ষড়ঋতুর এ দেশে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ হেমন্ত ঋতু। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হেমন্ত তেমন অনুভব হয়নি। হেমন্ত আসে আর দ্রুত পালায় নিঃশব্দ চরণে।

বৃষ্টির হিসাব গোলমেলে বড্ড। আসলে বর্ষা ঋতু তার চরিত্র-রূপ-বৈশিষ্ট্য সবই বদলাতে শুরু করেছে প্রায় সাত/আট বছর আগে থেকে। আষাঢ়-শ্রাবণে অবিরাম বৃষ্টি এখন বলতে গেলে স্মৃতি। বর্ষার এও সর্বগ্রাসি রূপ পৃথিবীর কোথাও এই বলে একবার এক বিদায়ি আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেছিলে। কিন্তু বর্ষার সেই সর্বগ্রাসি ভয়ঙ্কর রূপ আর নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির এই রূপ বদলেই এখন অসময়ে ফুটছে কদম ফুল আর প্রখর জৈষ্ঠে শিউলি ফুল। প্রকৃতির এই রূপবদল মানুষের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনবে না বলে বিশেষজ্ঞদের হুশিয়ারি।

তবে বৃষ্টি কম-বেশি হওয়ার ধকলে কেবল বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী ভারতও ভুগছে। মৌসুমি বায়ু আগের মতো সক্রিয় না থাকায় ভারতের পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় অর্ধেক বৃষ্টি হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর আশঙ্কা করছে, এবারের বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে সাত ভাগ কম বৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শাহ আলম অবশ্য বৃষ্টি কম-বেশির কারণে লাভ-ক্ষতি দুটিই হতে পারে বলে মনে করছেন। তিনি জানান, এ বছরের জুলাই মাসে বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়েছে। কিন্তু আগস্ট মাসে বৃষ্টি কিছুটা বেশিই হয়েছে। বৃষ্টি কম-বেশির জন্য লাভ-ক্ষতি দুটিই হতে পারে।”

বুয়েট শিক্ষক আইনুন নিশাতের মতে, পৃথিবীতে বৃষ্টি কমেনি। তবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বিশ্বের কোথাও কমেছে, আবার কোথাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেসব জায়গায় আগে বৃষ্টি একেবারেই হতো না, সেখানে এখন বৃষ্টি হচ্ছে। মৌসুমি বায়ু এখন বঙ্গোপসাগরের চেয়ে আরব সাগরের ওপর বেশি সক্রিয়। তাই পাকিস্তানের করাচি, সৌদি আরবে বৃষ্টি-বন্যা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনটি হচ্ছে। আমরা সচেতন না হলেও প্রকৃতিই প্রতিশোধ নিয়ে আগের রূপে ফিরে যেতে চাইবে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন

error: Content is protected !!