সাম্প্রতিক

চাই পরিশুদ্ধ বিবেক ও মনন | আতিকুর রহমান ফরায়েজী

গত ০৪ আগস্টে আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, বাংলাদেশ’র আয়োজনে ‘চাই পরিশুদ্ধ বিবেক ও মনন’ শীর্ষক পাঠ অভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি আতিকুর রহমান ফরায়েজীর বক্তব্য এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো।

এখন যে সময়টাতে আমরা বসবাস করছি, সেই সময়টা অনেক দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এখনকার জেনারেশন খুব ফাস্ট হয়ে যাচ্ছে। এই ফাস্ট হওয়ার একটা ভালো দিক আছে, একটা খারাপ দিক আছে। ভালো দিক হচ্ছে- এখনকার ছেলে মেয়েরা অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি স্মার্ট, অনেক বেশি বুদ্ধিমান, অনেক বেশি ফ্যাশানেবল। আর এইটার নেগেটিভ দিক হলো- আমরা অনেকবেশি প্রাশ্চাত্যেগামী হয়ে যাচ্ছি। চোখ বন্ধ করে প্রাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে আমরা অনুকরণ করছি। আমারা ভাবছি, যা কিছু প্রাশ্চাত্যের তা সবই স্মার্ট। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মতের সাথে কিছুটা দ্বিমত প্রষণ করি। প্রাশ্চাত্য সভ্যতাকে যারা খুব বেশি গভীরতা নিয়ে দেখেছেন, যারা প্রাশ্চাত্য সভ্যতার ভিতরের উদাহরণগুলোকে দেখেছেন, তারা অনেকেই এটার ব্যাপারে একমত হবেন যে, প্রাশ্চাত্য সভ্যাকে এভাবে সরাসরি অনুকরণ করার মধ্যে ভয়ংকর একটা দিক রয়ে গেছে। আমাদের প্রাশ্চাত্য সভ্যতাকে একটু বুঝে শুনে গ্রহণ করা উচিত।

প্রাচ্য এবং প্রাশ্চাত্য সমাজের মধ্যে একটা মৌলিক প্রার্থক্য আছে। প্রাচ্যের সমাজ অনেক বেশি রক্ষণশীল। এখানে পরিবার প্রথা আছে। এখানকার ছেলে মেয়েরা বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করতে জানে। এরা তাদের জীবনে নীয়ম নীতি পালন করতে অভস্থ্য। আর যদি প্রাশ্চাত্যের কথা বলি- তারা এই পরিবার প্রথাকে ভেঙে ফেলেছে। সেখানকার ছেলে মেয়েরা ড্রিংক্স করতে পছন্দ করে। আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন- প্রাশ্চাত্য সমাজে আত্মঘাটি হামলার ব্যাপারটা সাধারণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন পর পরই বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে আমরা এই ঘটনাটা দেখতে পাই। এখন কথা হচ্ছে- তারা এটা কেনো করছে? সে তো নিজেও আত্মহত্যা করছে। এ বিষয় নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করা হলো। তারা গবেষণা করে বললেন- যে মানুষগুলো এইসব অপরাধের সাথে জড়িত, তারা মানষিকভাবে সুস্থ্য নন। এটা হবার কারণ কি? কারণ হচ্ছে এরা ছোট বেলা থেকেই একটা এবনরমাল পরিবেশে বড় হয়েছে। কারো বাবা আছে, মা নেই। কারো মা আছে, বাবা নেই। যে কারণে একটা নিঃসংগতা তাকে ঘিরে রেখেছে। কিছু দিন আগে বাংলাদেশে হলি আর্টিজনে যে জঙ্গি হামলা হলো। এরা সকলেই বাংলাদেশের সন্তান। তাহলে এরা কেনো আত্মঘাতি এই হামলা করলো ? কারণ খুঁজতে গেলে পাবেন, এদের সকলের পরিবরই প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অনুকরণ করে।

প্রাশ্চাত্যে এরকম অনেক দেশ আছে, যে দেশের দম্পতিরা সন্তান নিতে আগ্রহী না। ওইসব দেশে সরকারের পক্ষ থেকে অফার করা হচ্ছে- তোমার ২ টা সন্তান হলে, রাষ্ট্র তোমাদের এইটা দেবে, ৩ টা সন্তান হলে, রাষ্ট্র তোমাদেরকে ওইটা দেবে। যাতে করে ওই সব দেশে আবার পরিবার প্রথা চালু হয়। আর প্রাচ্যের দম্পতিরা ওই প্রাশ্চাত্য সংষ্কৃতিকে ফলো করছে। মার্কিন উপন্যাসিক ইউলিয়াম ডি. গ্রান্ডার “ওয়ার এগেইনেস্ট দ্য ফ্যামেলি” নামে একটা বই লিখেছেন। প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে যেভাবে পরিবার প্রথাকে এড়িয়ে চলা হচ্ছে, তার প্রতিচ্ছবিই বইটিতে ফুটে উঠেছে।

