সাম্প্রতিক
ছবি: ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’ কাব্যগ্রন্থ হাতে কবি ইমরাজ মাহফুজ

ইমরান মাহফুজের কালি ও কলম পুরস্কারে ফেসবুকে তোলপাড়

ছবি: ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’ কাব্যগ্রন্থ হাতে কবি ইমরাজ মাহফুজ

কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার-২০১৮ নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি পুরস্কারের কবিতা বিভাগে কবি ইমরান মাহফুজের ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’কে পুরস্কৃত করে চিঠি পাঠানো হয়। পরে গত পরশু তাকে ই-মেইল করে পুরস্কার প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে কালি ও কলম কর্তৃপক্ষ জানায়, জমা দেওয়া বইটি দ্বিতীয় সংস্করণের হওয়ায় পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ইমরান মাহফুজের ভাষ্য, তিনি সব শর্ত এবং নিয়মাবলী মেনেই বই জমা দিয়েছেন। এমন ঘটনায় তিনি তার অপরাধ বুঝতে পারছেন না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কালি ও কলমের মতো স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান কতটা অসতর্ক হলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভেবে অবাক হচ্ছেন সবাই। কীভাবে বিচারকরা বইয়ের সংস্করণটি না দেখেই তা বিচার করলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, যেহেতু এটা কালি ও কলমের ভুল এবং তারা তাদের শর্তের মধ্যে ‘সংস্করণ’ প্রসঙ্গে কিছুই উল্লেখ করেননি তাহলে এখানে কবি ইমরান মাহফুজকে বলি দেওয়া হচ্ছে কেন? কেনইবা তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ করা হচ্ছে? কেউ কেউ বলছেন, পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে বইয়ের কন্টেন্ট দেখে, সেখানে শুধু সংস্করণের জন্য, যেটা আবার শর্ত কিংবা নিয়মাবলীর মধ্যে উল্লেখ করা হয়নি, এভাবে পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়াটা অমানবিক।

 

পুরস্কারের বিপরীতে বই আহ্বানের বিজ্ঞাপনে কালি ও কলমের শর্ত ছিল, ‘পুরস্কারের জন্য ১৮ থেকে ৪০ বছর (গ্রন্থ প্রকাশকালে অনূর্ধ্ব ৪০ বছর) বয়সী বাংলাদেশি কবি ও লেখকদের রচিত গ্রন্থ বিবেচিত হবে। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ এ প্রতিযোগিতায় গ্রহণযোগ্য হবে।’ নিয়মাবলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বয়স প্রমাণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা সমমানের সনদের অনুলিপি প্রেরণ করতে হবে। পুরস্কার প্রদানের পর কোনো কারণে যদি অবগত হওয়া যায় যে, পুরস্কারপ্রাপ্ত কোনো বই অন্য কোনো বইয়ের হুবহু অথবা আংশিক প্রতিরূপ, সেক্ষেত্রে পুরস্কার প্রত্যাহারের অধিকার বিচারকমণ্ডলীর সংরক্ষিত থাকবে। পুরস্কারে যে কোনো পর্যায়ে বাছাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির রচিত গ্রন্থ পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে না। চূড়ান্ত বাছাই শেষে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরস্কার প্রদান করা হবে। পুরস্কারের বিষয়ে বিচারকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।’

এ বিষয়ে খোলা কাগজের সঙ্গে আলাপকালে কবি ইমরান মাহফুজ বলেন, ‘কালি ও কলম বই আহ্বানের সময় যে শর্ত ও নিয়মাবলী জুড়ে দিয়েছে আমি তার সবকটি মেনেই বই জমা দিয়েছি। তারা ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ আহ্বান করেছে। আমার বইয়ের প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৮। কিন্তু তারা যেহেতু শর্তের মধ্যে বইয়ের সংস্করণ নিয়ে কোনো কথা বলেনি তাই আমি কোনোভাবেই এর দায় নিতে পারি না। তা ছাড়া দ্বিতীয় সংস্করণে বইটির পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’র প্রথম সংস্করণে পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৬০টি, কবিতা ছিল ৪০টি। অন্যদিকে এর দ্বিতীয় সংস্করণে পৃষ্ঠা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ তে। সেই সঙ্গে কবিতাও সংযোজন করা হয়েছে আরও ২০টি। সবমিলিয়ে পুরো ঘটনায় আমার অপরাধটা কোথায়, সেটা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’

এ নিয়ে খোলা কাগজের পক্ষ থেকে কালি ও কলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল জানান, ‘আমরা তো ইতোমধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছি। যেটা ভুল হয়ে গেছে সেটা নিয়ে আর কী বলার থাকতে পারে।’

যোগাযোগ করা হলে এ নিয়ে নজরুল ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমি মনে করি, যারা পুরস্কার দেন তাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। তারা যেন এমন কিছু না করেন যাতে করে একজন কবি দুঃখ পান, আহত হন।’

