সাম্প্রতিক

কৌম্বারাকা থেকে কুমারঃ কুমার নদের অজানা ইতিহাস

শাহীন আহমেদ টিটোঃ কুমার নদের নাম কেনো ‘কুমার’ হলো তা অনুমান করা কঠিন। এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর ইতিহাসের কোন বাঁকে হারিয়েছে তা আমরা জানিনা, হয়ত কোন দিনই জানতে পারব না। কোন কোন ইতিহাস বলছে এটি ছিল গঙ্গার প্রধান শাখার একটি। গঙ্গা-পুত্র (দেবী গঙ্গার পুত্র) হিসেবেই কী এর নাম কুমার রাখা হয়েছিল? এই নদটির আরেকটি নাম আছে, আর তা হলো পাঙ্গাসী বা পাংসী। পাঙ্গাস মাছের প্রাচুর্যের কারণে, না এর স্বচ্ছ জলপ্রবাহের কারণে, না পাংসী নামের কোন জলপ্রবাহ কুমারের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার ফলে এই নদের কিছু অংশকে পাঙ্গাসী বা পাংসী বলে ডাকা হতো- এই বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায় না। The Statical Accounts of Jessore এর ১৭২ পাতায় এই নদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে- ‘Kumer (the young prince), or Pangashi (the pale one), a branch of the Nadia river Mathabhanga’। কুমার নদের আদি প্রবাহ নিয়ে আলোচনা করলে আমরা হয়ত এই নদের ইতিহাসের কিছু ছিন্ন পাতা জোড়া লাগানোর একটা চেষ্টা করতে পারি কিন্তু নিশ্চিত কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনা

টলেমির বিবরণ এবং মানচিত্র থেকে জানা যায়, গঙ্গাঋদ্ধির রাজধানী ছিল গাঙ্গে। টলেমি এটাকে একটা মহানগরী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং গঙ্গা রাজ্যকে তাম্রলিপি থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে দেখিয়েছেন। টলেমি গঙ্গা নদীর পাঁচটি মুখের কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার মানচিত্রে সেগুলোর গতিপথ অংকন করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- Kambyson, Megha, Kamberikhon, Psendostoman, & Antibole। তৃতীয় মুখটি অর্থাৎ Kamberikhon আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু ঐতিহাসিক Kamberikhon কে ‘কপোতাক্ষ নদ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু বেশীরভাগ ঐতিহাসিক এটাকে ‘কুমার নদ’ বলে জোরালো মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে Kamberikhon এর অপভ্রংশ নামই হচ্ছে কুমার নদ। স্যার রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘দ্যা হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ বইতে Kamberikhon এর রূপান্তর দেখিয়েছেন এইভাবেঃ Kamberikhon (যার সংস্কৃতি ভাষায় উচ্চারণ কৌম্বারাকা)> কৌমারাকা> কুমারাকা> কুমারা> কুমার। এই কুমার নদটি এখন মাথাভাঙ্গা নদীর শাখা হিসাবে প্রবাহিত হয়ে গড়াই নদীকে ছুয়ে হরিণঘাটা এবং আড়িয়াল খাঁ নদীতে মিশেছে। (১) মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ বইতে সরাসরি বলেছেন গাঙ্গে নগরীর অবস্থান ছিল কুমার নদের তীরে (২)।

কুমার নদকে নিয়ে প্রথম বিশদ আলোচনা দেখা যায় বৃটিশ-ভারতের প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল মেজর জেমস রেনেলের মানচিত্র এবং বর্ণনায়। রেনেলের বিবরণ কুমার নদকে নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে উল্টে-পাল্টে দেয়। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে Notes on the Physical Geography of Bengal নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটিতে রেনেলের মানচিত্র A Bengal Atlas’এ আঁকা বিভিন্ন নদ-নদীর বিবরণ রেনেলের দিনপঞ্জি, মেমোয়ার এবং চিঠিপত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়।

Notes on the Physical Geography of Bengal বইটিতে কুমার নদের (The Comer creek ) বিবরণ এসেছে এ’ভাবেঃ 150. Map- XI.- This river left the Ganges at Mayescunda (below Jellinghy village) and its course described below from Mayescunda Eastwards and Southward until the creek meets the Ganges below Hobbygunge. [The earlier part of the Comer in now known as the Mathabhanga]. (৩)

এই বিবরণ অনুযায়ী আদি কুমার নদটায় এখন মাথাভাঙ্গা হিসাবে পরিচিত। বিভিন্ন বইতে এবং জার্নালগুলোতে এখন মাথাভাঙ্গা নদীর উৎসমুখের যে বিবরণ দেওয়া হয় (জলাঙ্গীর উৎসমুখ থেকে প্রায় ১৭ মাইল ভাটিতে গঙ্গা নদী থেকে মাথাভাঙ্গা নদীর উৎপত্তি স্থল) তার সাথে এই বইয়ে দেওয়া কুমার নদের উৎপত্তির বিবরণের সাথে মিল পাওয়া যায়। তৃতীয় বন্ধনীতে লেখা ‘The earlier part of the Comer in now known as the Mathabhanga’ বাক্যটি বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করে।

রেনেল কুমার নদ জরিপের কাজ করেছিলেন ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দের মে থেকে জুন মাসে, পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় সাত বছর পর। এর পর বেশ কিছু বড় বড় বন্যার কারণে বাংলাদেশের অনেক প্রধান প্রধান নদ-নদীর গতিপথ পাল্টে যায় এবং কিছু নদী অন্য নদীর সাথে বিলীন হয়ে যায় এবং ভিন্ন নামে প্রবাহিত হতে থাকে, কোন কোন নদীর শাখা-উপশাখাগুলো চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। কুমার এবং মাথাভাঙ্গার ক্ষেত্রে কি তেমন কিছু হয়েছিল?