আমরা আমাদের বাবা মাকে নিজে থেকেই শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। কারণ আমরা পরিবারের মধ্যে বড় হয়েছি। দাদা, দাদি, চাচা, চাচির আদর পেয়ে বড় হয়েছি। কিন্তু প্রাশ্চাত্যে সেরকম সুযোগ নেই। তাই তাদের বাবা, মায়ের জন্য বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন হয়েছে। আমরা যদি তাদের সংস্কৃতিকে এভাবে অনুকরণ করতে থাকি তাহলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাতেও বৃদ্ধাশ্রম আসতে বেশি দেরি নেই। আমাদের বাবা মাকে ভালো বাসার জন্য তো আমাদের বাবা দিবস বা মা দিবসের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু প্রাশ্চাত্যে বছরের ১ দিন বাবা দিবস, ১ দিন মা দিবস। এই দিবস গুলোতে তারা বোঝাতে চায়- আমরা বাবা মাকে ভুলে গেলেও ভুলিনি। আপনি কি চাইবেন- এই সংস্কৃতিটা আমাদের সংষ্কৃতিতে মিশে যাক ? নিশ্চয় আপনারা আমার মতোই চায়বেন না।

আমাদের সমাজে প্রাশ্চত্য সংস্কৃতিকে অনুকরণ করাটা একটা ফ্যাশান হয়ে দাড়িয়েছে। মেয়েদের জিন্স প্যান্ট আর টি শার্ট না পড়লে মর্ডান লাগবে না। অবশ্য আলমডাঙ্গাতে এই বিষয়টা অনেক কমই দেখা যায়। তারপরও বাংলাদেশে কিন্তু এটা একেবারেই কম নয়। তারপর ছেলেদের ক্ষেত্রে ছেড়া টি-শার্ট, ছেড়া প্যান্ট, উল্লুর মতো মাথার চুল কাটার স্টাইল না করলে কেউ মেনে নেবে না। আর সব থেকে বেশি যে বিষয়টি হলো মাদকাসক্তি। অভিভাবকেরা তার সন্তানদের আর সকল কাজ মেনে নিলেও মাদক সেবন মানতে নারাজ। আপনার সন্তান প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতির সবকিছু হুবাহু অনুকরণ করলে কোনো দোষ নেই, কিন্তু যখন সে প্রাশ্চত্যের মাদকসেবনকে গ্রহণ করছে তখন আপনার সমস্যা কেনো? এটা তো প্যারানরমারে মতো, একটার সাথে আরেকটার সংযোগ থাকবে না, তা তো হতে পারে না। আমাদের দেশে এতো মাদক বিরোধী সেমিনার, অভিযান চলছে। কিন্তু মাদকসেবক কি কমছে ? কেনো কমছে না ? এই প্রাশ্চাত্য সংষ্কৃতিকে অনুসরণ করার জন্য। আমি এখানে দাড়িয়ে বলে যাচ্ছি- আজ থেকে এদেশের তরুণ সমাজ প্রাশ্চাত্যকে অনুকরণ করা বন্ধ করে দিক ১ বছর পরে হিসাব করে দেখবেন ৯০% মাদকসেবী কমে গেছে।

ইদানিং আরেকটা আগ্রাসন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতীয় টিভি চ্যানেল আগ্রাসন। ভারতে বিভিন্ন সংষ্কৃতির মানুষ বাস করে। তাদের কোনো নির্দিষ্ট সংষ্কৃতি নেই। তারা প্রাশ্চাত্যকে অনুকরণ করে চলে। যার ফলে আমাদের দেশের তুলনায় তাদের দেশে ধর্ষণ বেশি হয়, মাদকসেবী বেশি, বিবাহ বিচ্ছেদ বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সংষ্কৃতির মানুষ বাস করে না। হ্যাঁ কিছু উপজাতি আছে, তারা তাদের সংষ্কৃতি পালন করে। তাদের কথা আলাদা। আমাদের নিজস্ব ঐশ^জম-িত সংষ্কৃতি আছে। আমরা ভাষার জন্য ৫২ সাথে আন্দোলন করেছি। তাহলে কেনো অন্যের ভাষা, অন্যের সংষ্কৃতির জন্য আমরা নিজেদের সংষ্কৃতিকে ভুলে যাব? বাংলাদেশে যে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর আগ্রাসন হচ্ছে সেটা থেকে রক্ষা করবে কে? বাংলার উপর হিন্দির যে আগ্রাসন হচ্ছে, সেটা থেকে রক্ষা করবে কে? এগুলোও কিন্তু প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতির মতোই ক্ষতিকর। তাই আমরা যদি এখনই এই কাজটা না করতে পারি, আমরা অন্য সংষ্কৃতিকে লালন পালন করা বাদ দিয়ে নিজেদের সংষ্কৃতিকে ভালো বাসতে না শিখি, তাহলে আমাদের পরিবার প্রথা ভেঙে যাবে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে যাবে, বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হবে, দেশে মাদকাশক্ত বৃদ্ধি পাবে, বিবাহ বিচ্ছেদ হবে, ইভটিজিং হবে। কোনোভাবেই এগুলোকে আটকানো যাবে না। তাই আসুন শুদ্ধ সংষ্কৃতি চর্চা করি, মেধা ও মননে একজন খাটি বাংলাদেশি বাঙালি হয়ে উঠি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না