সাম্প্রতিক

ত্রিশ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে পাঁচ জেলার কলা

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ॥ ভাই কলার দাম কেমন? এমন প্রশ্নে কৃষক সাবান আলীর সোজা জবাব, এবার কৃষক যে দাম পেয়েছেন তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে গেছে। সপ্তাহের শুরুতে কাইদ প্রতি দাম পেয়েছেন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এরকম দাম আগে কোন বছরে কৃষকেরা পাননি। বলছি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মধুপুর কলার হাটের কথা। এটি দক্ষিনাঞ্চলের কলার সবচেয়ে বড় হাট। গত ২৫ বছর ধরে এই হাটের কদর একটুও কমেনি। বরং বেড়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ইজারা দেন উপজেলা প্রশাসন। এবছর ইজারা দেওয়া হয়েছে ৩৭ লাখ টাকায়। আশেপাশের ৫ জেলার কৃষকেরা কলা নিয়ে এই হাটে জড়ো হন। এখান থেকে আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীরা কলা কিনে দেশের অন্ততঃ ৩০ জেলায় নিয়ে যান। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সাথেই মধুপুর এলাকা। কুষ্টিয়া জেলার শেষ সীমানা সংলগ্ন। পাশেই ঝিনাইদহ জেলার শুরু। এ হিসাবে এই হাটে ঝিনাইদহ জেলার কলা বেশি আসে। তাছাড়া চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ি ও মেহেরপুর থেকেও কলা আসে। এসব জেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষক এবং ব্যবসায়ী প্রতিদিনই হাটে কলা নিয়ে হাজির হন। আর ছড়িয়ে পড়া জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, ঢাকা, বগুড়া, পঞ্চগড়, বরিশাল, খুলনা, যশোরসহ অন্তত ৩০ জেলায়। হাটের ব্যবসায়ী ও কলা চাষীদের সাথে কথা হয়। প্রতিদিন ভোর পাচটা থেকে হাটে কলা উঠতে শুরু করে। কৃষক সরাসরি খেত থেকে করা সংগ্রহ করে হাটে নেন। আবার গ্রামের ছোট ব্যবসায়ীরা কলা কিনে নছিমন, করিমন বা ভ্যানে করে হাটে কলা নিয়ে আসেন। সপ্তাহের ৭ দিনই হাট বসে। শুধুমাত্র দুই ঈদের চারদিন হাট বন্ধ থাকে। বলা যায়, বছরের ৩৬১ দিনই হাট বসে। প্রতিদিন ভোর পাচটায় শুরু হয়ে দুপুর দুইটার মধ্যে সব সাবাড় হয়ে যায়।
হাটের ভেতর একটা হাসুয়া নিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন কলা ব্যবসায়ী শফিউর রহমান। মাঝে মাঝে মোবাইলফোনে উচ্চস্বরে কথা বলছেন। মনে হল, ঢাকার কোন কলা ব্যবসায়ীর সাথে কলার দাম নিয়ে কথা বলছেন। পরিচয় দিয়ে কথা প্রসঙ্গে জানালেন, হাটের পাশেই শান্তিডাঙ্গা এলাকার তার বাড়ি। ৩৬ বছর ধরে কলা ব্যবসার সাথে তিনি জড়িত। আগে অন্য হাটে ছিলেন। এখন ২৫ বছর ধরে এই হাটে ব্যবসা করেন। ঢাকা, নারায়ানগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার কলা ব্যবসায়ীদের সাথে পরিচয় আছে। মোবাইলফোনে যোগাযোগ করে কলা বিক্রি করেন। টাকা বিকাশের মাধ্যমে নিয়ে নেন।
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, মধুপুর হাটে চাম্পা ও সবরি কলা বেশি ওঠে। প্রতিদিন অন্তত ছোট বড় ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক কলা হয়। গত সোমবার চাম্পা কলা কাইদ (প্রায় ১৬০ পিচ) প্রতি ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সবরি কলা বিক্রি হয়েছে ৪৫০ টাকা দরে। ১৫ দিন আগে চাম্পা ও সবরি বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। আস্তে আস্তে দাম পড়ে যাচ্ছে। তবে এই ১৫ দিনে কৃষকেরা বাম্পার দাম পেয়েছে। ঝিনাইদহের শ্রীরামপুর থেকে এসেছেন কলা চাষী সেলিম রেজা। তিনি জানালেন, এবছর তিনি ৪ বিঘা জমিতে কলা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে কলা চাষ করে খরচ বাদ দিয়ে ৫০ হাজার টাকা করে লাভ পেয়েছেন। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সীগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রাম থেকে কলা কিনে নসিমনযোগে হাটে আসেন বিক্রি করতে। এবছর লাভ ভালো পেয়েছেন। সবচেয়ে ভালো লাভ পেয়েছেন কৃষকেরা।
হাটের বন্দোবস্তকারী কাজী আবদুস সাত্তার। তিনি ২৫ বছর ধরেই হাটের সাথে সম্পৃক্ত। বিশাল কলার হাটের সব পরিবহন দিকগুলো তিনি দেখভাল করে থাকেন। ব্যবসায়ীরা কলা দেশের বিভিন্ন জেলায় কিভাবে সরবরাহ করবেন মূলত সেটাই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন । কৃষক ও ব্যবসায়ী তার উপর আস্তা রাখেন।
কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, এই হাটে প্রচুর টাকার কেনাবেচা হয়। ছোট বড় ট্রাকগুলো তিনি ঠিক করে দেন। একেকটা ট্রাকে অন্তত ৭/৮ জন ব্যবসায়ীর কলা যায়। কলার কাইদে হাসুয়া দিয়ে কেটে বিশেষ ধরনের চিহৃ করা হয়। এক ব্যবসায়ীর কলা অন্য ব্যবসায়ীর কেনা কলার সাথে মেলে না।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিম হোসেন বলেন, এবছর কলার দাম পেয়ে কৃষকেরা খুশি। মধুপুর হাটে কলা বিক্রি করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অনেক লাভবান হয়েছেন। সেখানে মাঝে মাঝে গিয়ে তদারকি করা হয়। এছাড়া মাঠে গিয়েও কলার রোগ প্রতিরোধ নিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়। এঅঞ্চলের কলার চাহিদা অন্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না

error: Content is protected !!