সাম্প্রতিক

কুমারনদের অপর পাড়ে বধ্যভূমির সরকারি খাস জমি উদ্ধার করতে প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা

কুমারনদের অপর পাড়ে বধ্যভূমির সরকারি খাস জমি উদ্ধার  করতে প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা

কুমারনদের অপর পাড়ে বধ্যভূমির সরকারি খাস জমি উদ্ধার করতে প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা

রহমান মুকুল : আলমডাঙ্গার বধ্যভূমির সোজাসুজি কুমার নদের অপর পাড়ে কালিদাসপুর গ্রামে আরেকটি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়ার পরও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বধ্যভূমির আত্মস্মাতকৃত সরকারি জমি উদ্ধারে কয়েক বছর ধরে গ্রামবাসি আইনি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। কালিদাসপুর গ্রামের বাবুল মন্ডল ওই বধ্যভূমির জমি দখল করে পুকুর খননের সময় অনেকগুলো মানুষের মাথার খুলিসহ শরীরের অন্যান্য হাড় উঠে আসলে এ বধ্যভূমি সংরক্ষণের দাবি উচ্চকিত হয়। প্রশাসনের নিকট বধ্যভূমির আত্মস্মাতকৃত জমিটি পূনরুদ্ধারপূর্বক সংরক্ষণের দাবি তুলেছেন গ্রামবাসি।
জানা গেছে, আলমডাঙ্গা পশুহাটের নিকটবর্তী বধ্যভূমির সোজাসুজি কুমার নদের ওপারে কালিদাসপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা খাস জমি আছে। ওই জমির ভেতর ১ একর ৪৭ শতক জমি গ্রামের মৃত্যু মনোহর মন্ডল লীজ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে আর.এস রেকর্ডে তিনি অবৈধভাবে সমস্ত জমি নিজের নামে রেকর্ডভূক্ত করে নেন বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেছে। এ সম্পর্কে কথা হয় কালিদাসপুর গ্রামের মৃত রহম আলী মন্ডলের ছেলে গ্রামের বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত জিয়াউল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, পূর্বে কালিদাসপুর গ্রামের ভেতরের প্রধান রাস্তা থেকে বধ্যভূমির ওই খাস জমির উপর দিয়ে কুমার নদে যাওয়ার একটা সরকারী রাস্তা ছিল। কুমারীর জমিদার স্বর্গীয় শৈলেন্দ্রনাথ সাহা কুমার নদে কালিদাসপুর গ্রামের দূর্গাপুজা বিসর্জন দেওয়ার সুবিধার জন্য ওই রাস্তা নির্মাণ করে দেন। তাছাড়া সে সময় এমনকি এখনও কালিদাসপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাল, বর্গী ও বানে বা পোর্দ্দার বংশের উল্লেখযোগ্য পরিবারের বসবাস। এসকল হিন্দু ধর্মালম্বী মহিলারা ক্যানেলে বা কুমার নদে স্নান করেন। তাদের গোসলের সুবিধার্থে জমিদার ওই রাস্তা নির্মাণ করে দেন। পরবর্তীতে বধ্যভূমির ওই খাস জমি লিজ মূলে হস্তগত করার পর গ্রামের বেশ অবস্থাপন্ন ব্যক্তি মৃত মনোহর মন্ডল সে জমিতে অবৈধভাবে পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে বাবুল মন্ডল সে রাস্তাটিও দখল করে মাঝামাঝি একটা পুকুর খনন করে। ফলে প্রয়োজনীয় ওই রাস্তায় চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৩ বছর পূর্বে সে রাস্তার শেষ মাথায় অর্থাৎ কুমার নদের নিকটে আরেকটি পুকুর খনন শুরু করে বাবুল মন্ডল। ওই পুকুর খননকাজের সময় সম্প্রতি অনেক মানুষের মাথার খুলিসহ হাড় হাড্ডি উঠতে থাকে শ্রমিকদের কোদালে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, খননকাজের সময় মাটির নীচে পাওয়া সমস্ত হাড়গোড় বাবলু মন্ডলের নির্দেশে শ্রমিকেরা পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। বিষয়টি গ্রামে জানাজানি হলে ফুঁসে উঠে গ্রামবাসী। তারা সে সময় ওই পুকুরের নিকট গিয়ে কিছু মাথার খুলিসহ হাড়গোড় উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে ওই হাড়গোড় গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে আলমডাঙ্গা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউর রহমান সুলতান জোয়ার্দার তা নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতে পুঁতে রাখেন।