রেনেলের মানচিত্রে মাথাভাঙ্গা নদীকে হুগলী এবং ভৈরব নদের মধ্যবর্তী একটি জলপ্রবাহ হিসাবে দেখানো হয়েছে, যেমন দেখানো হয়েছে কপতক্ষ (Cabbaduck), ইছামতি (Issamot), পুল্লাগত (Pullagot) ইত্যাদি নদ-নদীগুলোকে। পুল্লাগত নদীর নিম্ন প্রবাহকে দেখানো হয়েছে মাথাভাঙ্গা হিসেবে। মাথাভাঙ্গা নদীর বিরবণ এসেছে এই ভাবেঃ 189. Map-XI.- This Creek was a lower extension of the Pallagot Creek (see immediately above). No information is available regarding the creek, but its name and course. The name however is identical with that of the present name of the upper Boyrub. [The course of the Creek as shown by Rennell suggests that it may once have been occupied by the Boyrub]. (৪)

রেনেল তাঁর মানচিত্রে মাথাভাঙ্গা নদীর নাম এবং গতিপথ ছাড়া বিশদ কোন বর্ণনা দেননি। এমনটা কী হতে পারে যে মাথাভাঙ্গা নদীর আদি খাতটি কোন একসময় ভৈরব নদীতে বিলীন হয়ে যায় এবং কুমার নদের আদি প্রবাহকে মাথাভাঙ্গা নামে ডাকা শুরু হয় এবং আদি উৎস মুখ থেকে ৪০ মাইল দূরে হাটবোয়ালিয়া থেকে যে খাতটি প্রবাহিত হতে থাকে সেই অংশটির নাম কুমার নদ হিসাবে পরিচিতি পাই? তৃতীয় বন্ধনীর – The course of the Creek as shown by Rennell suggests that it may once have been occupied by the Boyrub-এই কথাগুলো বিশ্লেষণ করলে ব্যপারটা অনেকটা এরকমই দাঁড়ায়। নাকি রেনেল জরিপ করার সময় ভুল করে মাথাভাঙ্গা নদীকে কুমার নদ বলে চিহ্নিত করেছিলেন?

কুমার নদ সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে Statistical Accounts of Jessore এ আবার রেনেলের মানচিত্র বিশ্লেষণ দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘The Kumar river, on Rennell’s map of the last century, flowed across the north of what are now the district of Nadia, Jessore and Faridpur. At the point where the Garai now receives the Kumar, the Kumar then received the Garai, which at that time was but a cross stream of the Ganges; and a little further down the old Kumar continued its easter course towards the Ganges; beyond Faridpur. But when the head of the Kumar began partially to silt up, the Ganges poured more and more of its water down the Garai, thus reinforced, which are now began to swallow up the Kumar. A little below Kushtia, the Garai throws off several cross streams towards the Kumar. Among them, the most considerable is the Kaliganga. In the rainy season, so many water pours through this channel into the Kumar; that at Ramnagar, near Magura, the latter has to get rid of the surplus, and discharges part of this water back again into the Garai channel. But in the cold season.

এসব কিছু বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কুমার নদটি ছিল গঙ্গা নদীর একটি শাখা, যার ব্যপ্তি ছিল তৎকালীন নদীয়া, যশোর এবং ফরিদপুর জেলাব্যাপী। ফরিদপুর জেলায় এখনও কুমার নদে নামে প্রায় মজে যাওয়া একটি প্রবাহের অস্বিত্ব আছে।

বর্তমানে কুমার নদের বিবরণ অনেকটা এ’ভাবে দেওয়া হয়ঃ চুায়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া গ্রামের কাছে মাথাভাঙ্গা নদী থেকে কুমার নদের উৎপত্তি। নদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার। কুমার নদ প্রাগপুর, হারদী, গোবিন্দপুর, দুর্গা পুর, বাদেমাজু ও জামজামির পাশ দিয়ে সর্পিল আকারে প্রবাহিত হয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমানা এঁকে কুষ্টিয়া জেলায় প্রবেশ করেছে। উৎসমুখ থেকে ২৫ কিলোমিটরর দূরে এটি ঝিনাইদহ জেলায় প্রবেশ করেছে। একসময় এই নদীতে প্রচুর পাঙাশ মাছ পাওয়া যেত তাই স্থানীয়রা একসময় নদটাকে পাংসী নামেও ডাকত। বর্ষা মৌসুমে নদীটি পানিতে পূর্ণ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে থাকে পানিশুন্য। গঙ্গা-কপোতক্ষ সেচ প্রকল্পের বাড়তি পানি এবং বৃষ্টি পাত এখন এই নদীর জল প্রবাহের প্রধান উৎস। বর্তমানে নদীটি একটি মজে যাওয়া জলজ উদ্ভিদে পরিপূর্ণ একটি মহা-জলপ্রবাহের ক্ষয়ে যাওয়া প্রতিচ্ছবি।

সুত্রঃ
(১)Ramesh Chandra Majumdar , The History of Bengal, Page: 12
(২) মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, গঙ্গা ঋদ্ধি থেকে বাংলদেশ, পৃষ্ঠাঃ ৯
(৩)Notes on the Physical Geography of Bengal, Page no: 63
(৪) প্রাগুক্ত, Page no: 70
(৫)Statistical Accounts of জেসসরে

শাহীন আহমেদ টিটো

সহ-সম্পাদক, সাম্প্রতিকী ডট কম।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না

error: Content is protected !!