সাম্প্রতিক

যে কারণে যুগে যুগে একজন ম্যান্ডেলাকে প্রয়োজন হয়

ম্যান্ডেলা

শাহীন আহমেদ টিটো, আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ সূর্যদেব এবং রাজমাতা কুন্তির পুত্র হয়েও অঙ্গরাজ কর্ণ কোনো দিনই স্বীকৃতি পাননি, অনার্যই থেকে গেছেন চিরকাল। মহান দানবীর এবং পাণ্ডুর পুত্র অর্জুনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ছিলেন তিনি। কিন্তু এখানেও তিনি অস্বীকৃত; হয়েছেন শ্রেণি এবং বর্ণ বৈষ্যমের শিকার শুধু মাত্র এই কারণে যে দৈব চক্রে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন একজন রথ-সারথির ঘরে। এত গেল প্রায় তিন হাজার বছর আগের পৌরনিক গল্প-গাঁথা। গত একশ আগে কিংবা এখনও অবস্থার ইতর বিশেষ কিছু হয়েছে? না, হয়নি। তাইতো গান্ধী থেকে শুরু করে হালের বারাক ওবামা- সবাইকেই আহত করে চলেছে শ্বেত-পুরাণধারীদের নীল বিষাক্ত চোখ।

শ্বেত পুরাণ কোন সময়ই কালো চামড়ার মানুষদেরকে মানুষ বলে মনে করেনি, এখনও করে না। তাইতো টিকেট থাকা সত্ত্বেও ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরা থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয় একজন গান্ধীকে, ‘হোয়াই্ট হাউসের কালো বাঁদরী’ বলে ডাকা হয় মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে আর বিশ্বে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লোকরঞ্জনবাদের আড়ালে শ্বেত পুরাণ জাগিয়ে তুলে ক্ষমতায় আসেন একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বর্ণবাদ কালো বর্ণের মানুষকে অনার্য বানিয়েছে হাজার বছর আগে। গণতন্ত্র, সাম্যবাদ, মানববাদ, হাজার হাজার ধর্ম, মত এবং পথ- এই সবকিছুই সৃষ্টির গোড়া থেকেই সংঘর্ষ করে আসছে মানুষকে ‘মানুষ’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, মানুষকে ‘মানুষ’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। কিছু কিছু সময় এবং খুব অল্প সময়ের জন্য প্রচেষ্টাগুলো সফল হলেও বারবার সেগুলো ভেঙে পড়েছে আর অধিকার হারিয়েছে মানুষ, বিশেষ করে কালো মানুষেরা।

জন্তু জানোয়ারে মত গলায় শিকল বেঁধে আফ্রিকা গহীন অরণ্যে মুক্ত-স্বাধীন ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোকে ধরে এনে দাস বানালো সাদা আরযরা। সামাজিক মর্যাদা তো দূরে থাক এঁরা যে মানুষ, এদের যে হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ব্যথা এবং ক্ষুধা-রেচন সহ অন্যান্য জৈবিক চাহিদা আছে এসব কথা অবলীলায় অস্বীকার করে এদেরকে পশুতুল্য করল শ্বেত-পুরাণের লিখিয়েরা। চির নির্যাতিত এই কালো দাসদের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিলেন নেলসন ম্যন্ডেলা। অধিকার ফিরে পাওয়ার দীর্ঘ সংঘর্ষে তিনি নির্জন দুঃসহ কারগারে কাটিয়েছেন জীবনের মূল্যবান ১০ হাজার ৫২ দিন, ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত।

মুক্ত হয়ে জনসাধারণের কাতারেই থেকেছেন। ক্ষমতায় আসার পর দেখিয়েছেন অসাধারণ সহনশীলতা। সাদা-কালোয় মিলে একসাথে দেশ গড়ার কাজে মন দিয়েছেন। কাউকেও অস্বীকার করেননি। মর্যাদা দিয়েছেন সবাইকে। গণতন্ত্র সাম্যবাদ মানববাদ কিংবা অসংখ্য ধর্ম আর জীবনবোধের নির্যাস তিনি প্রবাহিত করেছিলেন তার শাসনামলের পাঁচটি বছরে তাঁর দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায়।

যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের কারণে পৃথিবীর দশ কোটি মানুষ আজ দেশহীন, আশ্রয়হীন, কেউ বা নিজ দেশে পরবাসী। এইসব মানুষগুলোর অধিকার সীমিত, বিভিন্ন দেশে পেটের দায়ে কাজ করছে খুবই কম মুজুরিতে, যাপন করছে পশুর জীবন। যেন বিলুপ্ত দাস প্রথা ফিরে এসেছে নতুন রূপ আর মোড়কে, নতুন বিপণন ব্যবস্থায়। সিরিয়া থেকে ফিলিস্থিন, ফিলিস্থিন থেকে সুদান, আর সুদান থেকে রাখাইন- এসব জায়গার তাড়িত মানুষগুলো অযুত তত্ত্বের ভিড়ে কিন্তু বর্ণবাদেরই শিকার। আক্রমণকারীরা এসবের আড়ালে শ্বেত-পুরাণকেই জাগিয়ে তুলছে, শ্বেত-পুরাণকেই গোপন ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে।

শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়ে মানবতার পক্ষে দাড়াচ্ছে ঠিকই কিন্তু শরণার্থীরা শরণার্থীই থেকে যাচ্ছে, থেকে যাচ্ছে অধিকারহীন; কাটাচ্ছে দাসের জীবন। নিজে ভুমিতে ফিরতে পারছে কোন দিনই। ঠিক এইরকম একটি বিশ্ব পরিস্থিতিতে একজন নেলসেন ম্যান্ডেলাকে মানুষের বড্ড বেশী প্রয়োজন, এই পৃথিবীর বড্ড বেশী প্রয়োজন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না

error: Content is protected !!