আলমডাঙ্গা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সুলতান জোয়ার্দ্দার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী ট্রেন থেকে যাত্রী নামিয়ে নিয়ে এখানে গণহত্যা চালিয়েছিল। কুমার নদের এপার-ওপার দু’পারেই গণহত্যা শেষে লাশ পুঁতে রাখতো। লালব্রীজের দু’পাশে ট্রেনের আপ ও ডাউন দুদিকের যাত্রিদের ধরে ধরে হত্যার পর কুমার নদের দু’পাশে পুঁতে রাখতো। একই দিনে এপারে ২৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখার কাহিনি বলেন তিনি। প্রায় ৩ বছর পূর্বে এ সম্পর্কে কথা হয় কালিদাসপুর গ্রামের বয়ঃবৃদ্ধ আলতাফ হোসেনের সাথে (বর্তমানে মৃত)। তিনি জানান, যুদ্ধের সময় তিনি প্রায় যুবক বয়সি। ১ দিন তিনি গরু চরাতে গিয়েছেন কুমার নদের ওই ঘটনাস্থলে। পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকাররা ৫ জনকে ধরে নিয়ে এসে তাকে জ্যান্ত পুঁতে দিতে নির্দেশ করলো। তিনি প্রথমে রাজি হননি। সে কারণে তাকে এক পাকিস্তানি সৈন্য গুলি করে মারতে উদ্যত হলে তিনি রাজি হন। প্রথমে ওই ৫ জনকে হত্যা করে লাশ ওই বধ্যভূমিতে পুঁতে দেন। এভাবে অসংখ্য নারী পুরুষকে হত্যা করে ওই বধ্যভূমিতে পুঁতে রাখা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওই গ্রামের রবিউল হক নবী বলেন, যুদ্ধের সময় তিনি উঠতি বয়সি যুবক। তিনি বলেন, লালব্রীজের কালিদাসপুরের পারে ট্রেন থামিয়ে সন্দেহভাজন হিন্দু পুরুষদের নামিয়ে নিত পাক হানাদার বাহিনি। তাদেরকে ল্যাংটা করে নিশ্চিত হয়ে নির্মমভাবে হত্যা করত। হিন্দু মহিলাদের খুব বেশি চিহ্নিত করতে পারতো না। যাদের পারতো, তাদেরকে নামিয়ে নিয়ে নির্যাতন শেষ হত্যা করতো। কালিদাসপুরের পারের সকল লাশ কুমারনদের এ পারেই পুঁতে রাখতো। কালিদাসপুরের অনেক মহিলাও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, যাদেরকে হত্যা করতো, তাদেরকে দিয়েই গর্ত খুড়িয়ে নিত। মস্ত বিশ্বাস নামের গ্রামের এক ব্যক্তি গর্ত খুঁড়ে দিতে রাজি না হলে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করেছিল। গ্রামের আলতাফকে দিয়ে খুন করাতে বাধ্য করত। আলতাফ তো শেষ পর্যন্ত অর্ধ পাগল অবস্থায় অকালে মারা গেল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গ্রামের মহাবুল মেম্বর, মিজানুর রহমান, মহি উদ্দিনসহ অনেকেই জানিয়েছেন, বেশ কিছু দিন ধরে গ্রামবাসি নদীর অপর পারের আলমডাঙ্গা বধ্যভূমির মত ওইস্থানকে বধ্যভূমি ঘোষনার দাবী করে আসছেন। ইতোমধ্যে গ্রামবাসি একত্রিত হয়ে দখলকৃত বধ্যভূমির সরকারী জমির এক পাশ দিয়ে আবারও রাস্তা নির্মাণ করেছেন। ১নং খতিয়ানের দখলকৃত বধ্যভূমির এ জমি উদ্ধারে তারা কয়েক বছর পূর্বে সহকারী জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদনও করেছিলেন বলে জানান। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু এতটুকু করেই গ্রামবাসি বসে নেই। তারা যথারীতি এ জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে আদালতে আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন। তারা অবৈধ দখলদারের নিকট থেকে সরকারি খাস জমিটি উদ্ধার করে তা বধ্যভূমি হিসেবে সংরক্ষণের দাবী তুলেছেন।
সহকারি জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের কোন সমস্যা নেই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে, এ ধরণের গণকবরের সন্ধ্যান পেলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সেখানে মনুমেন্ট নির্মাণ করে দেবে। বিষয়টি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও উপজেলা নির্বাহি অফিসারকে অবহিত করতে হবে। তাহলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব।
ছবিঃ এ লালব্রীজের দু’পাশে ট্রেন থামিয়ে নামিয়ে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যার পর ক্যানেলের দু’পাশে পুঁতে রাখতো।