পুরস্কার দিয়ে আবার এভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফেসবুকে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে তরুণ লেখকরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কবি রাসেল রায়হান লিখেছেন, ‘বুঝতে পারছি না, এটা কি কালি ও কলম কর্তৃপক্ষের ভুল? এই ভুল কীভাবে হতে পারে! এখন এটা কি পুরস্কারদাতা-গ্রহীতা দুপক্ষের জন্যই অস্বস্তিকর হচ্ছে না? ঠিক অস্বস্তিকর বললেও হয় না; ক্ষতিকর।’ জাব্বার আল নাঈম নামে একজন লিখেছেন, ‘কালি ও কলম এমন মেজর ভুল করে কীভাবে? এভাবে একজনকে পুরস্কার দিয়ে আবার ফিরিয়ে নেয়! দুজনের জন্যই বিষয়টি লজ্জার ও বিব্রতকর।’

মুহিম মনির বলছেন, ‘সত্যিই দুঃখজনক! এতদিন কালি ও কলম পুরস্কার প্রদান কমিটির ওপর আমার একটা অন্যরকম শ্রদ্ধা ছিল। কেননা এই পুরস্কারপ্রাপ্ত যে কটি বই পড়েছি, তার প্রায় সবগুলোই আমাকে পাঠমুগ্ধ করেছে। কিন্তু আজ এমনটা শুনতে হলো কেন! কমিটি কী তবে প্রকাশকালটি দেখে নেওয়ারও সময় পাননি!’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তরুণদের সাহিত্যচর্চা ও সাধনাকে গতিশীল এবং সাহিত্যের বিকাশ ও সৃজন উদ্যোগকে দীপিত করার লক্ষ্যে সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা কালি ও কলম ২০০৮ সাল থেকে প্রদান করে আসছে তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার। বর্তমানে বিজয়ী প্রত্যেককে পুরস্কারস্বরূপ এক লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট ও একটি সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়। সাধারণত পাঁচটি বিভাগে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে। বিভাগগুলো হলো : ১। কবিতা ২। কথাসাহিত্য ৩। প্রবন্ধ, গবেষণা ও নাটক ৪। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য ও গবেষণা ৫। শিশু-কিশোর সাহিত্য। এবার শিশুকিশোর সাহিত্যে পুরস্কার দেওয়ার মতো কোনো বই পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে কথাসাহিত্য বিভাগে ‘যূথচারী আঁধারের গল্প’ গ্রন্থের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন নাহিদা নাহিদ।

এটা আমার জন্য বেদনার এবং বিব্রতকর’: কবি ইমরান মাহফুজ

আমি একজন লেখক এবং আমি পাঠকের জন্যই লিখি। তাই পাঠকের ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত আমার বড় পাওয়া। আমি বিশ্বাস করি, আমরা তরুণরা যারা লেখালেখি করি তাদের জন্য কালি ও কলম অনেক বড় প্ল্যাটফর্ম। ফি বছর তরুণ লেখকদের পুরস্কার দেওয়ার যে আয়োজন তারা করে থাকে আমি সেটাকেও সাধুবাদ জানাই।

আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই, কালি ও কলমের সব শর্ত মেনেই আমি তাদের এ আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তারা আমার কবিতাকে মনোনীত করায় আমি যতটা আনন্দ পেয়েছি, প্রত্যাহার করার ঘোষণায় তার চেয়েও অনেক বেশি বিব্রত হয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, এটা আমার আমার জন্য অনেক বেশি বেদনার। তারপরও গ্রহণ এবং বাতিল- দুটিই যেহেতু তাদের হাতে তাই আমার আসলে এর বেশি কিছু বলার নেই।

ইমরানের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে’ : হাবীবুল্লাহ সিরাজী

ঘটনাটা আমি শুনেছি। বিষয়টা আমারও খুব খারাপ লেগেছে। আমি মনে করি, যারা পুরস্কার দেন তাদের আরও সাবধান হওয়া দরকার। এমন ঘটনা খুবই দুঃখজনক। পুরস্কার দিয়ে এভাবে তুলে নেওয়াটা গর্হিত কাজ। এতে করে লেখক মারাত্মকভাবে আহত হন, যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কবি ইমরান মাহফুজের জন্য আমার পক্ষ থেকে সমবেদনা জানাই।

ইমরান মাহফুজ যেহেতু সব শর্ত পূরণ করেই বই জমা দিয়েছে, সেক্ষেত্রে তার তো কোনো দোষ নেই। তাই আমি মনে করি, তার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। অন্যদিকে কালি ও কলম যেহেতু তাদের অসতর্কতার কথা উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেছে, তাই এক্ষেত্রেও খুব বেশি কিছু বলার নেই। ভবিষ্যতে আমি তাদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাব।